তোর নাম কী?
আমার প্রশ্ন করার ভঙ্গিই লোকটাকে জানিয়ে দিল এ-প্রশ্ন দ্বিতীয়বার আমি করব না।
ও চটপট বলল, রমেন হালদার।
আমি ঠান্ডা গলায় বললাম, আমার হাতে সময় বেশি নেই। গোটা গল্পটা তাড়াতাড়ি বল। কথা শেষ করার সময় শটগানটা খানিকটা ওপরে তুললাম।
রমেন আত্মরক্ষার ভঙ্গিতে হাত তুলে আঁতকে উঠল। বলল, বলছি, সব বলছি–মুখটা ধুয়ে আসি।
বাথরুমে গিয়ে মুখ ধুয়ে এল রমেন। তারপর একরকম টলতে-টলতে বিছানার ওপরে গিয়ে বসে পড়ল। চোখ থেকে চশমাটা খুলে ছুঁড়ে দিল একপাশে। মাথার চুলে দু-বার হাত চালিয়ে বলল, আপনি কে জানি না। তবে মনে হচ্ছে চুনিদা আপনার সঙ্গে এঁটে উঠবে না। আমি চুনিদার কথা মতো এই মেকাপ নিয়ে কাল থেকে এই ঘরে এসে উঠেছি। আর সুরিন্দার বলে এই লোকটা সবসময় আমার সঙ্গে রয়েছে। চুনিদা বলছিল, আমার ওপরে অ্যাটাক হতে পারে। কিন্তু কী করব! দশ হাজার টাকা দিয়েছে আমাকে। মাথা ঝাঁকাল রমেন। তারপর বলল, বিশ্বাস করুন, কাল থেকেই ভয়ে-ভয়ে আছি–।
মারুতি গাড়ির লোকটাকে সুরিন্দার খতম করল কেন?
বলছি, বলছি। একটু দম নিল রমেন : আজ সকালে আমরা ব্রেকফাস্ট খেতে ব্লু গার্ডেনে গিয়েছিলাম। চুনিদা বলেছিল মাঝে-মাঝে ঘরের বাইরে বেরোতে, লোকজনকে দেখা দিতে যাতে সবাই আমাকেই আসল চুনিলাল ব্যানার্জি ভাবে। তো ব্রেকফাস্ট সেরে চলে আসছি–তখন কটা হবে? বড়জোর সাড়ে নটা কি দশটা হঠাৎই মাইকেল ডিসুজা নামে দাড়িওয়ালা একটা লোক সুরিন্দারকে ডেকে নিয়ে কী যেন বলল। তখন সুরিন্দার আমাকে এসে বলল, একটা লেজুড় লেগেছে। ওটাকে খতম করতে হবে। সুরিন্দারকে আমি চিনি না–আগে কখনও দেখিনি। তো আমি ঘরে ফিরে এলাম, কিন্তু সুরিন্দার কীসব খোঁজখবর করতে চলে গেল। অনেকক্ষণ পর ফিরে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, রমেনবাবু কেস খারাপ। ওই ফেউটা আপনার মেকাপের ব্যাপারটা কী করে যেন জানতে পেরে গেছে। ও এখন ফিরে গিয়ে মিত্তিরসাহেবকে খবর দিলেই মুসিবত।
আবার দম নিতে থামল রমেন। ওর ভয়ার্ত চোখ-মুখ বিচ্ছিরি দেখাচ্ছে। এসব ছাপোষা লুড়োখেলা লোককে কেন যে এই খুন-খুন খেলার মধ্যে টেনে আনা কে জানে!
হালদার আবার বলতে শুরু করল, ব্যস, তারপর থেকেই এই জানলায় রাইফেল তাক করে বসে রইল সুরিন্দার। অনেকক্ষণ পর চারবার ফায়ার করল শুনলাম। আমার তখন মাথা ঝিমঝিম করছিল। সুরিন্দার হাসি মুখে আমার কাছে এসে বলল, পাখির গায়ে গুলি লেগেছে। কিন্তু কী করে যে শালা ওই হালতে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল কে জানে! চুনিবাবুকে খুশখরিটা জানিয়ে দিন।
রমেন হালদার এখন রীতিমতো কঁপছে। মানুষ খুন করাটা কোনওদিনই ওর সিলেবাসের মধ্যে ছিল না।
আমি প্রশ্ন করলাম, চুনি ব্যানার্জিকে কী করে খবর দেন আপনি?
টেলিফোনে।
কোথায় ফোন করেন?
আমার ঘরের উলটোদিকের দুশো আঠেরো নম্বর ঘরে। চুনিদা ওই ঘরেই আছে কাল থেকে। ভাঙা দাঁতের জায়গাটায় জিভ বুলিয়ে নিল রমেন।
আমার হাসি পেয়ে গেল। কী চমৎকার ব্যবস্থা! শরদিন্দু মিত্র বোধহয় এরকম হিসেবের কথা ভাবেননি। কিন্তু এখন আমার সত্যিকারের চুনিলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা হওয়া দরকার। রিসেপশানের খবর অনুযায়ী দুশো আঠেরো নম্বর ঘরেই রয়েছে হীরা, আর তার সঙ্গে হীরার মাশুক চুনি।
আমার গলা খুসখুস করছিল। একটু ভেজাতে পারলে ভালো হত। সে-কথাই বললাম রমেনকে। ও মাথা নাড়ল–ঘরে স্টক নেই।
থ্রি-নট-থ্রি-টা এতক্ষণ ধরে ঝুলিয়ে রেখে বাঁ-হাতটা টনটন করছিল। ওটা রেখে দিলাম তোশকের নীচে। বিছানাটা আবার ঠিকঠাক করে দিলাম। রমেনকে বললাম সবুজ পরদাটা ঠেলে একপাশে সরিয়ে দিতে। ও চটপট কথা শুনল। এরকম প্রভুভক্ত লাখে একটা পাওয়া যায়।
চুনি ব্যানার্জিকে ফোন করে এ-ঘরে ডেকে নিয়ে এলে কেমন হয়? এবং স্বাভাবিকভাবেই ফোনটা করতে পারে রমেন হালদার। অতএব রমেনকে বললাম ফোন করতে।
ঘরের উত্তরদিকের দেওয়াল ঘেঁষে টেলিফোন। রমেন রিসিভার তুলে ডায়াল ঘোরাল। ইন্টারকম লাইনের ব্যবস্থা। সুতরাং তিনটে সংখ্যা ঘোরালেই কাজ হয়।
আমি টেলিফোনের কাছে এগিয়ে যেতে চাইলাম। কারণ সম্ভব হলে দু-প্রান্তের কথাই আমি শুনতে চাই। কিন্তু আমার অগ্রগতিতে বাধা দিল সুরিন্দার। ওর পড়ে থাকা নিথর দেহটাকে এতক্ষণ কোনও আমল দিইনি আমি। না দিয়ে যে ভুল করেছি সেটা এখন বুঝলাম।
সুরিন্দার পেশাদার। হয়তো ও চোখ খুলেছে কয়েক মিনিট আগেই, এবং বেশ খুঁটিয়ে আমাকে এবং আমার হাতে ধরা অস্ত্রশস্ত্রকে লক্ষ্য করেছে। তাই প্রথম হ্যাঁচকাটা মারল আমার ডান পা ধরে। আর প্রায় একইসঙ্গে আমার হাতের শটগান ধরে টান মারল।
সুরিন্দার জানে না আমিও পেশাদার। ও যে পাঠশালায় পড়েছে সেখানে পড়াশোনা করলে আমি নির্ঘাত ডবল প্রমোশন পেতাম। সুতরাং ওর হ্যাঁচকা টানে টাল খেয়ে পড়ে যেতে-যেতেই শটগানের ট্রিগারে আঙুলের চাপ দিলাম। কারণ নয়েজ পলিউশানের চেয়ে প্রাণের দাম বেশি।
গুলির শব্দ হল। তবে আওয়াজটা যত জোরে শোনাবে ভেবেছিলাম ততটা শোনাল না। সুরিন্দার শটগান ধরে টান মেরেছিল। তবে ও ভাবেনি ওই বেটাল অবস্থাতেও আমি ফায়ার করতে পারব।
না, গুলি সুরিন্দারের গায়ে লাগেনি। গুলি গিয়ে বিঁধেছে কার্পেটে। তবে গুলি ছোঁড়ার পরক্ষণেই শটগানের নল চেপে ধরেছিল সুরিন্দার। তাই ওর হাত পুড়ে গেছে। ও যতটা ক্ষিপ্রভাবে আমাকে আক্রমণ করেছিল তার চেয়েও দ্রুতগতিতে ফিরিয়ে নিল ছ্যাকা খাওয়া হাতটা।
