ওকে আমি গুলি করতেই পারতাম। কিন্তু শটগানে নয়েজ পলিউশান হয়। দশটা লোক ছুটে আসতে পারে এই ঘরে। তারপর, সন্দেহ নেই, আমার কাজ পণ্ড হবে।
উলঙ্গনাথনকে দেখে যতই মাথামোটা মনে হোক, ও বোধহয় মনে-মনে ঠিক এই হিসেবটাই কষেছিল।
শটগানটা আমার হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল বিছানায়। আর একইসঙ্গে আমি উলঙ্গ নাথনের শরীরের একমাত্র পোশাক ঢাকা অঙ্গ লক্ষ করে তীব্র লাথি চালিয়ে দিয়েছি।
লাথি যে জোরেই লেগেছে সেটা যন্ত্রণার শব্দ শুনে এবং আমার ডান পায়ের ব্যথা অনুভব করে বোঝা গেল, কিন্তু লোকটা একেবারে অকেজো হয়ে পড়ে যায়নি। শুধু সামান্য কাবু হয়ে সামনে হাত চেপে ঝুঁকে পড়েছিল। আমি আর অপেক্ষা করিনি। পকেট থেকে মিনি ডাম্বেল বের করে শক্ত মুঠোয় ধরেছি, এবং পরক্ষণেই বাতাসে এক সুদীর্ঘ বৃত্তচাপ রচনা করে ইস্পাতের বল মারাত্মকভাবে আঘাত করল উলঙ্গনাথনের শক্ত বুকে।
হাড় ভাঙার শব্দ হল বোধহয়। উলঙ্গনাথন হাঁটুগেড়ে বসে পড়ল কার্পেটের ওপরে। আমি ডাম্বেল ফেলে দিলাম হাত থেকে। খালি হাতের লড়াইয়ের বিখ্যাত বই কিল অর গেট কিড় এর পঞ্চাশ পৃষ্ঠার নির্দেশ অনুযায়ী দু-হাতে প্রচণ্ড চাপড় মারলাম উলঙ্গনাথনের দুকানের ওপরে। বেশ জোরে শব্দ হল। জানি, এই শব্দ উলঙ্গনাথনের কানে বাজ পড়ার শব্দের মতো শুনিয়েছে। এবং ওর দু কানের পরদা নিশ্চয়ই ফেটে গেছে।
উলঙ্গনাথনের চোখ উলটে গেল। ও চিৎ হয়ে পড়ে গেল কাপেৰ্টের ওপরে। ওর তামাটে বুকের মাঝখানে একটা জায়গা কালচে-নীল হয়ে ফুলে উঠেছে।
চুনি ব্যানার্জি ভয়ার্ত চোখে নিথর হয়ে পড়ে থাকা উলঙ্গনাথনকে দেখছিল। আমি ডাম্বেলটা কুড়িয়ে নিয়ে পকেটে রাখলাম। শটগানটা বিছানা থেকে তুলে নিয়ে এগিয়ে গেলাম চুনির কাছে। উলঙ্গনাথনকে দেখিয়ে বললাম, এটাকে কোত্থেকে জোগাড় করেছেন? যদি গ্যারান্টি পিরিয়ডের মধ্যে থাকে তা হলে সেখানে জমা দিয়ে রিপেয়ার করিয়ে নেবেন।
আমার কথা চুনির মাথায় কতটা ঢুকল কে জানে। ও বড়-বড় চোখে ফ্যালফ্যাল করে আমাকে দেখছিল। বোধহয় ভাবছিল, একটু আগের দেখা ঘটনাগুলো স্বপ্ন, না সত্যি।
আমি আর দেরি করলাম না। চুনির কলার চেপে ধরে শটগানটা ওর মুখের কাছে নিয়ে এলাম। দাঁতে দাঁত চেপে জিগ্যেস করলাম, কে গুলি চালিয়েছে এ-ঘর থেকে?
চুনি ব্যানার্জি হাঁপাতে লাগল। ওর গলা বন্ধ হয়ে এল। কোনওরকমে বলল, সুরিন্দার গুলি করেছে।
কে সুরিন্দার?
মেঝেতে পড়ে থাকা উলঙ্গনাথনকে দেখাল চুনিলাল : ও গুলি করেছে।
আমি জিগ্যেস করলাম, মেশিনটা কোথায়?
ওর প্যান্টের পকেটে আছে।
আমি মেঝেতে পড়ে থাকা প্যান্টটার দিকে তাকালাম। ওর পকেটে বড়জোর একটা রিভলভার থাকা সম্ভব। ওই রিভলভার দিয়ে তিনতলা থেকে লক্ষ্যভেদ করা অসম্ভব। তা ছাড়া রিভলভার থেকে ছোঁড়া গুলি কখনও ওই দূরত্বে লালুর দেহ এফেঁড়-ওফেঁড় করতে পারত না।
আমি চুনিলালকে দেখলাম এক পলক। ওর ঘোট ছটফট করছে। ঠোঁট কাঁপছে। কিছু একটা বলতে চায় কিন্তু বলতে পারছে না।
চিন্তা করে দেখলাম, নলকাটা শটগানটা যদি ওর মুখের ভেতরে গুঁজে দিয়ে ফায়ার করি তা হলে শব্দ তেমন জোরে শোনা যাবে না।
সে-কথাই বললাম চুনিকে। ও কী একটা বলতে গিয়ে ঠোঁট ফাঁক করল। সঙ্গে-সঙ্গে শটগানটা আমি ওর দাঁতের ফাঁকে গুঁজে দিলাম। একটা গোঁ-গোঁ শব্দ বেরিয়ে এল চুনির মুখ থেকে। চোখ আবার মাপে বড় হয়ে গেল।
আমি হাসতে হাসতে বললাম, শব্দ কম হবে বটে তবে এই ঘরের দামি কার্পেটটা একেবারে নষ্ট হয়ে যাবে। কারণ, গুলিটা যখন আপনার মাথার পেছন দিয়ে বেরোবে তখন মাথার ঘিলু টিলু, রক্ত, হাড়ের কুচি, সবই ছিটকে বেরোবে তার সঙ্গে। কিন্তু কী করব, উপায় নেই– তারপর হাসি থামিয়ে ধমকের সুরে বললাম, শিগগির বলুন, মেশিনটা কোথায় রিভলভার দিয়ে সুরিন্দার ও কাজ করেনি।
আমি কথা বলতে-বলতে চুনিলালের ফরসা গালে হাত বুলিয়ে দিয়েছিলাম। তখন টের পেয়েছি ওর গালের পেশি কাঁপছে। সেটা স্বাভাবিক। আমি মোটেই অবাক হইনি। কিন্তু অবাক হলাম ওর তিলটা লেপটে গালে মাখামাখি হয়ে গেছে দেখে। নকল তিল!
আমি স্থির চোখে চুনিলাল ব্যানার্জিকে দেখতে লাগলাম। এখন বুঝতে পারছি, চায়ের দোকানের সেই উঠতি রংবাজ নেহাত মিথ্যে বলেনি। চুনি ব্যানার্জি সত্যিই বহুত খতরনাক লোক।
আমি শটগানটা টেনে বের করে নিলাম ওর মুখ থেকে। টানের হ্যাঁচকায় একটা দাঁত পড়ে গেল মেঝেতে। কিছুটা রক্তও বেরোল।
আমি আবার জিগ্যেস করলাম, মেশিনটা কোথায়?
আগে মেশিন, পরে তিল।
নকল চুনি আঙুল তুলে বিছানাটা দেখাল।
আমি সুরিন্দারের বুকের ওপরে পা দিয়ে ওর দেহ ডিঙিয়ে গেলাম। তারপর একটানে উলটে দিলাম বিছানায় তোশক। সঙ্গে-সঙ্গে দেখতে পেলাম মেশিনটা। থ্রি-নট-থ্রি উইনচেস্টার, টেলিস্কোপ লাগানো। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের খতম করার জন্যে এই ধরনের দূরপাল্লার মেশিন ব্যবহার করা হয়।
মেশিনটা বাঁ-হাতে তুলে নিলাম। ফিরে গেলাম নকল তিলের কাছে। সুরিন্দারকে লাথি কষানোর পর থেকে ডান পা-টা একটু টনটন করছে।
নকল চুনি এখন ভয়ে কাঁপছে। কাঁপারই কথা। আমার ডান হাতে শটগান, বাঁ-হাতে থ্রি নট থ্রি, পকেটে সাইলেন্সার লাগানো স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন, আর সেই মারাত্মক ডাম্বেল। এসব দেখে এবং জেনে ভয় পাওয়ারই কথা। তা ছাড়া সামনেই পড়ে রয়েছে সুরিন্দারের ড্যামেজড বডি।
