নল কাটা শটগানটার জন্যে পিঠের কাছটায় খচখচ করছিল, কিন্তু সেটা ভ্রূক্ষেপ না করে আমি দু-পা ফাঁক করে দাঁড়িয়েই রইলাম। দু-হাতে স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসনের বাঁট চেপে ধরেছি। সাইলেন্সারের নল সরাসরি চুনির কপাল দেখছে।
শক্ত গলায় চুনিকে বললাম, উঠে দাঁড়ান–।
চশমা ঠিক করে সাইলেন্সরের নলের দিকে স্থির নজর রেখে ধীরে-ধীরে উঠে দাঁড়াল চুনিলাল। তারপর অপমানে আহত গলায় বলল, হাত দুটোও কি মাথার ওপরে তুলতে হবে?
আমি হাসলাম ও কোনও দরকার নেই। হাত তুলুন আর না-ই তুলুন, আমার টিপ ফসকাবে না।
চুনিলাল মাথার চুল ঠিক করল, প্যান্ট-শার্ট ঝাড়ল। তারপর খানিকটা শান্ত গলায় বলল, কবে থেকে হোটেল রিভারভিউর ম্যানেজার হয়েছেন?
আপনার ঘরের দরজায় নক করার দু-সেকেন্ড আগে থেকে।
ও– হাত নাড়াল চুনি, বলল, নিন, আর দেরি করছেন কেন? কাজ শেষ করুন।
কাজ? কী কাজ? একটু অবাক লাগল আমার। চুনির কাছে গিয়ে শরীর হাতড়ে দেখলাম ও নিরস্ত্র। তখন রিভলভার পকেটে রাখলাম। ওকে জিগ্যেস করলাম, ঘরে আর কে আছে?
চুনির নজর কেঁপে গেল একতিল। কিন্তু আমি সেটা লক্ষ করলাম। সুতরাং ওকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলাম ভেতরের ঘরের দিকে।
ভেতরের ঘর বললাম বটে, কিন্তু ঘর আসলে একটাই। একটা ভারী পরদা সেটাকে বসবার ঘর ও শোবার ঘরে ভাগ করেছে। সবুজ পরদাটা অনেকখানি টানা ছিল। কিন্তু পরদার ডানদিকে দরজার মতো সামান্য ফাঁক রয়েছে।
আমি সেই ফাঁক দিয়ে ভেতরের ঘরে যাইনি। চুনিলালের কেঁপে যাওয়া নজর আমাকে সাবধান করে দিয়েছে এক লহমা আগেই। অতএব এক ঝটকায় মেঝে পর্যন্ত লেপটে থাকা পরদার
বাঁ দিকের কোণ দিয়ে ঢুকে পড়েছি ভেতরের ঘরে–চুনির শোবার ঘরে।
চায়ের দোকানের সেই শিক্ষানবিস ছোকরা মাস্তানের কথা মনে পড়ল : চুনিদা বহুত খতরনাক লোক…।
কথাটা যে একেবারে মিথ্যে নয় সেটা এখন বোঝা গেল। কারণ, শোবার ঘরে একটা লোক উপুড় হয়ে শুয়ে রয়েছে। না, বিছানায় নয়, খাটের নীচে, ঘরের মেঝেতে। তবে মেঝেতে
কার্পেট থাকার জন্যে শুয়ে থাকতে বোধহয় তেমন কষ্ট হচ্ছে না।
লোকটা পরদার শেষপ্রান্তের দরজার দিকে সজাগ চোখে তাকিয়ে বাঘের বাচ্চার মতো ওত পেতে ছিল। বোধহয় আমারই জন্যে। ওর হাতে অস্ত্রশস্ত্র কী আছে ভালো দেখার মতো সময় এবং মনের অবস্থা আমার ছিল না। তা ছাড়া শটগানটা অনেকক্ষণ ধরে পিঠের কাছে খচখচ করছিল। তাই পরদা তুলে ঢোকার সময়েই ওটা হাতে বের করে নিয়েছি এবং ওই হুমড়ি খাওয়া অবস্থাতেই ওর মাথার দিকে তাক করে ট্রিগারে আঙুল শক্ত করে ফেলেছি।
আমি ঘরে ঢোকার সঙ্গে-সঙ্গেই বাঘের বাচ্চা আমার দিকে তাকিয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। শটগানের নিশানা নির্ভুল লক্ষ্যে স্থির।
লোকটা নিশ্চয়ই পেশাদার পুরোনো পাপী। কারণ নলকাটা শটগান দেখেই চিনতে পারল। বুঝতে পারল, যদি আমি ওর কপাল তাক করে ফায়ার করি তা হলে মুন্ডুটা খুঁজে পাওয়ার জন্যে খবরের কাগজে হারানো-প্রাপ্তি নিরুদ্দেশ কলামে বিজ্ঞাপন দিতে হবে। সুতরাং নিমেষের মধ্যে ওত পেতে থাকা বাঘের বাচ্চাটা শুয়োরের বাচ্চা হয়ে গেল। মুখ ফ্যাকাশে। চোখে ভয়।
আমি নোংরা গলায় বললাম, হাত দুটো সামনে বাড়িয়ে মাথা নীচু কর–।
লোকটা দণ্ডিকাটার মতো সামনে দু-হাত বাড়িয়ে মুখ নীচু করে শুয়ে পড়ল।
চুনি ব্যানার্জি ইতস্তত পায়ে ঘরে এসে ঢুকল। আমি ওকে বললাম, আপনার বডিগার্ডকে খাটের তলা থেকে টেনে বের করুন–।
খাটের তলায় উঁকি মেরে দেখলাম। নাঃ, ওই একজনই, আর কেউ নেই।
চুনিলাল ওর চ্যালাকে টেনে বের করল খাটের তলা থেকে। লোকটার গায়ে আঁটোসাঁটো গেঞ্জি, তার ওপরে লেখা লাভ, পাশে হৃদয়ের ছবি। আর ওর পায়ে ডেনিমের প্যান্ট–প্যান্টের পকেট উঁচু হয়ে রয়েছে।
চুনিলাল বারবার আমাকে দেখছিল, এবং অর্থপূর্ণ চোখে তাকাচ্ছিল ওর চ্যালার দিকে। চ্যালা এপাশ-ওপাশ ঘাড় নাড়ল–অর্থাৎ, না। আমার মনে হল, চুনিলাল আমার হাতের নলকাটা শটগানের গুরুত্ব বোঝেনি। চ্যালা বুঝেছে। তাই গুরুকে বোঝাতে চাইছে।
আমি চ্যালাকে বললাম, জামা-প্যান্ট খোল–জলদি।
দু-জোড়া চোখ অবাক হয়ে গেল। কিন্তু কথা শুনল চ্যালা। আমার দিকে সাবধানী চোখ রেখে গেঞ্জি-প্যান্ট খুলে ফেলল। লোকটার পাকানো পেটানো চেহারা। মাথার চুল কদমছাঁট। এখন ওকে ভি.আই.পি. জাঙিয়ার বিজ্ঞাপনের মতো দেখাচ্ছে।
চুনিলাল ব্যানার্জি বোধহয় ধীরে-ধীরে সামলে উঠছিল। ঠান্ডা গলায় জিগ্যেস করল আমাকে, আপনি কে? কী চান এখানে?
আমি কয়েক সেকেন্ড ভাবলাম। তারপর বললাম, শুনলে খারাপ লাগবে, কিন্তু আমার কোনও উপায় নেই। আমি হীরাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছি–একটু থেমে আবার বললাম, তা ছাড়া এই ঘর থেকে আজ সকালে গুলি চলেছে। একটা লোকের পিঠে গুলি লেগেছে। লোকটা উন্ডেড অবস্থায় লাল রঙের মারুতি ভ্যানে চড়ে রিভারভিউ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। তারপর রাস্তায় মারা যায়।
কথা বলতে বলতে আমি চুনির চ্যালা উলঙ্গনাথনকে পাশ কাটিয়ে জানলার কাছে এগিয়ে গেছি। উঁকি মেরে দেখেছি নীচের কার পার্কের দিকে। হ্যাঁ, ঠিকই বলেছে শিবনাথ। এই জানলা দিয়ে গুলি চালানোটা নেহাত অসম্ভব নয়।
বোধহয় দু-তিন সেকেন্ড অমনোযোগী হয়েছিলাম। এবং সেই অন্যমনস্কতার সুযোগে উলঙ্গ নাথন আমার শটগান লক্ষ্য করে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
