আমি অ্যাটেনড্যান্টের সঙ্গে কথা বলছিলাম। নেহাতই বিশ-বাইশের ছোকরা। নাম শিবনাথ। কালো মুখ পুরোনো বসন্তের দাগ। সামনের কয়েকটা দাঁত উঁচু। পরনে খাকি পোশাক।
একটু আগেই লুব্রিকেশান ফি জমা দিয়েছি তিরিশ টাকা। তারপরই লালুর গাড়ির খবর এবং বুলেটের ব্যাপারটা জানতে পেরেছি।
লালু দৌড়ে এসে ওর গাড়িতে উঠছিল। সেই সময়ে ওর পিঠে গুলি লাগে। না, গুলির শব্দ শুনতে পায়নি শিবনাথ। তবে হঠাৎই লালুর পিঠে সাদা জামার ওপরে লাল রং ফুটে উঠতে দেখে চমকে উঠেছে।
সময় তখন কটা হবে? এই বারোটা সাড়ে বারোটা। কার পার্কে শিবনাথ একাই ছিল। ও ভয় পেয়ে গিয়েছিল। হ্যাঁ, মেটাল রোডের ওপরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গিয়েছিল লালু। তারপর শিবনাথকে অবাক করে দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। টলতে টলতে উঠে পড়েছে গাড়িতে। গাড়িটা চলতে শুরু করামাত্রই আবার গুলি। কাচের ওপরে গুলির শব্দ–বেশ কয়েকবার। তখন শিবনাথ আন্দাজে ওপর দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছে। তখনই একটা লোককে দেখতে পেয়েছে ও।
আমি মনোযোগ দিয়ে শিবনাথের কথা শুনছিলাম। আর একইসঙ্গে চারপাশে নজর রাখছিলাম। কারণ, খনা বলে গেছেন, ন বিশ্বাসন্তি আপনং ছায়া। যার অর্থ, নিজের ছায়াকেও কখনও বিশ্বাস কোরো না।
শিবনাথ হোটেলের তিনতলার জানলায় একজন লোককে দেখতে পায়। না, তাকে ঠিক চিনতে পারেনি। তবে ওই ঘরটায়।
আঙুল তুলে ঘরটা দেখাল শিবনাথ। আর সঙ্গে-সঙ্গে আমার বুকের ভেতরে একটা হাতি ব্যালে নেচে উঠল। কারণ, ঘরের নম্বরটা আমি আন্দাজ করতে পেরেছি। দুশো তিন। চুনি ব্যানার্জির ঘর!
শিবনাথ আর কিছু বলতে পারেনি। না, এই দুর্ঘটনার কথা কাউকে জানায়নি সে।
তখন ওকে আইডেনটিটি কার্ডটা দেখিয়ে আশ্বস্ত করলাম এই বলে যে, ওর কোনও ভয় নেই। পুলিশ ওকে বিরক্ত করবে না।
শিবনাথ তিরিশ টাকাটা ফেরত দেওয়ার জন্যে ঝুলোঝুলি করতে লাগল। আমি হেসে বললাম, পুলিশ যেমন সবসময় সার্ভিস চার্জ নেয়, তেমনি মাঝে-মাঝে সার্ভিস চার্জ দেয়। এটা অনেকটা সেইরকম–
শিবনাথের কাছ থেকে সোজা ফিরে গেলাম নিজের ঘরে। সুদৃশ্য ড্রেসিং টেবিলের পাশ থেকে ব্রিফকেসটা নিয়ে রাখলাম। বিছানায় ওপরে। কম্বিনেশান লক ঘোরাতেই ব্রিফকেস খুলে গেল। ভেতরে কাগজপত্র, কলম, টুকিটাকি জিনিস। এ ছাড়া ছোট একটা ডাম্বেল। মাঝের হাতলটা কাঠের। তাতে আঙুলের মুঠোর মাপে খাঁজ কাটা। আর দু-মাথায় দুটো ইস্পাতের বল–বড়জোর দু-সেন্টিমিটার ব্যাসের। ডাম্বেলটা মুঠো করে ধরলে হাতলটা দেখা যায় না, শুধু বল দুটো মুঠোর দু-পাশে উঁকি মেরে থাকে।
ডাম্বেলটা প্যান্টের পকেটে ঢোকালাম। তারপর ব্রিফকেস থেকে তুলে নিলাম চার ইঞ্চি মাপের একটা সাইলেন্সার টিউব। টিউবের গায়ে নানা রঙের স্টিকার লাগানো। যাতে দেখে বোঝা ণা যায় এটার আসল কাজ কী। একটা স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন রিভলভারে ওটা প্যাঁচ দিয়ে লাগিয়ে নিলাম। তারপর প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে দিলাম।
অন্য স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসনটায় হাত দিলাম না। তার বদলে ব্রিফকেস থেকে বের করে নিলাম নল কাটা একটা শটগান। তার বাঁট বলে কিছু নেই। একটা তেকোনা ইস্পাতের ফ্রেম নিয়ে শটগানের সঙ্গে এঁটে দিতেই একটা খাটো বাঁট তৈরি হল। একবার দেখে নিলাম গুলিভরা আছে কিনা। তারপর ওটা শিরদাঁড়ার কাছে প্যান্টের ভেতরে আধাআধি গুঁজে নিলাম। ঢোলা জামাটা টেনে দিলাম ওপর দিয়ে।
ব্রিফকেস বন্ধ করে আয়নার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। শরীর ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখলাম শটগানটা দৃষ্টিকটুভাবে উঁচু হয়ে থেকে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে কি না। এ-শটগানের বিজ্ঞাপনের দরকার নেই। একবার ফায়ার করলেই শতকরা দুশো ভাগ কাজ দেয়।
ঘর ছেড়ে যখন বেরোলাম তখন আমি দুনিয়া ছাড়ার জন্যে তৈরি। কিন্তু তার আগে দুশো তিন নম্বর ঘরের রহস্য আমি ভেদ করতে চাই। সেই সঙ্গে লালুর মৃত্যুরহস্য।
করিডরে ওয়াল-টু-ওয়াল কার্পেট। সুতরাং পায়ের শব্দের কোনও ব্যাপার নেই। আর লোকজন কাউকেই চোখে পড়ল না। একবার শুধু একজন বেয়ারাকে দেখলাম। হাতে ট্রে। ট্রে-র ওপরে বোতল ও গ্লাস। আমি বেয়ারাটাকে পাশ কাটিয়ে গেলাম। এবং দুশো তিন নম্বরের দরজাটাও পেরিয়ে গেলাম।
যখন দেখলাম পথ পরিষ্কার তখন দুশো তিনের সামনে এসে নক করলাম ব্যস্তভাবে।
কিছুক্ষণ কোনও উত্তর নেই। তখন আমি কলিংবেলের বোতাম টিপলাম। তারপর আবার নক করলাম।
এবার কেউ ভরাট গলায় প্রশ্ন করল, কে?
ভাবার সময় নেই। অতএব যা মুখে এল বলে দিলাম, দরজা খুলুন, মিস্টার ব্যানার্জি। আমি রিভারভিউর ম্যানেজার।
তারাওয়ালা হোটেলের ম্যানেজাররা নিশ্চয়ই বেয়ারাদের মতো বোর্ডারদের দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়ায় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও কাজ হল। দরজা সামান্য ফাঁক হল। একটা ভয়ার্ত চোখ দেখা গেল সেই ফাঁকে। চুনি ব্যানার্জির চোখ।
আমি দরজায় সপাটে এক লাথি মারলাম। আর একইসঙ্গে পকেট থেকে সাইলেন্সার লাগানো স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসনটা বের করে বাগিয়ে ধরলাম। তারপর ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিলাম। ছিটকিনিও এঁটে দিলাম।
মেঝেতে পড়ে যাওয়া চুনি তখনও পুরোপুরি সামলে উঠতে পারেনি। রিমলেস চশমা চোখ থেকে সরে গিয়ে কাত হয়ে নাকের কাছে আটকে রয়েছে। ব্যাকব্রাশ চুলের পরিপাটি ভাব নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু ডান গালের তিলটা রয়েছে জায়গা মতোইনড়ে যায়নি।
