লালু কী করতে এসেছিল রিভারভিউতে? এল, ব্লু গার্ডেনে খেল-দেল, তারপর একজোড়া গুলি খেয়ে মরে গেল। যে গুলি ছুঁড়েছে সে নিশ্চয়ই গাড়ির বাইরে থেকে, পিছন থেকে, ফায়ার করেছে। আর তখন গাড়িটা হয়তো ছুটন্ত অবস্থায় ছিল। নইলে চারটে গুলির মধ্যে দুটো গায়ে লাগবে কেন? যারা রিভলভার চালায় তাদের টিপ কি এতই ভেঁতা হয়!
হঠাৎই আমার থিয়োরিতে একটা বড় গলদ চোখে পড়ল। না, লালু যখন গুলি খায় তখন সে মোটেই ড্রাইভ করছিল না। কারণ সিটে বসা অবস্থায় সিটের গদি ফুটো না করে কোনও গুলি ওর বুকে বা পিঠে বিধতে পারে না। সামনের সিটের গদিতে সেরকম কোনও ফুটো আমার নজরে পড়েনি। সুতরাং গুলি খাওয়ার পর লালু কোনওরকমে গাড়িতে উঠে গাড়ি ছুটিয়ে দিয়েছে। তখন আরও চারবার কেউ গুলি ছুঁড়েছে ওর গাড়ি লক্ষ্য করে।
গুলি চালানোর ঘটনা ঘটেছে এখানেই, এই হোটেলে–এতে আর কোনও সন্দেহ নেই। তা হলে গুলির আওয়াজ কি কেউ শোনেনি? নাকি রিভলভারে সাইলেন্সার লাগানো ছিল?
এইসব উলটোপালটা ভাবতে-ভাবতেই মিউজিক রুমে গিয়ে ঢুকলাম। সঙ্গে-সঙ্গে হুইস্কির গন্ধ নাকে এসে ঝাপটা মারল।
ঘরটা ঝিমঝিম অন্ধকার। তারই মধ্যে টুং-টাং করে বাজছে গিটারের সুর। ঘরের একপাশে যন্ত্রসংগীতের নানা যন্ত্রপাতি জ্যাজ, কঙ্গো, পারকাসন, ম্যারাকাস, পিয়ানো অ্যাকর্ডিয়ন, আর বড় মাপের ইয়ামাহা ইলেকট্রনিক অরগ্যান। সেগুলো থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে দাড়িওয়ালা মোটাসোটা একটা লোক তামাটে শরীরটাকে সামান্য ঝুঁকিয়ে স্প্যানিশ গিটার বাজাচ্ছে। তার কাছে বসে আছে একটি রোগা চেহারায় ছোকরা।
আমি গিটারওয়ালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। হুইস্কির গন্ধ গায়ে মেখে জিগ্যেস করলাম, মাইকেল?
দাড়িওয়ালার গিটার বাজতেই থাকল। তারই মধ্যে সুর করে ছড়া কেটে বলল, কী চাই, বলে ফেল ভাই– হুইস্কির গন্ধ আবার ঝাপটা মারল নাকে।
আমি জিগ্যেস করলাম, ঘণ্টাখানেক আগে ব্লু গার্ডেনে বসে খেয়ে গেছে একটা লোক। তারপর এই হোটেলেই গুলি খেয়ে রাস্তায় গিয়ে মরেছে। রেস্তোরাঁর তখন আপনার শো চলছিল। লোকটার চেহারার বর্ণনা দিলে চিনতে পারবেন?
রোগা ছেলেটা তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। এত স্বাভাবিক গলায় কখনও কাউকে খুনের ঘটনা বোধহয় বলতে শোনেনি।
মাইকেল গিটার বাজাতে বাজাতেই হাসিমুখে সঙ্গীর দিকে তাকাল। বলল, ভয় পেলি, তরুণ? তোর অবস্থা বড় করুণ।
তরুণ তখন ভয়ার্ত মুখে যাই-যাই করছে।
মাইকেল এবার আমাকে জিগ্যেস করল, ভাই, সবই তো বুঝলাম। কিন্তু আপনার কী নাম?
গিটার বাজছিল। একবারের জন্যেও থামেনি।
আমি দাঁত বের করে হেসে ছড়া কেটে বললাম, ভালো নাম অমিতাভ শিকদার, ডাকনাম পুলিশ। বলতে পারেন, বুলেট খাওয়া লোকটার হদিস?
ওদের দুজনেরই মুখের ছবি পালটে গেল। গিটারের তারের ওপরে থমকে গেল মাইকেলের আঙুল। কুতকুতে চোখ দ্রুত নড়াচড়া করতে লাগল এদিক-ওদিক। আর তরুণের অবস্থা এখন সত্যিই করুণ।
মাইকেলকে এবার লালুর চেহারার বর্ণনা দিলাম। ও চুপ করে শুনল। তারপর গিটারটায় ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ভাবল। বলল, আবছা মনে পড়ছে। ডায়াসের খুব কাছেই বসেছিল। বারবার ঘড়ি দেখছিল। তারপর একসময় ঘড়ি দেখেই জলদি খাওয়া শেষ করে ঝট করে উঠে পড়েছিল। তাড়াহুড়ো করে রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে গেছে। একটু থেমে আবার বলল, এইজন্যেই লোকটাকে মনে আছে। তবে রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে কোথায় গেছে বলতে পারব না।
মাইকেলের মুখ দেখে মনে হল সত্যি কথাই বলছে।
নাঃ, লালুর গল্প তা হলে এখানেই শেষ! হোটেলের ম্যানেজারকে আমি জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাই না, কারণ, তাতে শোরগোল হবে। আমার কাজ হীরাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া, ব্যস।
মাইকেলকে আলগা গোছের ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে এলাম ঘর ছেড়ে। ও তখন আবার গিটার বাগিয়ে ঝংকার তুলতে শুরু করেছে। মাথা ঝুঁকিয়ে আমার ধন্যবাদ গ্রহণ করে বলল, অলওয়েজ ওয়েলকাম, মাইকেল ডিসুজা আমার নাম।
আমি হাসলাম, বললাম, দরকার পড়লেই আসব আবার, এখন সময় হল যাওয়ার–।
রেস্তোরাঁর দরজা ঠেলে বেরোনোর সময় মনে হল, ছোটবেলা থেকে রিভলভার চর্চা না করে যদি কবিতা চর্চা করতাম তা হলে বড় ভালো হত। আজ আমাকে এভাবে লালুর খোঁজ করে বেড়াতে হত না।
শরীর খুব ক্লান্ত লাগছিল। দুশো সাত নম্বরে ফিরে এসে ঘুমিয়ে পড়লাম আরামের বিছানায়। সন্ধেবেলা কারপার্কের অ্যাটেনড্যান্টকে লাল ওনির ব্যাপারে জিগ্যেস করা যাবে। আর হীরা যখন হাতের নাগালে রয়েছে তখন রাতের অন্ধকারে ওকে নিয়ে উড়ে যেতে অসুবিধে কী?
শুধু একটা ব্যাপার মনের মধ্যে খচখচ করছিল। লালু মারা যাওয়ার আগে শরদিন্দু মিত্রের নাম বলে গেল কেন?
.
হোটেল রিভারভিউর যে-কোনও ভিউই চমৎকার। অন্তত সূর্য ডুবে যাওয়ার মুখে কার পার্কের সামনে দাঁড়িয়ে আমার তাই মনে হল।
সবুজ ঘাসের কিনারায় ঝুলন্ত শিকলের চেন। তারপরই মেটাল রোড এবং কার পার্ক। হোটেলের চৌহদ্দির পাঁচিল প্রায় দেড়মানুষ উঁচু। সুতরাং নদী বা সূর্যাস্ত কোনওটাই সরাসরি দেখা যাচ্ছে না। তবে লালচে আকাশ পরোক্ষভাবে সূর্যের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করছিল। আর হু-হু বাতাসের গায়ে নদীর নাম লেখা ছিল।
কার পার্কের কাছে চৌহদ্দির দেওয়াল ঘেঁষে হাফ ডজন পাম গাছ। তার মাথায়, পাতার ফাঁকে, পাখির বাসা ও সংসারী পাখি। ঘাসের ওপরে দাঁড়িয়ে ওদের নির্লজ্জ দাম্পত্য কলহ শোনা যাচ্ছে।
