এবার ওকে পরের প্রশ্নগুলো করলাম।
চুনি ব্যানার্জির সঙ্গে আর কেউ এসে উঠেছে? কোনও মেয়ে?
না, স্যার,
আমার ভুরু কুঁচকে গেল। হীরার খোঁজেই এসেছি। অতএব পকেট থেকে হীরার ফটো বের করে ওকে দেখালাম। হীরাকে কেউ একবার দেখলেই যথেষ্ট, কোনওদিন ভুলবে না। জিগ্যেস করলাম, চুনিবাবুর সঙ্গে এই মেয়েটি ছিল না?
হীরার ছবি দেখে লোকটার চশমা কেঁপে উঠল নাকের ডগায়। চোখজোড়া জুলজুল করে খাইখাই ভঙ্গিতে বলে উঠল, না, স্যার, মিসেস রায় তো তার স্বামীর সঙ্গে এসে উঠেছেন। এই তো, দুশো আঠেরো নম্বর রুমে। বলে খাতার পাতার দিকে আঙুল দেখাল সে।
তার মানে? চুনি ব্যানার্জি একা উঠেছে? আর হীরা মিসেস রায় নাম নিয়ে উঠেছে তার স্বামীর সঙ্গে? উঁহু..ওরে মন, পৃথিবীর গভীরতর অসুখ এখন–।
সুতরাং নোলা ঝরা লোকটাকে আরও এক ডিগ্রি কাহিল করতে বললাম, স্বামী আবার কী! সব বোগাস–।
সত্যি স্যার, তাই?
আমি এক চোখ ছোট করে বললাম, তবে ওর রেটটা বড় হাই। আসলে দেখতে সুন্দর তো–।
কত রেট স্যার, কত? এরকম একজন বিউটি কুইন– লোকটার ডান হাতটা নড়ছিল। বোধহয় নজরের আড়ালে পকেটের খুচরো পয়সা গুনছিল।
আমি পাথরের মতো মুখ করে বললাম, দশ হাজার। পার নাইট।
টগবগে বেলুন চুপসে গেল পলকে। একটা দীর্ঘশ্বাসও বেরিয়ে এল। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মুখটাও ব্যাজার হয়ে গেল।
আমি এবার লাল মারুতির প্রসঙ্গে এলাম। জিগ্যেস করলাম, আধঘণ্টাটাক আগে লাল রঙের মারুতি ওনি নিয়ে কোনও কাস্টমার এখানে এসেছিল? ব্লু গার্ডেন রেস্তোরাঁয় বসেছিল খেতে…।
লোকটা হাসল। বলল, সেটা ঠিক বলতে পারব না, স্যার। তবে আমাদের রেস্তোরাঁটা দোতলায়। ওখানে মাইকেল আছে। ও তখন স্টেজে গাইছিল। ও সব লোককে ঠিকঠাক মনে রাখতে পারে। ওকে একটিবার জিগ্যেস করে দেখুন।
আমি হেসে ধন্যবাদ জানালাম। পকেট থেকে লুব্রিকেশান ফি হিসেবে একটা একশো টাকার নোট বের করে লোকটার দিকে এগিয়ে দিলাম।
এর আবার কী দরকার ছিল, স্যার– বলতে-বলতে টাকাটা ও নিল। যতক্ষণ পর্যন্ত পরের টাকা খরচ করছি ততক্ষণ দয়ালু হতে কোনও বাধা নেই। তবে লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হলাম। আপনমনেই বিড়বিড় করে কী যেন হিসেব কষছে। বোধহয় ভাবছে, বাকি নহাজার নশো টাকা কোত্থেকে জোগাড় করা যায়। আজ রাতে হীরাকে যে ও স্বপ্নে দেখবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। গরিব তো স্বপ্ন নিয়েই বাঁচে।
দোতলার সিঁড়ির পাশেই অটোমেটিক এলিভেটর। এলিভেটরে তিনতলায় উঠতে উঠতে ঠিক করলাম, আগে স্নান, তারপর খাওয়া–অবশ্যই ব্লু গার্ডেনে বসে আয়েস করে। তারপর মাইকেল। কিন্তু ওর পদবিটা কী হতে পারে? জ্যাকসন, না মধুসূদন দত্ত?
.
ব্লু গার্ডেনে। নামের মধ্যে যেমন একটা মিষ্টি সুর ও ছবি রয়েছে, চেহারাতেও তাই। বিশাল খোলা-হাওয়া রেস্তরাঁ। ব্যাবিলনের শূন্য উদ্যানের মতোই এই নীল উদ্যান। হোটেলের সদর দরজার দিকে মুখ করে তৈরি হওয়ার ফলে এখানে বসেই নদী দেখা যায়, টের পাওয়া যায় ছন্নছাড়া বাতাস। রোদ অথবা বৃষ্টি আড়াল করতে মাথার ওপরে উঁচু-নীচু পিরামিডের ঢঙে তৈরি স্বচ্ছ প্লাস্টিকের আচ্ছাদন। রেস্তোরাঁর শতকরা সত্তর ভাগ খোলা হাওয়ায়, আর বাকি তিরিশ ভাগ অন্দরে। সেই অংশে নাচ-গানের ডায়াস, বার কাউন্টার এবং কিচেন। আর খোলা অংশে টেবিল চেয়ার সাজানো।
রেস্তোরাঁয় ভিড় মাঝারি রকমের। একে বর্ষাকাল, তার ওপরে বেলা প্রায় দুটো। তাই হয়তো খদ্দের বেশি নেই তা ছাড়া এই রেস্তোরাঁয় আকাশছোঁয়া দামও একটা কারণ হতে পারে।
খাওয়া-দাওয়া সেরে নিলাম আয়েস করেই। খালি পেটে কখনও রিভলভার চালানো যায় না।
বেয়ারাকে বিল মেটাতেই একটা ক্যাশমেমো হাতে পেলাম। চেহারায় ঠিক লালুর ক্যাশমেমোর মতো। বেয়ারাটাকে ডেকে লালুর ক্যাশমেমোটা দেখিয়ে কয়েকটা প্রশ্ন করলাম। লোকটা কিছুই ঠিকমতো বলতে পারল না। তখন ওকে বললাম, তোমার নাম নিশ্চয়ই মাইকেল নয়?
বেয়ারাটা আমতা-আমতা করে বলল, না, স্যার। মাইকেল গান গায়, গিটার বাজায়। একটু আগেই ওর গান শেষ হয়েছে। আবার সন্ধেবেলা ওর শো শুরু হবে। আঙুল তুলে দূরের কোণের ডায়াসটাকে দেখিয়ে বলল, ওই স্টেজে।
মাইকেল এখন কোথায়? পকেট থেকে কার্ডটা বের করে বেয়ারাটাকে দেখলাম। ছোট্ট করে উচ্চারণ করলাম, লালবাজার।
লোকটা মুখ তালশাঁসের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেল। নাঃ, আজ দেখছি শুধু রামছাগলদের দিন।
লোকটা রীতিমতো কাঁপা গলায় বলল, মিউজিক রুমে, স্যার।
আমার ভুরু কুঁচকে গেল। জিগ্যেস করলাম, সেটা আবার কোথায়?
ওই যে, স্টেজের পাশের দরজাটা।
আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লাম। লুব্রিকেশান ফি হিসেবে দশ টাকা বের করলাম। লোকটাকে অনেক কষ্টে টাকাটা নিতে রাজি করালাম। টাকাটা বকশিশ হিসেবে দিয়ে কী ভেবে জিগ্যেস করলাম, তোমার নাম কী?
ক্ষুদিরাম, স্যার।
বাঃ! মাইকেল, তারপর ক্ষুদিরাম! আজ কি স্বাধীনতা দিবস না প্রজাতন্ত্র দিবস? কে জানে, নীচের ওই গাঁট্টাগোট্টা চশমাওয়ালার নাম রামমোহন অথবা প্রফুল্ল কি না!
ভেলভেট মোড়া সুদৃশ্য চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লাম। এবার অপারেশান মাইকেল।
কতকগুলো ব্যাপার আমাকে রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে। শরদিন্দু মিত্রের কাজের দায়িত্ব হাতে নেওয়ার পর কেউ আমাকে সাদা মারুতি নিয়ে ফলো করছিল। তারপর চুনি ব্যানার্জির লোক আমাকে শাসিয়েছে। আর সবশেষে লাল মারুতি ভ্যান নিয়ে লালুর অপঘাতে মৃত্যু।
