আমি আর সময় নষ্ট করলাম না। গাড়ি চালিয়ে মোরামের ওপর দিয়ে কচর-মচর শব্দ করতে করতে সোজা হোটেল বিল্ডিং-এর দিকে এগিয়ে গেলাম।
হোটেলের পেছনদিকে বিরাট খোলা জায়গা। সেখানেই কার পার্ক। কিন্তু এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে কোনও অ্যাটেনড্যান্টকে চোখে পড়ল না। কার পার্কে গাড়ি রেখে এসে প্রকাণ্ড কাচের দরজা ঠেলে হোটেলের অভ্যর্থনাকক্ষে ঢুকলাম। এবং ঢুকেই চমকে গেলাম।
হোটেলের প্রতিটি সাজসজ্জায় বিলাসিতার ছাপ। পাঁচতারা হোটেলে এক-আধবার যে ঢুকিনি তা নয়। তবে এর তারার সংখ্যা পাঁচের অনেক বেশি মনে হয়।
প্রকাণ্ড রিসেপশান হলের মেঝেতে নরম কার্পেট। একপাশে অনেকগুলো সোফা। তার পাশে পাশে ছোট-ছোট টবে ছায়াতরু। একটু দূরে রঙিন টিভি। হলের ডানদিকের শেষ প্রান্তে কাচের দেওয়াল। দেওয়ালের ওপাশে সাঁতার-দিঘি। সেখানে কলির কেষ্ট আর গোপিনীর দল জলকেলি করছে। গা-থেকে-জল-ঝরে-পড়া দু-একজন সুন্দরীকে দেখে বেশ ভালো লাগল। লক্ষ করলাম, সোফায় বসে খবরের কাগজ পড়ার ভান করে তিনজন ভদ্দরলোক সুন্দরীদের বেশ খুঁটিয়ে দেখছে।
ইচ্ছে থাকলেও ওসব দেখার খুব বেশি সময় আমার হাতে নেই। সুতরাং এগিয়ে গেলাম রিসেপশান ক্লার্ক দুজনের কাছে। গাড়ি থেকে আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী ব্রিফকেসটা নিয়ে এসেছি। ওটা কার্পেটের ওপরে দাঁড় করিয়ে রেখে অপেক্ষা করতে লাগলাম। মাথার মধ্যে ঘুরছে রুম নম্বর টু-জিরো-থ্রি।
ক্লার্ক দুজন যেন উত্তর এবং দক্ষিণ মেরু। একজন বেশ গাঁট্টাগোট্টা, অন্যজন রোগা। একজন ফরসা, অন্যজন কালো। একজনের চশমা, তো আর একজনের চশমা নেই। তবে দুজনেরই পরনে ছাইরঙা টেরিকটনের টিপটপ পোশাক। তার ওপরে হোটেল রিভারভিউর মনোগ্রাম এবং সারি সারি পেতলের বোতাম।
রিসেপশান কাউন্টারটা তিমির মতো লম্বা। আর তামা, পেতল, কাঠের তৈরি। যেখানে যেটা ব্যবহার করা উচিত, তাই ব্যবহার করা হয়েছে। সবটাই ঝকঝকে তকতকে।
আমাকে দেখেই গাঁট্টাগোট্টা এগিয়ে এল। মুখে ফুটিয়ে তুলল যান্ত্রিক হাসি। আমি ওকে বললাম যে, সেকেন্ড ফ্লোরে, মানে বাংলায় তিনতলায়, একটা ঘর চাই। সিঙ্গল বা ডবল, যে কোনও একটা হলেই চলবে।
লোকটা ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। ঘরের নম্বর লেখা খোপগুলো দেখল। কোনও কোনও খোপে পেতলের বিশাল টিকিট লাগানো চাবি ঝুলছে। আমি আগেই লক্ষ করেছি, দুশো তিন নম্বর খোপে চাবি নেই, আর দুশো সাত নম্বর খোপে চাবি ঝুলছে। ঘরটা খালি হতে পারে, আবার এমনও হতে পারে, দুশো সাতের বোর্ডার চাবি কাউন্টারে জমা দিয়ে হুগলির হাওয়া খেতে বাইরে গেছে।
লোকটা এবার খাতা খুলল। কী সব দেখেটেখে বলল, দুশো সাত নম্বর খালি আছে। সিঙ্গল বেড। ভাড়া নশো পঞ্চাশ টাকা–।
বোধহয় শেষ কথাটা বলল আমার চেহারা ও পোশাক দেখে। আমি পকেট থেকে টাকা বেরে করে গুনে উনিশশো টাকা দিলাম ওর হাতে। বললাম, দু-দিনের ভাড়া। পরে দরকার হলে দু-একদিন বেশি থাকব।
লোকটা টাকা নিয়ে রোগা সঙ্গীকে ডেকে বলল কাগজপত্র তৈরি করতে। তারপর দোতলায় ওঠার সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজন উর্দিপরা বেয়ারার একজনকে ইশারায় কাছে ডাকল। দুশো সাত নম্বরের চাবিটা তাকে দিয়ে বলতে যাচ্ছিল কী কী করতে হবে, আমি হেসে বাধা দিলাম। বললাম, আমি নিজেই পারব। তারপর চাবিটা নিয়ে পকেটে ঢোকালাম। বেয়ারাটা ব্যাজার মুখে চলে গেল। সিঁড়ির মুখে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল পাথরের মূর্তির মতো। আমি সামনের খোলা খাতায় নাম-ঠিকানা ইত্যাদি লেখার কাজ শেষ করলাম।
এবার আসল কাজ। গাঁট্টাগোট্টা লোকটাকে ইশারায় কাছে ডাকলাম। ও কৌতূহলী মুখে পালিশ করা কাউন্টারের ওপরে ঝুঁকে পড়ে আমার কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করল। জিগ্যেস করলাম, টেলিফোন করা যাবে একটা?
নিশ্চয়ই, স্যার– বলে কাউন্টারের ভেতরের তাক থেকে একটা নীল রঙের হালকা আধুনিক টেলিফোন বের করে কাউন্টারের ওপরে রাখল।
লোকাল থানার ফোন নাম্বার জানা নেই। অতএব লালবাজারে ফোন করে খুনের খবরটা দিলাম। নিজের পরিচয় জানালাম না। বললাম, লাশ গাড়িতে শুয়ে আপনাদের জন্যে অপেক্ষা করছে।
টেলিফোন শেষ করে গাঁট্টাগোট্টাকে ধন্যবাদ দিলাম। তারপর পকেট থেকে একটা আইডেনটিটি কার্ড বের করে পলকে ওর নাকের ডগায় খুলে ধরেই বন্ধ করে দিলাম। একইসঙ্গে জিগ্যেস করলাম, দুশোতিন নম্বরে কোন বোর্ডার আছে?
লোকটা বারকয়েক ঢোঁক গিলে খাতা উলটেপালটে দেখল। তারপর বলল, চুনিলাল ব্যানার্জি, স্যার। কাল থেকে এসে উঠেছে।
লক্ষ করলাম, লোকটার গলার স্বর কাঁপছে। একটা আইডেনটিটি কার্ডেই এই অবস্থা! তাও যদি কার্ডটা জেনুইন হত! এই রামছাগলটা ধরতে পারেনি যে, ওটা আমারই তৈরি। একটা আইডেনটিটি কার্ড বাজার থেকে কিনে তার ওপরে আমার পাসপোর্ট ফটো সেঁটে দিয়েছি। আর তার পাশে আমার নাম, বাবার নাম, জন্মতারিখ, সই ইত্যাদি যেমন থাকা উচিত ঠিক তেমনটি রয়েছে। আর সবচেয়ে যেটা জরুরি সেটা হল রাবার স্ট্যাম্প। আমাদের দেশের জনগণের রাবার স্ট্যাম্পে অগাধ বিশ্বাস। সুতরাং সেরকম জাতের একটা পুরোনো রাবার স্ট্যাম্প নিয়ে তার ধ্যাবড়া ছাপ ছেপে দিয়েছি আইডেনটিটি কার্ডের ওপরে। স্ট্যাম্পের মাঝখানে তিন সিংহের মূর্তির ছাপও আছে। নিছকই ভেঁতা আউটলাইন–শুধু সিংহ তিনটের আদলটুকুই বোঝা যায়। তবে রামছাগলকে বশ করতে এটুকুই যথেষ্ট আসল সিংহের কোনও দরকার নেই। সুতরাং কার্ডটা নিশ্চিন্তে পকেটে চালান করে দিলাম।
