আর বলতে হবে না। ও কায়দা আমরা জানি। তারপর কী হল? সুরেশ বলে উঠল।
যাই হোক, দরজা খুলে গেল। আমরা ভেতরে ঢুকলাম, আর তখনই দেখি–দেখি বিশ্বনাথ বিছানায় পড়ে আছে। স্পষ্ট বুঝলাম, ও মারা গেছে। আমি হয়তো চিৎকার করে উঠছিলাম, কারণ রূপেন ঠাস করে আমাকে এক চড় মেরে খিঁচিয়ে বলে উঠল, চুপ করো!
তারপর পাথরগুলো ও অনেক করে খুঁজল, কিন্তু বৃথাই। তখন রাগে আমার ওপর মারধোর শুরু করল। তারপর শাড়ির আড়ালে রিভলভার ধরে আমাকে ট্যাক্সি করে আবার নিয়ে এল এখানে।
আপনাকে বেঁধে রেখেছিল কেন? সুরেশ জানতে চাইল।
ওরা আমাকে খুন করবে ঠিক করেছে। রূপেনকে আমি সে কথা বলতে শুনেছি। ওদের মতলব আমি ফঁস করে দিই তা ওরা কোনওরকমে চায় না। তা ছাড়া রূপেনের ধারণা আমি ওদের মতলবের খবর কোনও না কোনওভাবে বিশ্বনাথকে জানিয়ে দিয়েছি।
ওরা এখন কোথায়? আমি প্রশ্ন করলাম।
জানি না। মিনিট কুড়ি আগে ওরা কোথায় যেন গেছে। হঠাৎই যমুনার দু-চোখ জলে ভরে উঠল। কান্না মেশানো গলায় ও বলল, ওরা আমাকে দিয়ে জোর করে এসব করিয়েছে। ওদের কথা না শুনলে ওরা আমাকে খুন করত। তা ছাড়া এমনিতেই তো আমাকে খুন করতে যাচ্ছিল। বিশ্বাস করুন, বিশ্বনাথকে আমি সত্যি ভালোবাসতাম!
সুরেশ এবং আমি অপলকে ওর দিকে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে রইলাম।
বিশ্বাস করুন প্লিজ। যমুনার চোখে যমুনা, মনে যমুনা : যা যা আপনাদের বলেছি তার প্রতিটি অক্ষর সত্যি।
বিশ্বাস করলাম।
তারপর ফোন করে রাওয়ের বাড়িটার নজর রাখার জন্যে আরও কয়েকজন লোক লাগিয়ে দিলাম এবং বললাম, রূপেন সরকার ও নরেশ রাওকে যেখান থেকে হোক, যে-কোনও
অবস্থায় তোক, হেডকোয়ার্টারে তুলে আনতে। তারপর মিসেস সরকারকে নিয়ে আমি ও সুরেশ রওনা হলাম লালবাজার অভিমুখে।
.
ও.সি.-র কাছে রিপোর্ট করতে যাওয়ার আগে নিজের টেবিলটায় একবার নজর বুলিয়ে নিলাম। দেখি ট্রেতে একটা রিপোর্ট পড়ে আছে। তুলে নিয়ে দেখি, শিভালকরের ঘরে পাওয়া কাচের গ্লাসের লিপস্টিক ছাপের রিপোর্ট। বলছে, শিভালকরের বিছানায় পাওয়া এল.সি. লেখা লিপস্টিক ও গ্লাসের লিপস্টিক একই। এ ছাড়া একটা অদ্ভুত খবরও আছে? গ্লাসের লিপস্টিকের ছাপ কোনও মেয়ের ঠোঁট থেকে লাগেনি, বরং মনে হয়, হাতের বুড়ো আঙুল বা তর্জনী দিয়ে কেউ গ্লাসের ওপর সেই ছাপ দিয়েছে। অটন্সি থেকে জানা গেছে, বিশ্বনাথ শিভালকর যখন মারা যায় তখন তার রক্তে অ্যালকোহলের পরিমাণ ছিল পয়েন্ট ফাইভ পার্সেন্ট। এবং ডাক্তারি রিপোর্ট বলছে, কোনও ভেঁতা অস্ত্র দিয়ে নাকের গোড়ায় আঘাত করার ফলেই শিভালকর মারা গেছে।
রিপোর্টে চোখ বোলানো শেষ হতেই সুরেশ নন্দা ঘরে এসে ঢুকল। বলল, স্যার, ওদিকে মিসেস সরকারের স্টেটমেন্ট নেওয়া কমপ্লিট। আর আশু চক্রবর্তী লিপস্টিকের জহুরি ছাপের খবর এনেছে। সুখবরই বলতে হবে। কারণ শুধু যে ও জহুরির নামই পেয়েছে তা নয়, লিপস্টিকের মালকিকেও খুঁজে বের করেছে। ললিতা চৌধুরি, বালিগঞ্জ প্লেসে থাকে।
এ.এস.আই. আশু চক্রবর্তীকে সুরেশই বোধহয় লিপস্টিক তদন্তে লাগিয়ে থাকবে। সুতরাং প্রশ্ন করলাম, চক্রবর্তী মেয়েটার সঙ্গে কথা বলেছে?
হ্যাঁ। ললিতা চৌধুরির বক্তব্য, লিপস্টিকটা তার বয়ফ্রেন্ড অসীম সরকারের উপহার। অসীম সরকার বড়লোকের ছেলে, কন্সট্রাকশনের বিজনেস। তা ছাড়া লিপস্টিকটা ললিতাকে গিফট সার্টিফিকেট করে দেওয়া আছে।
চক্রবর্তী ললিতা চৌধুরিকে আগে থাকতে না ঘাঁটালেই পারত। যদি সত্যিই মেয়েটা অপরাধী হয় তা হলে এখন সতর্ক হয়ে যাবে। যাই হোক, দুশ্চিন্তা ছেড়ে প্রশ্ন করলাম, ললিতা চৌধুরি ব্লু-স্টার হোটেলে কবে গিয়েছিল?
আর বলবেন না। হাসল নন্দা ও মেয়েটা নাকি এক নম্বরের মিথ্যেবাদী। আশু চক্রবর্তীকে প্রথমে ও বলে, ও কোনওদিন ব্লু-স্টার হোটেলে যায়নি। কিন্তু অনেক সময় নষ্টের পর স্বীকার করে যে, ও গিয়েছিল প্রায় মাসখানেক আগে। কিন্তু কার সঙ্গে সেটা বলতে চাইছে না। তারপর নাকি ওই হোটেলের ছায়াও আর মাড়ায়নি। ওঃ, গল্প বটে একখানা!
ঠিক আছে, মেয়েটার সঙ্গে আমি পরে একবার কথা বলব। আমি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলাম, টেবিলে টোকা মেরে একটা তাল বাজিয়ে চললাম। মনে চিন্তার সূক্ষ্ম রেখা সাপের মতো এঁকেবেঁকে এগিয়ে চলেছে। মিথ্যে কথা যে কেউ একজন বলছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু আমার কেমন যেন মনে হচ্ছে সেই একজন ললিতা চৌধুরি নয়। তা হলে কে?
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। সুরেশকে বললাম, মিসেস সরকারের জন্যে একজন উকিলের ব্যবস্থা করতে।
ও অবাক হল। বলল, আপনি কোথায় যাচ্ছেন?
বললাম, মিথ্যে কথার ধাঁধায় কেউ একজন আমাদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছে। একটা হেস্তনেস্ত করা দরকার। একটু থেমে আরও যোগ করলাম : মিসেস সরকার ও.সি.-র ঘরে আছেন। দেখো যেন কোনওরকম অসুবিধে না হয়।
সুরেশ নন্দা প্রথমটা অবাক হল, তারপর সামলে নিয়ে বলল, আমি আপনার সঙ্গে যাব?
ভয়ের কোনও কারণ নেই, সুরেশ। রিভলভারটা ঠিকমতো আছে কি না পরীক্ষা করে নিলাম। তারপর বললাম, তা ছাড়া একজনের এখানে থাকা দরকার। বলা যায় না, হঠাৎ যদি রূপেন সরকার বা নরেশ রাওয়ের খবর আসে।
একতলায় নেমে এলাম। একটা প্রাইভেট কার বেছে নিয়ে রওনা হলাম। চোখের সামনে যেন দেখতে পেলাম বিশ্বনাথ শিভালকরের লাশটা চিৎপাত হয়ে পড়ে আছে।
