.
ব্লু-স্টার হোটেলে যখন পৌঁছলাম তখন রিসেপশন কাউন্টার সুজি গোমেজ-শূন্য। কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। রাত বেশি না হলেও হোটেলের পরিবেশে কেমন এক অদ্ভুত নীরবতা থমথম করছে। তার কারণ কি বেমরসুম? কী জানি, জানি না।
কাউন্টারের ওপাশে প্রতাপ অ্যাডভানির ঘরে আলো জ্বলছে। দরজার তলা দিয়ে সেই আলো স্পষ্ট চোখে পড়ছে। ঘরের ভেতরে কারও চলাফেরার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। চুপি চুপি কাউন্টারের ওপারে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। আস্তে হাতের চাপ দিয়ে দরজা সামান্য ফাঁক করলাম। ঘরের দৃশ্য দেখার পক্ষে ইঞ্চি তিনেকই যথেষ্ট।
প্রতাপ অ্যাডভানি অত্যন্ত ব্যস্তভাবে একটা সুটকেস গোছগাছ করছেন। পরনের পোশাক দেখে মনে হয় এক্ষুনি বাইরে কোথাও বেরোবেন। একবার ছুটে আসছেন বিছানার ওপর রাখা খোলা সুটকেসের কাছে, আর একবার ছুটে যাচ্ছেন আলমারির কাছে। যেন হাতে অনেক কাজ, কিন্তু তুলনায় সময় অনেক কম।
আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, মিস্টার অ্যাডভানি? ঘরের ভেতরে পা রেখে হালকা স্বরে বললাম।
বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে দাঁড়ালেন অ্যাডভানি। আমার মুখোমুখি। মুহূর্তে ওঁর চোয়াল ঝুলে পড়ল, কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিলেন। রুক্ষভাবে জানতে চাইলেন, কী ব্যাপার? কারও ঘরে যে নক করে ঢুকতে হয় সেটুকুও জানা নেই?
আছে। আমি বললাম, কিন্তু আমাদের বন্ধুত্বের কথা ভেবে সেটা প্রয়োজন মনে করিনি।
একটা প্লেনের টিকিট বাঁ-পাশের একটা টেবিলে পড়ে ছিল। সেটা তুলে নিয়ে নামটা পড়লাম। জনৈক অমৃত নাথানির নামে একটা বম্বের টিকিট।
শুধু যাওয়ার টিকিট? আমি মন্তব্য করলাম।
হোটেলের একজন গেস্টের। কিন্তু এসবের মানে কী, ইন্সপেক্টর?
আর যে-সুটকেসটা গোছগাছ করছেন ওটাও বোধহয় সেই গেস্টেরই?
যারই হোক, আপনার জানার কোনও দরকার নেই। ইচ্ছে হলে কোথাও যেতে পারব না এমন কোনও আইন এ দেশে আছে কি?
থাকতে পারে। বিশেষ করে পুলিশি তদন্তে যারা বাধার সৃষ্টি করে তাদের জন্যে তো বটেই।
বাধার সৃষ্টি? সে আবার কী? আপনার কাজে কোথায় বাধা দিয়েছি আমি?
মিথ্যে কথা বলে আমাকে ভুল পথে চালানোর চেষ্টা করে। আপনি বলেছেন, চারটে নাগাদ বিশ্বনাথ শিভালকরকে প্যাটেল নামে কেউ ফোন করেছিল।
তাতে কী হয়েছে?
প্যাটেল বলে কেউ নেই, মিস্টার অ্যাডভানি। আর বিশ্বনাথ শিভালকর সেদিন ফোনে কোনও কথাই বলেননি। মদ খাওয়া তার অভ্যেস ছিল না, কিন্তু সেদিন হোটেলের ঘরে বসে তিনি প্রচুর মদ খেয়েছিলেন। আর মরবার সময় তার রক্তে অ্যালকোহল ছিল পয়েন্ট ফাইভ পার্সেন্ট। চারটের সময় তিনি যে শুধু মদে চুর ছিলেন তা নয়, কথা বলবার জন্যে মুখ হাঁ করার ক্ষমতাও তাঁর ছিল না। একটু থামলাম। তারপর বললাম, আপনি মিথ্যে কথা বলেছিলেন কেন, মিস্টার অ্যাডভানি?
না–আমি–মানে—আমি–।
তারপর ধরুন ওই লিপস্টিকের ব্যাপারটা। ওটা আপনি মিস্টার শিভালকরের বালিশের ফাঁকে রেখে দিয়েছিলেন। মাসখানেক আগে ললিতা চৌধুরি নামে একটি মেয়ে এই হোটেলে এসে ওই লিপস্টিকটা হারায়। আপনি সেটা পেয়ে আপনার টুকিটাকি রাখার পিচবোর্ডের বাক্সে রেখে দেন–যে-বাক্স থেকে আপনাকে আমি জেলুসিল ট্যাবলেট বের করে দিয়েছিলাম। কিন্তু যেটাকে আপনি আট-দশ টাকাওয়ালা গোল্ড প্লেটেড অ্যালুমিনিয়াম লিপস্টিক ভেবেছিলেন, সেটা সত্যিই ছিল সোনার তৈরি, গায়ে সুন্দর খোদাইয়ের কাজ করা।
আমাকে বাধা দিয়ে প্রতাপ অ্যাডভানি বললেন, বুঝেছি, আপনি আমাকে ওই খুনের দায়ে ফাঁসাতে–।
খুন বলছেন কেন? মোলায়েম সুরে বললাম, আপনার তো দৃঢ় বিশ্বাস ছিল বিশ্বনাথ শিভালকর আত্মহত্যা করেছে।
প্রতাপ অ্যাডভানির মুখে ঘাম, চোখ চঞ্চল। কিন্তু কোনও উত্তর দিলেন না।
আমি বললাম, আরও একটা কথা। হাতে করে কিছুটা লিপস্টিক আপনি একটা গেলাসের কানায় লাগিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে আমরা ভাবি, মিস্টার শিভালকরের ঘরে কোনও মেয়ে দেখা করতে এসেছিল। এতেই আমি একটু অবাক হয়েছি, মিস্টার অ্যাডভানি। আপনি কেন এত কষ্ট করতে গেলেন?
আমি–কথা শুরু করেও থমকে গেলেন অ্যাডভানি। চোখে আগুন নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে দাঁড়িয়ে রইলেন।
বিছানার কাছে এগিয়ে গেলাম। খোলা সুটকেস থেকে জামাকাপড়ের প্রথম থাকটা তুলে ফেললাম। হ্যাঁ, জায়গামতোই জিনিসটা পেলাম। কালো চামড়ার ছোট পাউচ একটা। আমার বিশ্বনাথ শিভালকরের কথা মনে পড়ল। পাউচটা চোখে পড়ার মুহূর্তেই পিঠে অ্যাডভানির রিভলভারের খোঁচা অনুভব করলাম। আমরা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। প্রায় দশ সেকেন্ড সব চুপচাপ। আমরাও নিশ্চল। তারপর…।
বাথরুমে গিয়ে ঢুকুন, অ্যাডভানি আদেশ দিলেন।
আমি বললাম, কী লাভ? গুলির শব্দ এ-হোটেলের প্রতিটি বোর্ডার শুনতে পাবে।
পাক। ক্ষতি নেই। দাঁতে দাঁত চেপে তিনি বললেন, এগোন, মিস্টার বরাট।
কাঁধ ঝাঁকিয়ে খুব ধীরে একটা পা ফেললাম বাথরুমের দিকে আর পরমুহূর্তেই মেঝেতে শুয়ে পড়লাম এবং গড়াতে-গড়াতে নিজের রিভলভারটা বের করে নিতে চেষ্টা করলাম।
অ্যাডভানির প্রথম গুলিটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হল, কিন্তু দ্বিতীয়টা আমার বাঁ-হাতের বাইসেপ ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল। তারপর আমার রিভলভার সক্রিয় হল। এবং পেটে লাগা গুলির ধাক্কায় প্রতাপ অ্যাডভানির শরীরটা হাতচারেক পেছনে ছিটকে পড়ল।
