পাশের ফ্ল্যাটের বারান্দা দিয়ে কার্নিশ বেয়ে পা টিপে টিপে রাওয়ের ফ্ল্যাটের দিকে এগোলাম। যেন দীর্ঘ কয়েক বছর পর ফ্ল্যাটের পেছনের কাচের জানলার সামনে এসে দাঁড়ালাম। আর একটু এগোলেই বারান্দার ভাঙা রেলিং।
কিন্তু জানলার পরদায় সামান্য ফাঁক ছিল। সুতরাং ঘরের ভেতর উঁকি মারলাম।
শ্যাম সরজানার ফ্ল্যাটে দেখা ছবির সেই মেয়েটি তার শীতল সৌন্দর্য নিয়ে উপস্থিত। কিন্তু পরিস্থিতি ভিন্ন হওয়ায় সেই বাঁকা হাসির রেখাঁটি ওর ঠোঁট থেকে মিলিয়ে গেছে। কারণ হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আলুথালু বেশে ঘরের বিছানায় ও পড়ে আছে মুখে কাপড় গোঁজা থাকায় টু শব্দটি পর্যন্ত করতে পারছে না।
সুতরাং মিসেস যমুনা সরকারের দেখা পেলাম।
বাঁধন নিয়ে ধ্বস্তাধ্বস্তি করার ফলে ওর সোনালি সিল্কের শাড়ি অনেকটা উঠে গেছে। এবং প্রকাশিত হয়ে পড়েছে পায়ের গোছ, ফরসা ঊরু ইত্যাদি।
জানলাটা চেষ্টা করেও খুলতে পারলাম না। ভেতর থেকে বন্ধ। কোমরের হোলস্টার থেকে ৩৮ পুলিশ স্পেশাল বের করে জানলার কাঁচে আঘাত করলাম। ঝনঝন শব্দে কাঁচ ভেঙে পড়ল ঘরের ভেতর। একলাফে ঘরে ঢুকলাম। ছুটে গেলাম শোবার ঘরের দরজার দিকে।
ফ্ল্যাটের দরজা টেনে খুলতে যাব, দড়াম করে দরজা ভেঙে লাফিয়ে ঘরে ঢুকল সুরেশ নন্দা, হাতে উদ্যত রিভলভার।
কাঁচ ভাঙার শব্দ শুনে ও আর দেরি করেনি।
শুন্য ঘরে আমরা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। কারও মুখে কথা নেই।
কিসের আওয়াজ হল? আচমকা চেঁচিয়ে উঠল সুরেশ, শুনতে পাননি?
শোবার ঘরে যমুনা সরকার হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে, আমি বললাম, আমরা ওর ধ্বস্তাধ্বস্তির শব্দ শুনেছি। বাঁধন খোলার চেষ্টা করছিল।
যমুনা সরকার? এখানে?
হ্যাঁ। মাথা নেড়ে বললাম, পরনে চোখ-ধাঁধানো সোনালি সাউথ ইন্ডিয়া সিল্ক। ব্লু স্টারে যে-মেয়েটি শিভালকরের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল তারও পরনে একই শাড়ি ছিল।
ইতিমধ্যে হট্টগোলের শব্দে অন্যান্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা চারপাশে এসে ভিড় জমিয়েছে। এখন তারা হাঁ করে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আমাদের দেখছে।
তাদের আমি বললাম, আপনারা দয়া করে চলে যান। এ পুলিশের ব্যাপার।
মিসেস যমুনা সরকার আতঙ্কে উত্তেজনায় হিস্টিরিয়াগ্ৰস্তা হয়ে পড়েছেন। শান্ত ও স্বাভাবিক হয়ে উঠতে ওর মিনিটদশেক সময় লাগল। তারপর আমাদের শোনাল ওর কাহিনি। মাঝেমধ্যে অবশ্য খেই হারিয়ে ফেলতে লাগল। অবশেষে, বহু জোড়াতালি দিয়ে গোটা গল্পটা আমরা উদ্ধার করলাম।
ওর কথা অনুযায়ী, এক ঝুটো কিডন্যাপিংয়ের ঘটনায় জোর করে ওকে রাজি করানো হয়েছে। ক্রিমিনাল মেন্টাল হসপিটালে থাকাকালীন যমুনার স্বামী রূপেন সরকার বিশ্বনাথ শিভালকরের সঙ্গে ওর গোপন প্রেমের ব্যাপারটা জানতে পারে। রূপেন সরকারকে যমুনা ভীষণ ভয় করে। কারণ, তাকে ছেড়ে আসার পর থেকেই যমুনার প্রতি রূপেনের আক্রোশ ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। সুতরাং, চারদিন আগে হসপিটাল থেকে ছাড়া পেয়ে সে নরেশ রাওয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে, এবং দুজনে মিলে ঠিক করে, যমুনার প্রতি শিভালকরের দুর্বলতার চরম দাম তুলবে। আর একইসঙ্গে যমুনার ব্যভিচার-এর শোধ নেবে।
শিভালকরের মৃত্যুর আগের দিন রাতে রূপেন ও নরেশ যমুনাকে জোর করে ধরে নিয়ে যায়, নরেশ রাওয়ের ফ্ল্যাটে নিয়ে তোলে। তারপর খুনের হুমকি দেখিয়ে পরদিন ভোরবেলা ওকে দিয়ে বিশ্বনাথকে ফোন করায়। এই ফোনের কথা আমরা সরজানার কাছে শুনেছি। যমুনা বিশ্বনাথকে বলে যে, ওকে কিডন্যাপ করা হয়েছে, এবং সে যদি সহজে বিক্রি করা যাবে এমন কতকগুলো ছোট ছোট মণিরত্নের ব্যবস্থা করতে পারে, তা হলেই যমুনাকে বাঁচাতে পারবে, নয়তো নয়। পাথরগুলোর দাম অন্তত দেড় লাখ টাকা হওয়া চাই। বিশ্বনাথের নিজেরও তেমন ক্ষতি হওয়ার ভয় নেই। কারণ তার ইনশিয়োরেন্স কোম্পানি থেকেই সে পাথরের দাম পেয়ে যাবে। বিশ্বনাথকে শুধু বানিয়ে বলতে হবে যে, দুজন সশস্ত্র লোক রিভলভার নিয়ে তাকে অন্ধকারে আক্রমণ করে ও পাথরগুলো কেড়ে নেয়। তারপর একটা নীল মারুতি করে পালিয়ে যায়। না, অপরাধীদের সে চিনতে পারেনি।
এই দেড়লাখ টাকার পাথর একটা শ্যাময়-লেদার ব্যাগে ভরে বিশ্বনাথ শিভালকর সি. আই. টি. রোডের ব্লু স্টার হোটেলে গিয়ে উঠবে। না, ছদ্মনামে নয়, নিজের নামে সেখানে সে একটা ফোন পাবে। সেই ফোনেই বলে দেওয়া হবে পাথরগুলো কোথায় কীভাবে সে পৌঁছে দেবে। কিন্তু রূপেন সরকার ব্লু-স্টারে ফোন করে কথামতো শিভালকরকে পায়নি। তখন সে ভীষণ খেপে যায়।
যমুনা সরকার উত্তেজিত গলায় বলল, আমি যে কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। কিছু একটা করতে হবে–শুধু এটাই মনে হচ্ছিল। তারপর হঠাৎই ফ্ল্যাটের বাইরে বেরোনোর একটা সুযোগ পেয়ে গেলাম। ব্যস, বেরিয়ে পড়লাম।
তারপর? সুরেশ নন্দা প্রশ্ন করল।
আমার স্বামী যখন ব্লু-স্টারে বিশ্বনাথের রুম নাম্বারটা নরেশ রাওকে বলে, তখন আমি শুনতে পেয়েছিলাম। সুতরাং একটা ট্যাক্সি ধরে ব্লু-স্টারে গেলাম। হাজার ধাক্কা মেরেও বিশ্বনাথের ঘরের দরজা কেউ খুলল না। এমন সময় পেছনে কারও পায়ের শব্দ পেলাম–তাকিয়ে দেখি আমার স্বামী দাঁড়িয়ে, তার হাতে একটা রিভলভার। ভাবলাম, ও বোধহয় আমাকে তক্ষুনি খুন করবে কারণ ওর দু-চোখে তখন খুনের আগুন জ্বলছে। কিন্তু দেখলাম, ও রিভলভারটা পকেটে রেখে চাপা গলায় বলল, যেভাবেই হোক পাথরগুলো আমার চাই। বলে একটা প্লাস্টিকের পাত বের করে বিশ্বনাথের ঘরের দরজা ও খুলে ফেলল। দরজার হাতলের কাছে ফ্রেম ও দরজার ফাঁকে পাতটা ও ঢুকিয়ে দিয়েছিল। তারপর কী যেন একটা করতেই
