সুরেশকে শ্যাম সরজানা ও কবিতা পারেখের ইন্টারভিউ সংক্ষেপে শোনালাম। তারপর বললাম, শ্যাম সরজানা, কবিতা পারেখ, যমুনা সরকার, নৃপেন দত্ত এবং বিশ্বনাথ শিভালকরের নামে পার্সোনাল ফাইল খুলতে। আর প্রথম চারজন সম্পর্কে অপারেশনাল অ্যাক্টিভিটিজ যেন এই মুহূর্তে শুরু হয়।
আই ওয়ান্ট দ্য ফাইলস টু বিকাম থিক বাই টুমরো নুন–শার্প।
পরদিন সন্ধ্যায় সব খবরই পাওয়া গেল।
অন্য তিনজন আইনের চোখে নিষ্পাপ নাগরিক সার্টিফিকেট পেলেও যমুনা সরকার আমাদের অবাক করল। তদন্তে জানা গেছে, ও বিবাহিতা, এবং ওর স্বামী এক জেল খাটা দাগি আসামি। তার নাম রূপেন সরকার। মাত্র চারদিন আগে সে ক্রিমিনাল মেন্টাল হসপিটাল থেকে ছাড়া পেয়েছে।
রূপেন সরকারের কীর্তির ইতিহাস খুলে দেখা গেল, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, কিডন্যাপিং ইত্যাদি সে-ইতিহাসের প্রথম পরিচ্ছেদ। এবার সে ধরা পড়েছিল সশস্ত্র ডাকাতির অভিযোগে। তার অপরাধের একমাত্র সঙ্গী নরেশ রাও। রূপেনের বর্তমান ঠিকানা জানা যায়নি, তবে নরেশ রাও বর্তমানে আছে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের আট নম্বর বাড়িতে। ওটাই তার বরাবরের ডেরা।
ফাইলগুলো আমার পড়া শেষ হলে সুরেশ বলল, শিভালকর কি জানত, ওর গার্লফ্রেন্ডের একটা স্বামী আছে?
আর সেই স্বামী পুলিশের হাত থেকে ছাড়া পেয়েছে মাত্র চারদিন আগে! নাটক দারুণ জমে উঠেছে, সুরেশ।
উঠে গিয়ে ফোন তুলে নিলাম। অপারেশন ডিভিশনকে বললাম রূপেন সরকারকে যেখান থেকে তোক পিক আপ করতে। তারপর বেরোনোর জন্যে তৈরি হলাম।
সুরেশকে বললাম, চল, মিসেস যমুনা সরকারকে একবার দর্শন দিয়ে আসি। অনেকক্ষণ ওকে বঞ্চিত করে রেখেছি।
.
কিন্তু ঘটনাচক্রে মিসেস যমুনা সরকার সত্যিই বঞ্চিত থেকে গেল, কারণ ও বাড়ি ছিল না।
তদন্তে জানা গেছে, যমুনা সরকার রূপেন সরকারের সঙ্গে থাকে না, এবং স্বামীর গুণের কথা চিন্তা করেই হয়তো নিজেকে এখনও কুমারী বলে ঘোষণা করে চলেছে। ওর পার্ক সার্কাসের ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখলাম তালা বন্ধ। সুরেশের দিকে এক পলক তাকালাম ও অর্থাৎ ঠিকানা জানতে ও ভুল করেনি তো! ও আমার নীরব সংশয় বুঝতে পেরে বলল, এই ফ্ল্যাটেই উনি থাকেন। নো মিসটেক।
নরেশ রাওয়ের ফ্ল্যাটে গিয়েও একই ফল হল। রাও বাড়িতে নেই। তা হলে কি ও রূপেনের সঙ্গে দেখা করতে গেছে?
সিঁড়ি নামতে নামতে সুরেশকে বললাম, এই রেটে যদি তদন্ত এগোতে থাকে তা হলে আমাদের রিটায়ার করতে আর বেশি দেরি নেই।
ধর্মতলা পোস্ট অফিস থেকে ডিপার্টমেন্টে ফোন করলাম। বললাম, যমুনা সরকার কিংবা নরেশ রাওকে পেলেই সঙ্গে সঙ্গে থানায় হাজির করতে। এ ছাড়া দুজন সাদা পোশাক ডিটেকটিভকে ওদের ফ্ল্যাটের ওপর নজর রাখতে বললাম। তারপর আমরা গাড়িতে উঠলাম।
আমি চালাচ্ছি, ড্রাইভারের সিটে উঠে বসল সুরেশ, জিগ্যেস করল, কোথায় যাবেন এখন?
নিয়ের এক জগন্নাথ সরকার লেন। খিদিরপুর।
নৃপেন দত্ত? সুরেশই ঠিকানাটা খুঁজে বের করেছে, তাই ও জানে।
হ্যাঁ। শিভালকরের রক্তের প্রতিদ্বন্দ্বী। ওকে বললাম।
সুরেশ না দীর্ঘশ্বাস ফেলল : বেচারা শিভালকর। এই শহরে কে যে ওর বন্ধু ছিল তা শুধু ঈশ্বরই জানেন!
নৃপেন দত্তর বয়েস প্রায় পঁয়তাল্লিশ। মাথার দুপাশের চুলে পাক ধরেছে। দীর্ঘকায় বলেইহয়তো শরীরের কাঠামো কিছুটা ঝুঁকে পড়েছে। ঠিকরে আসা চোখের ওপর রিমলেস চশমা। প্রত্যেক প্রশ্নেরই চটপট উত্তর দিল সে–শুধু একটা প্রশ্ন ছাড়া ও চারটে থেকে পাঁচটার মধ্যে সে কোথায় ছিল। সে বলল, ওই সময়টা সে গঙ্গার ধারে পায়চারি করে বেড়াচ্ছিল। এবং হীরে কেনাবেচার কথা ভাবছিল।
আর বিশ্বনাথ শিভালকরের সঙ্গে তার মন কষাকষির ব্যাপারটা? না, না, ওটা নিছকই ভুল বোঝাবুঝি। তার বেশি কিছু নয়। পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে সে শিভালকরের কাছে ক্ষমাও চেয়েছিল। আর সেইখানেই ওই ঘটনার ইতি।
হেডকোয়ার্টারে ফোন করে জানতে চাইলাম নতুন কোনও খবর আছে কি না। জানা গেল, আছে।
নরেশ রাওয়ের ফ্ল্যাটের ওপর যাকে নজর রাখতে বলেছিলাম একটু আগে সে ফোন করে বলেছে, নরেশ রাওয়ের সঙ্গে চেহারার বিবরণ মেলে এমন একটি লোককে ওই ফ্ল্যাটে ঢুকতে দেখা গেছে।
.
রাওয়ের বাড়িটা আকৃতিতে পাঁচতলা, প্রকৃতিতে ধর্ষিতা কুমারী। একতলার প্রতিটি কাচের জানলায় আঠা দিয়ে কাগজের টেপ লাগানো। বাড়ির দরজায় আবর্জনার স্তূপ। বারান্দার রেলিং কোথাও আছে কোথাও নেই, এবং এককালে বাড়িটার কী রং ছিল এ প্রশ্ন তুলে অনেকের সঙ্গেই বাজি লড়া যায়।
দরজা খোলাই ছিল, সুতরাং ভেতরে ঢুকতে কোনও অসুবিধে হল না। নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটের দরজায় গিয়ে নক করলাম। সাড়া নেই।
কিন্তু ভেতরে যেন কারও নড়াচড়ার শব্দ পেলাম।
দরজায় ধাক্কা দিলাম।
কেউ সাড়া দিল না, আর নড়াচড়ার শব্দটাও যেন হঠাৎ থেমে গেল।
দরজা খুলুন! পুলিশ! আমি বললাম।
ভদ্রভাষায় দরজা খুলবে না, সুরেশ বলল, তারপর এগিয়ে এসে দরজায় একটা মাঝারি লাথি কষিয়ে দিল। একই সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, ওপেন আপ! পুলিশ!
প্রায় পনেরো সেকেন্ড কেটে গেল।
সুরেশকে দরজার কাছ থেকে সামান্য সরিয়ে এনে বললাম, এখানে দাঁড়াও। আমি পাশের ফ্ল্যাটের বারান্দা দিয়ে রাওয়ের ফ্ল্যাটে ঢুকছি। যদি সেরকম কোনও শব্দ পাও সটান দরজা ভেঙে ঢুকে পড়বে।
