আমি সেকথা বলিনি, মিস পারেখ।
বলতে হয় না, আপনার কুৎসিত মুখে সে কথা স্পষ্ট লেখা রয়েছে।
আমাদের লালবাজারে কুৎসিত হাজত-ঘরও আছে। হয়তো সেখানেই আপনার উত্তর দিতে সুবিধে হবে।
সত্যি কথা বলতে গেলে, আমি খুন করিনি এবং আরও সত্যি কথা বলতে গেলে, খুনটা করতে পারলে আমি খুশিই হতাম।
অথচ আপনিই একদিন মিস্টার শিভালকরকে বিয়ে করার জন্যে পাগল হয়েছিলেন।
শ্যাম সরজানা তা হলে কিছুই বলতে বাকি রাখেনি দেখছি!
মিস পারেখ, আপনি সময় কাটান কী করে?
ডিজাইনারের কাজ করি। লিপস্টিক, বেল্টের বাল, চশমার ফ্রেম, পারফিউমের শিশি, গয়নাগাটি–এইসব।
আজ বিকেলে আপনি কোথায় ছিলেন? চারটে থেকে পাঁচটার মধ্যে?
ও–ওই সময়েই বুঝি বিশ্বনাথ খুন হয়? কবিতা পারেখ বলল।
প্রশ্নের উত্তর দিন।
সারাদিন বাড়িতে বসে কাজ করছিলাম। ইচ্ছে হলে দাদাকে জিগ্যেস করতে পারেন। যদুর শুনেছি, মিস্টার শিভালকরকে আপনি খুন করবেন বলে ভয় দেখিয়েছিলেন।
সরজানা নিশ্চয়ই এটাও বলতে বাকি রাখেনি! সোজা হয়ে বসল কবিতা। হাঁটুর কাছে শাড়িটা টেনে ঠিক করল।
শুধু বিয়ে করতে রাজি হয়নি বলে কোনও মেয়ে তার প্রেমিককে খুন করবে বলে শাসিয়েছে, এমনটা বেশি শোনা যায় না।
শুধু বিয়ে করতে রাজি হয়নি বলে! আপনি এমনভাবে বলছেন যেন ব্যাপারটা অনেকটা সিনেমায় যেতে রাজি না হওয়ার মতো তুচ্ছ। কবিতা পারেখের মুখ লাল হল। ওর কথার সুরে অহঙ্কার উঁকি মারল? তা ছাড়া আমি আর পাঁচটা মেয়ের মতো নই। এ ধরনের ফাজলামি আমি বরদাস্ত করি না।
আর কিছু!
কবিতার কালো চোখের তারায় আগুন জ্বলে উঠল সত্যি, আপনার তুলনা নেই! এ ছাড়া আর কী ও করবে? আমায় ফাঁসি দেবে?
যমুনা সরকার বলে কাউকে চেনেন?
না। একটু থেমে ও বলল, কেন, চেনা উচিত?
প্যাটেল নামটা আগে শুনেছেন?
না। যদি অবশ্য বল্লভভাই প্যাটেল না হন।
ব্যঙ্গের খোঁচাটা গায়ে মাখলাম না। জিগ্যেস করলাম, ব্লু স্টার হোটেলে কখনও গেছেন?
নামই শুনিনি।
আপনার সাউথ ইন্ডিয়া সিল্কের কোনও শাড়ি আছে? সোনালি রঙের?
না।
মিস্টার শিভালকরের মৃত্যুতে খুশি হয় এমন কারও নাম বলতে পারেন?
হ্যাঁ। আমি।
মিস পারেখ, এবার অন্তত একটু নরম হন।
উত্তরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল কবিতা। গালে হাত দিয়ে পায়চারি করতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর ধীরে-ধীরে বলল, এক নম্বর হল, ওই অপদার্থটা। শ্যাম সরজানা। ও বিশ্বনাথকে দেখতে পারত না। ভীষণ ঘেন্না করত।
কেন?
আমার জন্যে। শ্যামের কাছ থেকে বিশ্বনাথ আমাকে ছিনিয়ে নিয়েছিল। একথা নিশ্চয়ই ও বলেনি, কী বলেন? অর্থবহভাবে একটু থামল কবিতা, তারপর বলল, ব্যাপারটা শ্যামের মনে খুব লেগেছিল। ও একেবারে ভেঙে পড়েছিল। কাজে বেরোনো পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছিল। বাঁকা চোখে আমার দিকে তাকাল কবিতা। একটু ভুরু উঁচিয়ে হাসল ও এবার বুঝেছেন?
এরপরেও ওঁরা একসঙ্গে থাকতেন?
তাতে কী?
কবিতা পারেখকে আরও কয়েকটা প্রশ্ন করলাম কিন্তু কাজে লাগার মতো কোনও উত্তর পেলাম না। সুতরাং যাওয়ার জন্যে উঠে দাঁড়ালাম।
সাহায্যের জন্যে ধন্যবাদ, মিস পারেখ, আমি বললাম, দরকার হলে আপনার সঙ্গে আবার দেখা করতে আসব।
নিশ্চয়ই আসবেন। আর সুসংবাদ শোনানোর জন্যে আপনাকেও ধন্যবাদ—
.
হোমিসাইড স্কোয়াডে যখন ফিরলাম, অফিসের বড় দেওয়ালঘড়িতে তখন নটা চল্লিশ। সুরেশ নন্দা ইতিমধ্যে ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্টটা টাইপ করিয়ে নিয়েছে। একটা চেয়ারে গা এলিয়ে বসে সেটাতেই চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিল, আমাকে দেখে চোখ তুলে তাকাল। ঠিক পাখার নীচে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে আমি ধপ করে বসে পড়লাম। ওকে প্রশ্ন করলাম, হোটেলে কেমন গেল?
সব শান্তি মতো মিটে গেছে। শিভালকরের ঘরে সিল মেরে দিয়েছি।
কিছু পেলে?
না, ঘরে কিছু পাইনি। কাচের গেলাস, হুইস্কির বোতল, থাস আপের বোতল, কোনওটাতেই কোনও ছাপ নেই। কেউ পরিষ্কার করে ওগুলো মুছে রেখে গেছে। তবে অন্য জিনিসের সঙ্গে ওগুলোও ল্যাবে পাঠিয়েছি।
ভালো। আর লিপস্টিকটা? ওটা কার দোকানে তৈরি জানা গেল?
সুরেশ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল : একটু আগেই জানতে পেরেছি। বউবাজারে খবর নিতেই সব বেরিয়ে পড়েছে। ওটা অরিন্দম জুয়েলার্স-এর তৈরি। কিন্তু আমরা যখন গেলাম, তখন দোকান বন্ধের সময়। তাই মালিককে দোকানে পাইনি। ফলে কে ওটা তৈরি করিয়েছে, তার নামও জানতে পারিনি। কাল সকালেই জানা যাবে।
আবদুলের সঙ্গে কথা বলেছ?
শুধু আবদুল কেন, সব চাকর-বেয়ারার সঙ্গে কথা বলেছি। ওরা কিছুই দ্যাখেনি, শোনেনি। আর শিভালকরের আশপাশের ঘরের লোকেরাও কিছু জানে না। মোড়ের মাথার পানওয়ালা বলেছে যে, সোনালি শাড়ি পরা মেয়েটিকে সে দেখেছে। মেয়েটি নাকি চারটে নাগাদ ব্লু-স্টারে ঢুকেছিল। না, ওকে সে বেরিয়ে আসতে দ্যাখেনি।
আর কিছু পাওনি?
পেয়েছি, স্যার। হাসল সুরেশ নন্দা ও প্রায় জনাপাঁচেক জহুরির ফোন পেয়েছি। তাদের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে বিশ্বনাথ শিভালকর তাদের কাছ থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকার হীরে আর চুনি ধারে বেচতে নিয়েছিল–আজ সকালেই। একটু থেমে ও বলল, হয়তো ওই পাথরগুলোর জন্যেই শিভালকর খুন হয়েছে। নয় এও হতে পারে, পাথরগুলো নিয়ে ও পালানোর মতলব করেছিল। কে জানে আসলে কী হয়েছে। হতাশভাবে কথা শেষ করল সুরেশ।
