অতএব গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ইউ বাঁক নিয়ে পৌঁছে গেলাম অকুস্থলে। গাড়ি থেকে নেমে ছুটে গেলাম ওমনির দিকে। অনুভূমিক রেখার সঙ্গে প্রায় পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণ করে গোঁত্তা খেয়ে থমকে রয়েছে গাড়িটা। গাছপালা আগাছা সরিয়ে চলে গেলাম ড্রাইভারের দরজার কাছে। দরজা খুলতেই লোকটা হেলে পড়ল আমার দিকে। আমি চট করে একহাতে ওর দেহটা ঠেলে ধরলাম। নইলে আমার জামা-প্যান্টের বারোটা বেজে যেত।
একটু আগে জামায় লাল ছোপ নজরে পড়েছিল। এখন দেখলাম বেচারা একেবারে হোলি খেলে উঠেছে। লাল রঙের হোলি। বোধহয় অন্য কোনও রং দোকানে ছিল না।
গাড়ির পেছনের কাছে অন্তত চারটে ফুটো আমার নজরে পড়ল। আর লোকটার পিঠে দুটো, পেটের কাছে একটা। অভিজ্ঞতা বলছে, যে দুটো গুলি ওর গায়ে বিঁধেছে তার মধ্যে অন্তত একটা ওর দেহকে এফেঁড়-ওফেঁড় করে দিয়েছে।
স্বাভাবিকভাবেই ভেবেছি, ভারতের জনসংখ্যা এক কমে গেছে এবং বাকি জনগনের মাথাপিছু জমি ও খাদ্য অনেকটা করে বেড়ে গেছে। কিন্তু আমার রাষ্ট্র-উন্নয়নের চিন্তা ধাক্কা খেল একটা অস্ফুট আর্তনাদে।
আর্তনাদটা বেরিয়ে এসেছে লালুর–মানে, ওই লালজামার মুখ থেকেই। সঙ্গে সঙ্গে আমার কৌতূহল একশো তেরো গুণ বেড়ে গেল। খরচা খাতায় ফেলা লোকটাকে মনে মনে ঝট করে জমার খাতায় ফেলে ঝুঁকে পড়লাম ওর মুখের কাছে। অনেকটা চেঁচিয়ে জিগ্যেস করলাম, আপনার নাম কী? কী করে এরকম হল?
লালুর ঢলে পড়া মাথা নড়ল সামান্য। ক্লান্ত ঠোঁট ফাঁক হল। বলল, ডাক্তার…হসপিটাল.. আমাকে বাঁচান…।
আমি ওর নাড়ি দেখলাম, নাঃ যা ভেবেছি তাই। ওর এখন ডাক্তার বা হাসপাতালের কোনও প্রয়োজন নেই। শুধু ডোমের প্রয়োজন–পোস্ট মর্টেমের জন্যে।
সুতরাং চিৎকার করে আবার একই প্রশ্ন করলাম। তখন মাথা তোলার চেষ্টা করে বিড়বিড় করে লোকটা বলল, মিত্র..শরদিন্দু মিত্র…।
তারপরই ওর মাথাটা আঁকুনি খেয়ে ঢলে পড়ল।
শরদিন্দু মিত্র? এটা নিশ্চয়ই আমার প্রথম প্রশ্নের উত্তর নয়। তা হলে কি দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর?
লোকটার নাড়ি দেখলাম আবার। নেই। মুনিয়া উড়ে গেছে দুনিয়া ছেড়ে। মনে-মনে একবার বলো হরি, হরিবোল– বলে মৃতদেহটা ঠেলে দিলাম গাড়ির ভেতরে। ওটা সিটের ওপরে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। তখন কী ভেবে খুব সাবধানে লোকটার পকেট হাতড়ালাম। কিছু টাকা-পয়সা আর কাগজপত্র পাওয়া গেল। টাকা মাটি, মাটি টাকা। অতএব কাগজপত্রের ওপরেই নজর বুলিয়ে নিলাম। দু-একটা ক্যাশমেমো আর মিত্রসাহেবের একটা ভিজিটিং কার্ড। কার্ডটা দুমড়ে গেছে। কার্ডের পেছনদিকে দুটো ফোন নাম্বার লেখা। দেখে চিনতে পারলাম। নজর মহম্মদ আমাকে এই দুটো ফোন নাম্বারই দিয়েছিল। অবাক হলাম। অমিতাভ শিকদারের মতো আরও কজনকে একই কাজে লাগিয়েছেন শরদিন্দু মিত্র? নাকি আমার বোঝার ভুল? হতে পারে এই লোকটা হয়তো শরদিন্দু মিত্রের পরিচিত ব্যাবসার সূত্রে চেনা। সে যাই হোক, কার্ডটা আমি পকেটে ঢুকিয়ে নিলাম। আর তারপরই একটা ক্যাশমেমো আমার নজর টানল। রেস্তরাঁয় খাওয়ার ক্যাশমেমো। ব্লু গার্ডেন রেস্তোরাঁ। কেয়ার অফ হোটেল রিভারভিউ, ডায়মন্ডহারবার। ক্যাশমেমোতে আজকেরই তারিখ। সুতরাং ক্যাশমেমোটাও পকেটে চালান করে দিলাম। তারপর গাড়ির দরজাটা বন্ধ করে উঠে এলাম রাস্তায়। পুলিশে একটা খবর দিতে হবে।
রাস্তার এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে কোনও ভরসা পেলাম না। সুতরাং ঠিক করলাম, হোটেল রিভারভিউ থেকেই ফোন করা যাবে থানায়। প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর আমি চাকরি করেছিলাম কলকাতা পুলিশে। সে চাকরি ছেড়ে দিয়েছি প্রায় সাড়ে আট বছর। কিন্তু মাথা থেকে পুলিশি কর্তব্যবোধটা এখনও একেবারে মুছে ফেলতে পারিনি।
অতএব গাড়িতে স্টার্ট দিলাম আবার। তারপর গাড়ির মুখ ঘুরিয়ে সোজা হোটেল রিভারভিউ। হীরাকে খুঁজে আনার সামান্য কাজে এত জটিলতা লুকিয়ে থাকবে একথা কে ভাবতে পেরেছিল!
.
হোটেল রিভারভিউতে রিভার আর ভিউ দুই-ই আছে। ডান দিকে হুগলি নদী। বর্ষায় জল থইথই। সেদিক থেকে ভেসে আসছে জোলো বাতাস। নদীর পাড়ে, কিছুটা দূরে-দূরে, কয়েকটা গাছ। বাতাসে দুলছে। তার সামনে খানিকটা খোলা মাঠ-ঘাসে ছাওয়া। সেখানে কয়েকজন মানুষ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে।
বাঁদিকে উঁচু পাচিল দিয়ে ঘেরা হোটেল এলাকা। তারই মাঝে বিশাল লোহার দরজা। দরজার দুপাশে আধুনিক স্থাপত্যের কারুকাজে হোটেলের নাম লেখা। সঙ্গে বাতিস্তম্ভ।
দরজার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে মোরাম বিছানো পথ। আর তার খানিকটা দূরেই চারতলা হোটেল বিল্ডিং। সেখানেও আধুনিক ছাঁদ। চেহারাতেই বোঝা যায়, এ-হোটেল আমজনতার জন্যে নয়।
দরজার কাছে গাড়ি নিয়ে যেতেই উর্দি পরা দারোয়ান দরজা খুলে স্যালুট ঠুকল। গোঁফওয়ালা গোবেচারা লোকটার হাতে একটা দশ টাকার নোট তুলে দিয়ে জিগ্যেস করলাম, একটু আগে একটা লাল রঙের মারুতি ওমনি এখান থেকে বেরিয়েছে কি না।
লোকটা ইতস্তত করছিল। হয়তো জরুকে জিগ্যেস না করে ও কারও কথার জবাব দেয় না। আমি আর-একটা দশ টাকার নোট বাড়িয়ে দিলাম। ভারতীয় টাকার ঘন-ঘন অবমূল্যায়নে দশ টাকার এখন তেমন একটা দাম নেই–অন্তত লুব্রিকেশানের কাজে। তবে বিশ টাকায় কাজ হল। লোকটা জরুর আদেশের অপেক্ষা না করেই বলল, হ্যাঁ, একটা লাল মারুতি ওমনি গাড়ি সে বেরোতে দেখেছে। তবে ওইটুকুই, তার বেশি কিছু জানে না।
