তখন উনি আপনাকে কী বললেন?
কিচ্ছু না। আমি জিগ্যেস করলাম, কী হয়েছে, কিন্তু ও কোনও উত্তর দিল না। সোজা আমাকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে হুইস্কির বোতল তুলে নিয়ে বারদুয়েক চুমুক দিল। আমি ভীষণ অবাক হয়ে গেলাম। কারণ, গত কয়েকবছরে ওকে কখনও মদ খেতে দেখিনি। মদ ও মোটেই পছন্দ করত না। কিন্তু আজ হঠাৎ কী অদ্ভুত ব্যাপার!
উনি কিছুই বলেননি?
টুঁ শব্দ পর্যন্ত নয়। আমার মনে হয়, আমি যে সামনে দাঁড়িয়ে আছি সেটাই ও টের পায়নি। আমি জিগ্যেস করলাম এত সকাল সকাল কে ফোন করেছিল, কিন্তু মনে হয়নি ও আমার কথা শুনতে পেয়েছে। মাত্র আধ মিনিট-টাক ও ফ্ল্যাটে ছিল।
তারপরই কি ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছেন?
হ্যাঁ।
ফোনে তার সঙ্গে কী কথা হয় কিছু শুনতে পেয়েছিলেন?
না। সরজানা উঠে দাঁড়াল। গেলাসটা হাতে নিয়ে আবার এগিয়ে চলল সেটা ভরতি করতে।
ওকে তীক্ষ্ণ চোখে লক্ষ করতে লাগলাম। শ্যাম সরজানার কী একটা আচরণ যেন আমার মনে খটকা জাগিয়ে তুলছে। একমাত্র মদের গেলাসে চুমুক দেওয়া ছাড়া ওকে বিন্দুমাত্রও উত্তেজিত মনে হচ্ছে না। না, বিশ্বনাথ শিভালকরের মৃত্যু ওকে উচিতমতো অবাক করতে পারেনি। কিন্তু ও ফিরে এসে সোফায় বসতেই এই প্রথম টের পেলাম, ওর সমস্ত নিরুত্তাপ নির্লিপ্ত আচরণ শুধুমাত্র ওপর-ওপর। শ্যাম সরজানার বুকের ভেতরে উত্তাল কালবৈশাখী।
সোফায় হেলান দিয়ে আরাম করে ও বসল। মুখে ক্লান্তি ও বিরক্তির যুগপৎ ছাপ, কিন্তু মদের গেলাসটাকে যে শক্তিতে ও আঁকড়ে ধরেছে তাতে আঙুল থেকে সমস্ত রক্ত সরে গেছে।
নোটবইয়ের পাতা উলটেপালটে উঠে দাঁড়ালাম। আমার অনুসন্ধান এখন ত্রিমুখী ও কবিতা পারেখ, নৃপেন দত্ত ও যমুনা সরকার। সুতরাং তার প্রথম ধাপ হিসেবে এগিয়ে গেলাম ছোট টেবিলটার কাছে। যমুনা সরকারকে তুলে নিলাম। বললাম, মিস্টার সরজানা, হোপ ইউ উডুন্ট মাইন্ড-ফটোটা আমাদের দরকার।
আমি কেন মাইন্ড করতে যাব, তেতো হাসি ফুটে উঠল শ্যাম সরজানার ঠোঁটে : যে মাইন্ড করত–আর কখনও করবে না।
আপনার সাহায্যের জন্যে ধন্যবাদ। দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম আমি : নতুন কোনও ডেভালাপমেন্ট হলে খবর দেব।
শিভালকরের খুনিকে খুঁজে বের করুন। সহজভাবে বলল সরজানা।
করব। সরজানা ও শিভালকরের ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে এলাম।
এলগিন রোড এখন স্বভাবসিদ্ধ শান্ত এবং অন্ধকার। কিন্তু চোখ বুজলে উষ্ণতা ও আদ্রর্তার কারণে দুপুর বলে ভুল হতে পারে। রাস্তার আলো যথারীতি শতকরা পঞ্চাশ ভাগ জ্বলছে।
জিপে উঠে রওনা হলাম। আমি এখন কবিতা পারেখের সঙ্গে কথা বলতে চাই। যার খুনের হুমকি শুনে মহিলাপ্রিয় বিশ্বনাথ শিভালকর পর্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েছিল।
.
তিনের এক, এম.সি. গার্ডেন রোডের সঙ্গে কবিতা পারেখকে যোগ করলে যোগফল জিজ্ঞাসার চিহ্ন হয়। সুতরাং চিন্তিতভাবেই দরজার কলিংবেলে চাপ দিলাম।
দরজা খুলল সুপুরুষ সুদর্শন এক যুবক। চোখে সরু ফ্রেমের চশমা। আমাকে দেখে সপ্রসন্ন চোখে প্রশ্ন করল, কাকে চাই?
আমি পকেট থেকে আইডেন্টিটি কার্ড বের করে দেখালাম।
হোমিসাইড। লালবাজার।
যুবকের ফরসা মুখে অবাধ্য রক্তের ঝলক দেখা দিল। তবুও চেষ্টাকৃত রুক্ষ গলায় বলল, হোয়াট ফর?
কবিতা পারেখ আপনার কে হয়?
বোন। ছোট বোন। হাসলাম। বললাম, আপনার ছোট বোনের প্রাক্তন প্রেমিক খুন হয়েছে।
যুবকের মুখ থেকে এবার রক্ত বিদায় নেওয়ার পালা। তাড়াতাড়ি পথ ছেড়ে দিয়ে আমাকে ভেতরে ডাকল, আসুন–ভেতরে আসুন।
বসবার ঘরে ছিমছাম পরিচর্যার ছাপ। রবীন্দ্রনাথের খ্রিস্ট ভঙ্গিমার ছবি বাঙালিপ্রীতির ইঙ্গিত দেয়। সুন্দরীর থুতনিতে বিউটি স্পটের মতো ঘরের মধ্যমণি সানমাইকা লাগানো টেবিলে রজনীগন্ধাগুচ্ছ শোভা পাচ্ছে।
একটা চেয়ার বেছে নিয়ে বসলাম। যুবককে উদ্দেশ্য করে বললাম, মিস পারেখকে একবার পাঠিয়ে দিন।
যুবক ইতস্তত করছে দেখে বললাম, উনি বাড়ি নেই ছাড়া আর যা কিছু বলবেন শুনতে রাজি আছি।
যুবক নিস্ক্রান্ত হল।
একটু পরেই গদ্যময় রুক্ষ কবিতা পারেখ ঘরে এসে ঢুকল। অভিজ্ব্যক্তি বলে দেয়, দাদা অনেক কিছুই ওকে খুলে বলেছে।
কবিতার চুল কাঁধ ছুঁয়ে থেমেছে, গাল সামান্য ভাঙা, নাক-চোখ তীক্ষ্ণ, কপালে সবুজ টিপ।
আমার খুব কাছে এসে বসল কবিতা। বলল, কী চাই বলুন?
বিশ্বনাথ শিভালকরকে কেউ তিনতলা থেকে ফেলে দিয়েছে। সহজ সুরে ওকে জানালাম।
ও চকিতে শ্বাস টানল, তারপর স্বাভাবিক হল। চোখ ফিরিয়ে দেখি, কবিতার দাদা ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে। সুতরাং তাকে লক্ষ্য করে বললাম, মিস্টার পারেখ, কাজ যখন নেই তখন খই ভাজুন গিয়ে।
পারেখ সলজ্জে অদৃশ্য হল।
আপনার দাদা কী করেন? কবিতাকে প্রশ্ন করলাম।
লোহার ব্যাবসা। ও অসন্তুষ্টভাবে উত্তর দিল।
দোকান কোথায়?
এখানেই।
এবার কবিতা পারেখের মতো তুঙ্গ আধুনিকার দমদমবাসের উত্তর খুঁজে পেলাম। দাদার কর্মস্থল–বারাণসীর চেয়েও পুণ্যধাম। সুতরাং বিশ্বনাথ প্রসঙ্গে ফিরে এলাম।
মিস্টার শিভালকরকে কেউ খুন করেছে। ন্যাস্টি বিজনেস। ওকে বললাম।
তো কী করব? কবিতা পারেখের চোখে আগুন জ্বলে উঠল : কেঁদে ঘর ভাসাব, না সহমরণে যাব?
তার দরকার নেই। গোটাকয়েক প্রশ্নের উত্তর দিলেই কাজ হবে।
অবাধ্য চুলের গোছা কপাল থেকে সরিয়ে গালে হাত দিয়ে বসল ও। বলল, আপনি তো ধরেই বসে আছেন আমি ওকে খুন করেছি, তাই না?
