শিভালকরের পকেট থেকে সব কিছু বের করে নিয়েছ, সুরেশ? আমি প্রশ্ন করলাম।
হ্যাঁ, প্যান্টের উঁচু হয়ে থাকা পাশপকেট চাপড়ে বলল সুরেশ, তবে তাতে কাজের কিছু নেই। শুধু ওই কার্ড আর টাকা।
বডি রিলিজ অর্ডার ডক্টর হুসেনের হাতে দিয়ে আমি আর নন্দা ভিড় ঠেলে বাইরে এলাম। উঠে বসলাম জিপে।
ও, শিভালকর তা হলে হীরে জহরতের দালালি করত? আমার কাছ থেকে হোটেল ঘর অনুসন্ধানের ইতিহাস ও অ্যাডভানির জবানবন্দি শোনার পর নন্দা বলল, কিন্তু কয়েক শো লোক হয়তো আজ সারাদিন এই হোটেলে যাতায়াত করেছে, আর আমরা খবর পেলাম শুধু সোনালি সিল্কের শাড়ি পরা ওই মেয়েটার। এ দুর্ভাগ্য কি সৌভাগ্য, ঈশ্বর জানেন।
বেয়ারাকে জিগ্যেস করলে হয়তো আরও অনেকের খোঁজ পাওয়া যাবে। ইঞ্জিন চালু করে জিপটা গলি থেকে ব্যাক করতে শুরু করলাম আমি শিভালকরের কার্ডের ঠিকানায় যাচ্ছি, সুরেশ। তুমি–।
জানি, হাসল সুরেশ নন্দা, আমি গিয়ে ওই চারতলার হোটেল-ঘর পাহারা দেব আর যতরকম কায়দায় সম্ভব পুলিশি তদন্ত চালাব।
সুরেশকে আমি ভীষণ স্নেহ করি এবং অনাবশ্যক প্রশ্রয় দিই। তাই সান্ত্বনা দিতে বললাম, কাউকে তো এ কাজ করতেই হবে। তুমি ছাড়া আর কাকে ভরসা করব?
সুরেশের মুখ সহজ হল।
আমি বলে চললাম, প্রথমে বেয়ারা আবদুলকে ধর। খোঁজ করে দ্যাখো শিভালকরের ঘরের আশপাশের বোর্ডাররা কেউ কিছু শুনেছে বা দেখেছে কি না। তা ছাড়া রাস্তার কোণায় একটা পানের দোকান আছে। সেই দোকানদারও হয়তো কিছু দেখে থাকতে পারে।
মোড় ঘুরে হোটেলের সামনে গাড়ি দাঁড় করালাম। সুরেশকে বললাম, আর একটা কথা, কাউকে লিপস্টিকটা দিয়ে হেডকোয়ার্টারে পাঠিয়ে দাও। জহুরিদের চিহ্ন খুঁজে ওটা কার দোকানে তৈরি হয়েছে বের করতে বলো।
আচ্ছা, স্যার, তাহলে আপনি রওনা হন। সুরেশ নন্দা জিপ থেকে নেমে পড়ল। আমি একটা আশ্বাসের হাসি ছুঁড়ে দিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে দিলাম।
.
সতেরো এলগিন রোড প্রথম নজরে বড়লোকের ফ্ল্যাটবাড়ি। অথচ ভেতরটা ছমছমে এবং টিমটিমে আলোয় আলোকিত। অন্তত গোটাদশেক ডাকবাক্স সিঁড়ির নীচের দেওয়ালে শোভা পাচ্ছে। ডাকবাস্কের লেখা পড়বার মতো আলো যথেষ্ট নেই। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলাম। দুদিকের দুই ফ্ল্যাটের নেমপ্লেট পড়তে কোনও অসুবিধে হল না। না, শিভালকর বলে কেউ দোতলায় থাকে না।
তিনতলায় এসে অনুসন্ধান শেষ হল। কিন্তু অবাক হলাম ফ্ল্যাটের নেমপ্লেটে দুটো নাম দেখে : বি. শিভালকর এবং এস. সরজানা–এজেন্টস। ভাবলাম, এক জাতের পাখি, দল বেঁধেছে নাকি? কিন্তু মানুষের অবাক হওয়ার শেষ নেই। নিজের মৃত্যুতে পর্যন্ত সে অবাক হয়। সুতরাং বেল না টিপে দরজায় জোরে নক করলাম।
একটু পরেই দরজা খুলে গেল। ঘরের উজ্জ্বল আলো মাথার পেছনে জ্যোতির মতো ধরে রেখে দরজায় যিনি আবির্ভূত হলেন সম্ভবত সে-ই সরজানা। দু-হাত বুকে রেখে বিবেকানন্দ ভঙ্গীতে ভুরু কুঁচকে দাঁড়িয়ে। চেহারা শক্ত-সমর্থ, মাথায় ঘন চুল, ছোট অথচ তীক্ষ্ণ চোখ।
আমাকে দেখে রুক্ষ স্বরে প্রশ্ন করল, আপনিই দরজায় নক করেছেন?
আমি চারপাশে তাকিয়ে যেন কাউকে খুঁজলাম। বললাম, নক করার মতো আর কাউকে তো দেখছি না।
আবার একটা রুক্ষ উত্তর দিতে প্রস্তুত হচ্ছিল সরজানা, আমি আই.ডি.-টা বের করে ওর চোখের সামনে তুলে ধরলাম। বললাম, ইন্সপেক্টর বরাট, ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট লালবাজার।
সরজানার মুখের রেখা নরম হয়ে এল।
আপনি বিশ্বনাথ শিভালকরের বন্ধু?’ওকে প্রশ্ন করলাম।
হ্যাঁ, আমরা দুজনেই এখানে থাকি। কী হয়েছে?
দরজায় দাঁড়িয়ে কথা হয় না, ভেতরে চলুন।
সরজানা কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করল। অবশেষে কাঁধ ঝাঁকিয়ে আমাকে ভেতরে আহ্বান জানাল।
বসবার ঘরটা বেশি বড় নয়, তবে তার সাজগোজ অমিতব্যয়িতার ইঙ্গিত দেয়। আমি একটা ফোমের চেয়ার বসবার জন্যে বেছে নিয়ে সরজানাকে ইশারা করলাম মুখোমুখি সোফাটায় বসতে।
এবার কাজের কথা হোক। বলে পকেট থেকে নোটবই ও বলপেন বের করে নিলাম আমি, আপনার পুরো নামটা বলুন।
সরজানার কপাল এখনও করোগেটেড অ্যালুমিনিয়াম। তবে ও সোফাটায় গিয়ে বসল, বলল, শ্যাম সরজানা।
মিস্টার শিভালকর আপনার অনেকদিনের বন্ধু?
না। তবে বেশ কিছুদিন আমরা একসঙ্গে আছি। একটু থেমে সরজানা প্রশ্ন করল, কেন?
একটা খারাপ খবর আছে, মিস্টার সরজানা। বিশ্বনাথ শিভালকর খুন হয়েছে।
ও কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎই সিদ্ধান্ত পালটাল। স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বসে রইল যেন বুঝতে চাইছে আমি সত্যি কথা বলছি কি না।
আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম।
কী করে? শ্যাম সরজানা প্রশ্ন করল।
এখনও আমরা ঠিক জানি না। কেউ ওঁকে তিনতলা বা চারতলার জানলা দিয়ে ঠেলে ফেলে দিয়েছে। ব্যাপারটাকে হয় সুইসাইড নয় অ্যাকসিডেন্ট বলে দেখাতে চেয়েছে কিন্তু পুলিশ এত বোকা নয়।
কেউ মানে? তার মানে খুনিকে আপনারা এখনও ধরতে পারেননি?
এখনও পারিনি।
হঠাৎই সরজানা উঠে দাঁড়াল। ঘরের একপ্রান্তের তাক থেকে একটা হুইস্কির বোতল তুলে নিয়ে একটা গেলাসে কিছুটা ঢালল। বলল, আপত্তি নেই তো?
নেভার মাইন্ড। আপনি খান।
গেলাসে একটা ছোট্ট চুমুক দিয়ে ধীরে-ধীরে সোফার কাছে ফিরে এল সরজানা, বসল।
শিভালকর মারা গেছে বিশ্বাস হতে চায় না। ও বলল।
