লিপস্টিকটা ড্রেসিং টেবিলে রেখে বিছানা সার্চ করা শেষ করলাম। চাদরটা আবার ঠিকমতো ঢেকে দিচ্ছি, দরজায় কেউ নক করল। তারপরই ঘরে ঢুকল দুজন ফোরেনসিক এক্সপার্ট ও একজন ফটোগ্রাফার।
প্রথম দুজনের একজনকে প্রশ্ন করলাম, গলির কাজ শেষ?
ওখানে কিছুই করার নেই–শুধু ফটো তোলা ছাড়া। বিশ্বাস সেসব তুলেছে।
ফটোগ্রাফার বিশ্বাস গলির দিকের জানলার কাছে এগিয়ে গেল । জানলা দিয়ে গলির কয়েকটা ফটো বরং তুলে নিই।
ডক্টর আসেনি? আমি জিগ্যেস করলাম।
দ্বিতীয়জন উত্তর দিল, এইমাত্র এসেছেন ডক্টর হুসেন।
ঠিক আছে। আপনারা এবার হাত লাগান। আমার কাজ শেষ। শুধু যাওয়ার আগে নীচে আরও কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করার আছে।
দুশো ন’নম্বর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম।
নীচে নামার আগে দুশো নয়ের দুপাশের ঘরের দরজায় টোকা মারলাম। কিন্তু কোনও সাড়া পেলাম না।
লবিতে এসে অ্যাডভানিকে কাউন্টারে পেলাম না। কিন্তু কাউন্টারের পেছনের দরজাটা সামান্য ভোলা। সুতরাং রিসেপশনিস্টকে হতভম্ব করে কাউন্টারের পেছনে গেলাম। দরজা ঠেলে সটান ঢুকে গেলাম অ্যাডভানির ঘরে।
শিভালকরের ঘরের সঙ্গে এ-ঘরের খুব একটা তফাত নেই। অতিরিক্তের মধ্যে একটা টিভি সেট এবং জানলায় গ্রিল বসানো। অ্যাডভানি বিছানার শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছেন। যন্ত্রণায় তার চোখ কুঁচকে গেছে।
কী হল, মিস্টার অ্যাডভানি? আমি প্রশ্ন করলাম।
তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হালকাভাবে হাসতে চেষ্টা করলেন। বললেন, আলসার। তার ওপর সুইসাইডের ব্যাপারটায় বেশ আপসেট হয়ে পড়েছি।
বুঝলাম না শিভালকরের মৃত্যুকে তার আত্মহত্যার লেবেল লাগানোর এত বেঁক কেন। সে কি নিজের হোটেলকে বদনামের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যে?
অতিকষ্টে বিছানায় উঠে বসলেন অ্যাডভানি : কিছু বলবেন, ইন্সপেক্টর?
যদি আপনার কষ্ট না হয়, তাহলে—
কাঁধ ঝাঁকালেন তিনি : প্রয়োজন যখন তখন উপায় কী। বলুন, কী জানতে চান।
শিভালকরের ঘরে কোন বেয়ারার ডিউটি ছিল?
আবদুলের। কেন, ওকে পেলেন না?
খোঁজ করিনি। নিস্পৃহ স্বরে উত্তর দিলাম, শিভালকর যখন আসে তখন আবদুল কি ওকে ওপরে পৌঁছে দিয়েছিল?
না। আবদুল তখন কাছাকাছি ছিল না। মিস্টার শিভালকর চাবি নিয়ে নিজেই ওপরে গিয়েছিলেন।
শিভালকরের ঘরে একটা মেয়ে এসেছিল। তার প্রমাণ আমি পেয়েছি। কোনও মেয়েকে আপনি সিঁড়ি দিয়ে উঠতে দেখেছেন?
একটা মেয়েকে দেখেছি–খুব সুন্দর দেখতে। সোজা লিফটে গিয়ে উঠেছিল।
তাকে চেনেন?
না। তবে মেয়েটা একেবারে বিউটি কুইন। কাঁধ পর্যন্ত চুল, চোখে টিন্টেড গ্লাসের চশমা, পরনে সোনা রং সাউথ ইন্ডিয়া সিল্ক–দাম কম করেও তিন হাজার টাকা হবে।
তখন কটা বাজে?
এই..চারটে হবে। কিংবা সোয়া চারটে।
এ ছাড়া আর কোনও মেয়েকে দ্যাখেননি?
না। মিস্টার বরাট, একটু কষ্ট করবেন? আমি একদম উঠতে পারছি না। কাউন্টারের ভেতরের তাকে একটা পিচবোর্ডের বাক্স আছে। কয়েকদিন আগে একটা জেলুসিল ট্যাবলেটের পাতা ওখানে রেখেছিলাম। দেখুন তো আছে কি না, থাকলে আমাকে দুটো এনে দিন, ট্যাবলেট দুটো খেলে পেটের যন্ত্রণাটা হয়তো একটু কমবে।
কাউন্টারে গেলাম। বাক্স ঘাঁটাঘাঁটি করে ট্যাবলেটের পাতাটা খুঁজে পেলাম। দুটো ট্যাবলেট ছিঁড়ে এনে অ্যাডভানিকে দিলাম।
থ্যাংকু ইউ। ভগবান না করুন, কখনও যেন আপনার আলসার না হয়।
আর একটা কথা–তারপরই আপনার ছুটি। হোটেলে টেলিফোন এলে কে ধরে? রিসেপশনিস্ট?
না, আমি। আমি না থাকলে সুজি ধরে সুজি গোমেজ। ইশারায় কাউন্টারের দিকে দেখালেন অ্যাডভানি।
শিভালকরের কোনও ফোন এসেছিল?
ওঃ—হো–।
কী হল?
একদম ভুলে গেছি। ওঁর একটা ফোন এসেছিল। যে ফোন করেছিল তার কথা শুনে। মনে হয়েছে মিস্টার শিভালকরের ওপর বেশ রেগে আছে। তার ধমকের উত্তরে শিভালকর খালি বলছিলেন, শুধু-শুধু রাগ করছ কেন, প্যাটেল? আগে আমাকে বলতে দাও। আহা, শোনই না, এইরকম সব কথা।
এসব ধমক ছাড়া লোকটা আর কী বলেছে?
কিচ্ছু না। তারপর হঠাৎই মিস্টার শিভালকর ফোন নামিয়ে রাখেন।
প্যাটেল আর ফোন করেছিল?
না।
ও ফোন করেছিল কখন?
সময়টা ঠিক খেয়াল নেই। তবে চারটের এদিক ওদিক হবে। হঠাৎই তিনি যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত করে বিছানায় এলিয়ে পড়লেন। আপনমনেই বললেন, ওঃ, আমার শত্রুরও যেন আলসার না হয়।
নোটবইতে আরও কয়েকটা কথা টুকে নিয়ে প্রতাপ অ্যাডভানিকে সাহায্যের জন্যে ধন্যবাদ জানালাম। তারপর হোটেলের লাগোয়া পথ ঘুরে ফিরে গেলাম পেছনের গলিতে। পুলিশ ডক্টর ও সুরেশ নন্দার কাজ কদ্দূর এগোল কে জানে!
ঘটনাস্থলে এখন আরও দুটো পুলিশের গাড়ি ও একটা অ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে অনিবার্যভাবে শতখানেক দর্শক।
আমাকে দেখে সুরেশ কাছে এগিয়ে এল। আমি ততক্ষণে ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকেছি।
ডক্টর হুসেন খুনের সময়টা মোটামুটি ঠিক করেছেন, স্যার। বলছেন, চারটে থেকে পাঁচটার মধ্যে।
দ্যাটস রাইট, মৃতদেহের পাশে হাঁটুগেড়ে বসেছিলেন ডক্টর হুসেন, আমাদের দিকে চোখ তুলে বললেন, চারটে থেকে পাঁচটা। আগে নয়, পরে নয়।
দু-চোখের মাঝে ওই চোটটা কীসের, ডক্টর?’ নন্দা প্রশ্ন করল, ওতেই কি ভদ্রলোক মারা গেছে?
হতে পারে, তবে অটন্সি না করা পর্যন্ত শিয়োর হয়ে বলা যাবে না। উঠে দাঁড়িয়ে তিনি অ্যাম্বুলেন্সের দিকে একপলক তাকালেন, আমার কাজ শেষ, মিস্টার বরাট। যদি গাড়ি ছেড়ে দেন তা হলে আমি বডি নিয়ে যেতে পারি।
