কাউন্টারের পেছনের দরজা খুলে মধ্যবয়স্ক, বেঁটে, টাক মাথা এবং বেশ স্বাস্থ্যবান জনৈক ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। বেশবাস পরিপাটি। হাসিমুখে নকল দাঁতের বিজ্ঞাপন।
বলুন, সার্জেন্ট, আপনাকে কী সাহায্য করতে পারি?’ তার গলার স্বর আমার অনুমানের চেয়েও ভরাট, গম্ভীর।
সার্জেন্ট নয়, ইন্সপেক্টর ইন্সপেক্টর বরাট, আইডেন্টিটি কার্ডটা ওঁর চোখের সামনে একবার নাচালাম। বললাম, বিশ্বনাথ শিভালকর আপনার বোর্ডার?
ডেস্কে রাখা ভোলা খাতার দিকে আড়চোখে একবার তাকালেন তিনি। বললেন, হ্যাঁ, আজই সকালে এসে উঠেছেন।
সঙ্গে কেউ ছিল?
পকেট থেকে নোটবই ও বলপেন বের করে নিলাম : আপনার নামটা বলুন–।
অ্যাডভানি। প্রতাপ অ্যাডভানি।
শিভালকরের সঙ্গে কেউ দেখা করতে এসেছিল?
না। কিন্তু কেন বলুন তো? কী হয়েছে?
হোটেলের পেছনের গলিতে শিভালকর শুয়ে আছে। মারা গেছে। কেউ ওকে বোধহয় চারতলার জানলা দিয়ে ফেলে দিয়েছে।
চমকে উঠলেন প্রতাপ অ্যাডভানি, আত্মহত্যা নয় তো?
তার কথার কোনও জবাব না দিয়ে জিগ্যেস করলাম, শিভালকরকে আপনি চিনতেন?
না, কিন্তু আমি ধীরে-ধীরে মাথা নাড়লেন অ্যাডভানি, আমার হোটেলে এসব কাণ্ড কখনও হয়নি।
কারণ বিশ্বনাথ শিভালকর কখনও আসেনি, কথা কেড়ে নিয়ে বললাম, কাউন্টারে আপনি সবসময় থাকেন না?
না। দরকার হলে আসি।
শিভালকর কোন ঘরে ছিল?
এক মিনিট, আড়চোখের নজর আবার ছুটে গেল খাতার দিকে : টু-ও-নাইন।
তার মানে তিনতলা। তিনতলার জানলা দিয়েই নীচে পড়েছে শিভালকর।
খাতায় ওর নাম-ঠিকানা লেখা আছে?
হ্যাঁ, সেটাই হোটেলের নিয়ম। সেভেনটিন এলগিন রোড, ক্যালকাটা টুয়েন্টি।
শিভালকর কটার সময় আপনার হোটেলে এসে ওঠে?
সাড়ে দশটা নাগাদ।
নোটবই পকেটে রাখলাম।
ওর ঘরের চাবিটা আমাকে দিন, মিস্টার অ্যাডভানি। আর কাউন্টারেই থাকুন। অন্যান্য পুলিশ অফিসাররা এক্ষুনি এসে পড়বেন।
মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন অ্যাডভানি নিশ্চয়ই। আমি আছি।
একটা বড় চাবির গোছা থেকে একটা চাবি বের করে আমার হাতে দিলেন তিনি, কোনওরকম দরকার হলেই বলবেন, ইন্সপেক্টর, আই অ্যাম অলওয়েজ অ্যাট ইয়োর সার্ভিস।
সো কাইন্ড অফ ইউ। হাসলাম। তারপর পা বাড়ালাম এলিভেটরের দিকে।
এলিভেটরের কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়ালাম। প্রাগৈতিহাসিক এলিভেটরকে আমার ভীষণ ভয়। সুতরাং ওটিস সাহেবকে এলিভেটর আবিষ্কারের জন্যে মনে-মনে নমস্কার জানিয়ে সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠতে শুরু করলাম।
বাইরের জাঁকজমকের তুলনায় হোটেলের ঘরগুলো সর্বহারা। এর চেয়ে ছোট ঘর অনেক দেখেছি, তবে উষ্ণতা ও অস্বস্তিতে দুশো ন’নম্বর কামরা আমার স্মৃতিকে হার মানাল। ঘরে পাখা ও প্রয়োজনীয় সমস্ত আসবাবপত্রই যে যথেষ্ট পুরোনো তা একটু খুঁটিয়ে দেখলেই বোঝা যায়।
ঘরে ধ্বস্তাধ্বস্তির কোনও চিহ্ন নেই। তবে কেউ একজন যে বিশ্বনাথ শিভালকরের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল তার চিহ্ন পাওয়া যায়। ঘরের এক পাশে রাখা টেবিলে হুইস্কির বোতল, থামস আপ এবং দুটো গেলাস। একটা গেলাসের কানায় হালকা গোলাপি লিপস্টিকের ছাপ। এ ছাড়া একটা অদ্ভুত সেন্টের গন্ধ গোটা ঘরটাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
বিছানার নীচে ধুলো ছাড়া কিছু পেলাম না। আলমারিতে দুটো হ্যাঁঙার এবং একটা মাকড়সার জাল চোখে পড়ল। বাথরুমেও কিছু নেই।
ড্রেসিং টেবিলের পাশে একটা ভি.আই.পি. অ্যাটাচি কেস পেলাম। সেটা সাবধানে বিছানার রেখে খুললাম। আমি চাই না কোনও হাতের ছাপ আমার অসাবধানতার জন্যে নষ্ট হোক।
অ্যাটাচিতে ডায়েরি, কাগজপত্র, কিছু টাকা ও একটা পেপারব্যাক ছাড়া একটা অদ্ভুত জিনিস আবিষ্কার করলাম। শ্যাময় লেদারের সুন্দর একটা পাউচ। মুখটা চেন টেনে বন্ধ করা। ওপরে সোনালি মনোগ্রাম : বি.এস.।
পাউচটা খুললাম। ভেতরে কিছু নেই। না, কিছু নেই বললে ভুল হবে–শুধু কয়েক টুকরো টিসু ও তুলো পেলাম। একটু চিন্তিতভাবেই পাউচটা অ্যাটাচি কেসে ঢুকিয়ে রাখলাম। আর তখনই আমার নজরে পড়ল ছোট্ট লেন্সটা।
এ ধরনের লেন্স সাধারণত জহুরিরা ব্যবহার করে থাকে। সুতরাং শ্যাময়-পাউচ, টিস্যু পেপার, তুলো এবং লেন্স যোগ করে যে উত্তরটা পাওয়া যায় তা হল, বিশ্বনাথ শিভালকর দামি পাথরের লেনদেন করত। সেই কারণেই ওর কার্ডে এজেন্ট শব্দটা লেখা আছে।
সব জিনিস অ্যাটাচি কেসে আবার গুছিয়ে ওটা আগের জায়গায় রেখে দিলাম। তারপর বিছানাটা তছনছ করে দেখতে শুরু করলাম। তখনই দু বালিশের ফাঁকে লিপস্টিকটা খুঁজে পেলাম।
লিপস্টিকটা জাত এবং চরিত্রে অসাধারণ। সস্তার জিনিসও অনেক সময় ভীষণ দামি দেখায়। এটা তা নয়। একেবারে খাঁটি সোনার তৈরি। চারপাশে আলপনার কাজ করা এবং ঢাকনার ওপর সুন্দর মনোগ্রামে এল.সি. লেখা। আজকের দিনটা বোধহয় মনোগ্রামের দিন।
এ ধরনের লিপস্টিক মেয়েরা নিজেদের জন্যে কেনে না। কেউ উপহার দিলে নেয়। তা ছাড়া জিনিসটা এত দামি এবং কারুকার্য খচিত যে, স্বর্ণকারের গোপন চিহ্ন খোদাই করা থাকলেও থাকতে পারে। সেই গোপন চিহ্ন থেকে আমরা সহজেই এর স্বর্ণকার এবং মালকিনকে খুঁজে বের করতে পারব।
নিজের রুমাল ও শিভালকরের লেন্সের সাহায্য নিয়ে চিহ্নটা খুঁজে পেলাম। ওটা ঢাকনার ভেতর দিকে ছিল ৪ দুটো ছোট বৃত্ত পরস্পরকে ছেদ করে রয়েছে, এবং তাদের একটার মধ্যে ছোট্ট করে ইংরেজি ‘এ’ অক্ষরটা খোদাই করা।
