আমি বোকার মতো ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে রইলাম। হারাধনের দশটি ছেলের গল্প এখন শেষ। এখন কোন বনে আমি যাব? এখানে এসেছিলাম সাতজন। তারপর কী যে এক বিয়োগের অঙ্ক শুরু হয়ে গেল! শেষ পর্যন্ত হাতে রইল এক। আমি। এবং একা।
ছুরিটা ফেলে দিলাম। হাত তুলে তুষারঝড় আড়াল করে মাথা ঝুঁকিয়ে চলে গেলাম স্নোমোবাইলের কাছে। যেভাবে হোক ক্যাম্পে ফিরে যেতে হবে। যেতেই হবে। তারপর রেডিয়ো মেসেজ পাঠাতে হবে বেস ক্যাম্পে। ওখানে ব্লিজার্ড এখন থেমেছে কিনা কে জানে। ওরা কি প্লেন পাঠাতে পারবে?
পারুক বা না পারুক আমাকে অপেক্ষা করতে হবে। আর রিপোর্ট লিখতে হবে।
লিখতে হবে ‘হারাধনের সাতটি ছেলে’-র কাহিনি।
হীরা চুনি
ঘটনাটা আত্মহত্যা কিংবা দুর্ঘটনা, দুটোর একটা মনে হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু কোনওটাই নয়। পরিষ্কার খুন।
খুনের পর অকুস্থলে সবার আগে হাজির হওয়ার সুযোগ খুব কম ডিটেকটিভই পায়, কিন্তু এক্ষেত্র ঈশ্বর করুণাময়। আমিই প্রথমে এসে উপস্থিত হয়েছি।
সি.আই.টি. রোডের একটা শরিকী সংঘর্ষ মেটাতে আমি আর আমার সঙ্গী, সার্জেন্ট সুরেশ নন্দা, জিপ ছুটিয়ে যাচ্ছিলাম, ফুলবাগানে মোড় ঘুরতেই একটা বাচ্চা ছেলে ব্লু স্টার হোটেলের পেছনের গলিটা থেকে বেরিয়ে এল। চিৎকার করে বলতে লাগল, গলিতে একটা লোক মরে পড়ে আছে।
ছেলেটা ছুটে চলে গেলেও নন্দা গাড়ি ঘুরিয়ে গলিটায় ঢুকল।
ছ’টা বেজে এখন কয়েক মিনিট। জুনের ভ্যাপসা গরম। তারই মধ্যে আমরা দাঁড়িয়ে দেখছি দামি পোশাক-পরিচ্ছদ পরা এক যুবকের মৃতদেহ রাস্তায় অসহায়ভাবে পড়ে রয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে, মাত্র কয়েকমিনিট আগেই সে হোটেলের অন্তত তিন কি চারতলার জানলা দিয়ে পড়েছে। ওপরে তাকিয়ে মেপে নিলাম–হোটেলটা ছ’তলা।
ফরসা দেহটা হাত-পা ছড়িয়ে চিৎ হয়ে পড়ে আছে। এত ওপর থেকে পিচের রাস্তায় এসে পড়লে যে পরিমাণ রক্তপাত হওয়ার কথা তা হয়নি। যুবকের দু-চোখের মাঝে নাকের ওপরটা কালচে হয়ে ফুলে আছে এবং মুখের বাঁ দিকে, বাঁ হাতে ও বাঁ কবজিতে কেমন গোলাপি আভা।
পুলিশের ডাক্তার মৃতদেহ পরীক্ষা না করা পর্যন্ত হয়তো আমাদের ছোঁওয়া উচিত নয়, কিন্তু প্রয়োজন ও কৌতূহল বেশিরভাগ সময়েই জিতে যায়। সুতরাং আঙুলের ডগা মৃতদেহের চোয়ালে ঠেকিয়ে আস্তে ঠেলা মারলাম। মাথাটা খুব সহজেই একপাশে ঘুরে গেল।
রাইগর মর্টিস শুরু হয়নি এখনও না? সুরেশ প্রশ্ন করে।
না, আমি বলি। লোকটার পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে খুললাম। চারশো তিপ্পান্ন টাকা, কয়েকটা সংখ্যা ও ঠিকানা লেখা চিরকুট, আর সাতটা একইরকম আইভরি কার্ড। কার্ডগুলো সম্ভবত মৃত ব্যক্তির। তাতে লেখা : বিশ্বনাথ শিভালকর, এজেন্ট। সতেরো, এলগিন রোড, কলকাতা ৭০০০২০।
নাম-ঠিকানা সুরেশকে পড়ে শোনালাম। ব্যাগটা আবার ফিরিয়ে রাখলাম পকেটে, উঠে দাঁড়ালাম। ডাক্তারি পরীক্ষা হয়ে গেলে আরও খুঁটিয়ে সব কিছু পরীক্ষা করে দেখব।
বডির বাঁ দিকটায় পোস্টমর্টেম লিভিডিটি দেখা যাচ্ছে। সুরেশ সেদিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, অতটা লালচে হতে অন্তত ঘণ্টাখানেক সময় লেগেছে, কী বলেন?
হ্যাঁ, তা লাগবে।
মেঝের কাছাকাছি মৃতদেহের যে-অংশ থাকে সেখানে রক্ত জমে গিয়েই পোস্ট মর্টেম লিভিডিটি হয়। অর্থাৎ, কেউ বিশ্বনাথ শিভালকরকে ওপরের জানলা দিয়ে ফেলে দেবার আগে সে বাঁ কাত হয়ে অন্তত ঘণ্টাখানেক পড়ে ছিল।
মরার আগে কষে মাল টেনেছে–গন্ধ পাচ্ছি, একটু অবাক হয়ে সুরেশ বলল।
অল্পেতে অবাক হওয়া সুরেশের স্বভাব। ওর চেহারা ছিপছিপে, লম্বা। বয়েস কম, কথাবার্তা নরম। আর লোক ঠকানো, মোলায়েম আচার-ব্যবহার। ফলে এমনিতে বোঝা মুশকিল, ও দরকার পড়লে বেশ শক্ত হতে পারে। এ ছাড়া সুরেশ খিদিরপুরে বালসারার ক্লাবে নিয়মিত মার্শাল আর্ট-এর চর্চা করে। খালি হাতের লড়াইয়ে আমাদের ডিপার্টমেন্টে ওর জুড়ি নেই এবং ভয় নামক অনুভূতি ওর ইন্দ্রিয়ের আওতার বাইরে।
দু-চোখের মাঝে যে-আঘাত পেয়েছে তাতেই মনে হয় শেষ হয়ে গেছে, প্রশ্নের রেশ টেনে কথাটা শেষ করল সুরেশ।
হতে পারে। খুনি হয়তো ভেবেছে ওপর থেকে রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়লে ওই আঘাতের আর চিহ্ন পাওয়া যাবে না। কিন্তু খুনির দুর্ভাগ্য–।
সুরেশ আমার কথা শুনে হাসল, বলল, তা এখন কী করবেন?
ডাক্তার, অ্যাম্বুলেন্স না আসা পর্যন্ত তুমি এখানে থাকো। আমি হোটেল থেকে হেডকোয়ার্টারে ফোন করছি। তারপর সবাইকে একটু নাড়াচাড়া দিয়ে দেখি।
গলি থেকে বেরিয়ে পথ ঘুরে ব্লু স্টার-এর সদর দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম। বিশাল কাচের দরজা পাঠানপুঙ্গব শোভিত।
দরজা পেরোলেই এয়ারকন্ডিশন্ড রিসেপশন–অনিবার্যভাবেই উগ্র আধুনিকাখচিত।
সোজা গিয়ে রিসেপশন কাউন্টারের সামনে দাঁড়ালাম। পকেট থেকে আই.ডি.-টা বের করে সুন্দরীকে দেখালাম। তারপর ফোন তুলে হেডকোয়ার্টারে ডায়াল করলাম। ও.সি. অজিত বোসকে খুনের ঘটনাটা জানিয়ে এই কেসে ফুলটাইম ডিউটি চাইলাম। উনি ডি.সি.ডি.ডি.-কে জানিয়ে দেবেন বলে অনুমতি দিলেন। এবং বললেন, শিগগিরই অ্যাম্বুলেন্স ও ফোরেনসিক ডিপার্টমেন্টের দুজন লোক পাঠাচ্ছেন।
ব্লস্টার হোটেলের স্টারের সংখ্যা পাঁচ না হলেও তিনের কম নয়। লবিটা প্রয়োজনের তুলনায় ছোট এবং এলিভেটরটা সম্ভবত খোদ ওটিস সাহেবের হাতে তৈরি। রিসেপশনিস্ট-এর কাছে ম্যানেজারের খোঁজ করলাম। উত্তর পেতে দেরি হচ্ছে দেখে কাউন্টারে খটখট করে দুবার শব্দ করলাম।
