আমি ভয় পাওয়া কাতর গলায় বললাম, পবন, প্লিজ! আমি খ্যাতি চাই না, পুরস্কার চাই না…ফেমাস হতে চাই না! আমাকে মেরো না..প্লিজ!
কোথায় গেল সেই আয়রনম্যান সূর্যদ্যুতি সেন! আমাদের সিক্রেট এক্সপিডিশানের লিডার! আয়রনম্যান থেকে এখন সে স্পঞ্জম্যান হয়ে গেছে! ভয় বড় সাঙ্ঘাতিক জিনিস চিফ–বিশেষ করে মৃত্যুভয়…। চিফ, সরি ফর দ্য মিসচিফ! পবনের হাতের ছুরি অল্প-অল্প দুলতে লাগল।
পবন, প্লিজ! অদিতি…প্লিজ…! আমি বড়-বড় শ্বাস টানতে গিয়ে হঠাত্ত কাশতে শুরু করলাম। কাশতে কাশতে আমার মুখ লাল হয়ে গেল, দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইল। জ্যাকেটের ভেতর থেকে আমি স্টেইনলেস স্টিলের কনটেনারটা বের করে নিলাম। হাতের ইশারায় কোনওরকমে পবনকে থামতে বলে কনটেনারের ঢাকনা খুললাম। তারপর ওটা মুখের কাছে নিলাম চুমুক দেওয়ার জন্যে।
আমার অভিনয়ে পবন ঠকে গেল। ভাবল, জীবন ভিক্ষে চাওয়া, কাকুতি-মিনতি করা, মেরুদাঁড়াহীন একটা প্রাণী ওর সামনে ধ্বংসস্তূপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অসহায় অবস্থায় ব্র্যান্ডি বা ওইজাতীয় কিছু খেতে চাইছে।
তাই ও বলল, য়ু আর গ্রেট, চিফ। ঠিক সময়ে ঠিক জিনিসটা বের করেন।
ঠান্ডা হাওয়ার বেগ শনশন করে বাড়ছিল। যে-কটা পেঙ্গুইন আমাদের কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করছিল সেগুলো ঢাল বেয়ে চলে যেতে লাগল নীচে হ্রদের দিকে।
আমি কনটেনারটা পবনের দিকে বাড়িয়ে ধরে ওর দিকে আরও এক পা এগিয়ে গেলাম।
আমরা এখন প্রায় মুখোমুখি। ওকে বললাম, তুমি একচুমুক খেতে পারো…কিন্তু আমাকে ছেড়ে দাও, প্লিজ…।
আমার কাতর অবস্থা দেখে পবন হাসল।
আমি নিশ্চিন্ত ছিলাম। আজ উষ্ণতা বড়জোর মাইনাস বত্তিরিশ কি তেত্তিরিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর কসেট্রেটেড নাইট্রিক অ্যাসিডের হিমাঙ্ক মাইনাস ৪১.৬ ডিগ্রি। সুতরাং অ্যাসিডটা জমে হিম হয়ে যাওয়ার কোনও ভয় নেই। বরং এই ঠান্ডায় অ্যাসিডের কোনও ভেপার তৈরি হবে না–ধোঁয়ার মতো সেটা দেখাও যাবে না কনটেনারের মুখ দিয়ে। ফলে পবন বুঝতে পারবে না আমি ওর মুখে কী ছুঁড়ে দিতে চলেছি।
না, বুঝতে পারল না।
বুঝতে পারল যখন, তখন দেরি হয়ে গেছে। ওর মুখ, গগল্স আর জ্যাকেট ভয়ঙ্কর অ্যাসিড একেবারে শেষ করে দিল। ছুরিটা খসে পড়ল ওর হাত থেকে। দু-হাতে মুখ চেপে ধরে ও পড়ে গেল বরফের ওপরে। কসাইখানার মৃত্যুপথযাত্রী শুয়োরের মতো গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে লাগল।
হতবাক অদিতি পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে–যেন সিনেমার রোমাঞ্চকর শেষ দৃশ্য দেখছে।
কিন্তু দৃশ্যটা আমি আরও রোমাঞ্চকর করে তুলতে চাই। আমি গ্রুপ লিডার। আমিই সবসময় শেষ কথা বলব। পবন শর্মা বা রাবণ শৰ্মা নয়।
তাই কনটেনারটা ফেলে দিয়ে পলকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আইস অ্যাক্সটা তুলে নিলাম। কৃষ্ণা আর টুসকির সঙ্গে আমি দেখা করতে চাই। টুসকিকে কোলে নিয়ে চুমো খেতে চাই। বারবার, অনেকবার। কেউ আমাকে রুখতে পারবে না। কোনও শুয়োরের বাচ্চা আমাকে রুখতে পারবে না।
হিংস্র জন্তুর মতো একটা ভয়ঙ্কর চিৎকার বেরিয়ে এল আমার গলা দিয়ে। এবং একইসঙ্গে ভয়ঙ্কর শক্তিতে আইস অ্যাক্স গেঁথে দিলাম পবনের কোমরে।
ওর জ্যাকেট, পোশাক, চামড়া, মাংসসব স্তর ভেদ করে আইস অ্যাক্সের ধারালো ফলা বোধহয় হাড়ে গিয়ে ধাক্কা খেল।
পবন একটা যন্ত্রণার চিৎকার নিয়েই ব্যস্ত ছিল, তাই আইস অ্যাক্সের আঘাতের জন্যে আলাদা করে চিৎকার করতে পারল না। চিৎকারটা একটু জোরালো হল শুধু।
ও আর অদিতি বোধহয় এখন বুঝতে পারছে, আমি দুজনের চেয়েও একটু বেশি।
আইস অ্যাক্সটা পবনের শরীরে গেঁথে গিয়েছিল। তাই ওটা টানাটানি না করে পবনের ফেলে দেওয়া ছুরিটা তুলে নিলাম।
সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সঙ্গে-সঙ্গে তুষারঝড় শুরু হয়ে গেল।
শুকনো বরফকুচি অল্প-অল্প উড়ছিল একটু আগে থেকেই। এখন সেটা বাড়তে শুরু করল।
এতক্ষণ পর অদিতি চিৎকার করে কেঁদে উঠল। কান্না তো নয়, যেন কোনও পাগলের সব হারানোর হাহাকার।
প—ব–ন!
অদিতির ডাকটা এমন বুকফাটা যে, মৃত মানুষও জেগে উঠতে চাইবে। কিন্তু পবন উঠল না। আমি জানি, আর কোনওদিন উঠবে না। কারণ, ওর কাতরানি বন্ধ হয়ে গেছে।
পবন ওর কতটা বন্ধু ছিল? কত কাছাকাছি ছিল?
অদিতির দিকে দু-পা এগোতেই ও হিস্টিরিয়া রুগির মতো তীক্ষ্ণ গলায় চেঁচিয়ে উঠল? খবরদার! আমার দিকে এগোবেন না।
বরফ উড়ছিল। শীতও আমাদের নিয়ে এবার ছেলেখেলা করতে শুরু করেছে। আশেপাশে পেঙ্গুইন আর একটাও নেই। এখন বড় ভয়ের সময়। এখানে আর থাকাটা ভালো হবে না। আন্টার্কটিকায় ঠান্ডা কারও কথা শোনে না। নিজের খুশিমতো কাজ করে।
আমি হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম, অদিতি! আমি তোমার ভালো চাই। আমাকে ভুল বুঝো না। এর মধ্যেই অনেক ভুল হয়ে গেছে। প্লিজ! চলো, আমরা ক্যাম্পে ফিরে যাই। সেখানে ঠান্ডা মাথায় বসে কথা হবে।
অদিতি এবার পাগলের মতো কাজ করে বসল। একলাফে উঠে পড়ল ওর মোমোবাইলে। গাড়ি স্টার্ট করে ছুটিয়ে দিল। চাপা গর্জন তুলে সাদা বরফের কুচির আড়ালে ওর গাড়িটা হারিয়ে গেল।
কিন্তু এই ব্লিজার্ডের মধ্যে ও কোথায় যাবে?
একজন জীবিত ও একজন মৃত রওনা হয়ে গেল দিকশূন্যপুরের দিকে। যখন ওদের আবার খুঁজে পাওয়া যাবে তখন সুজাতা আর ও একই জায়গায় চলে গেছে। আন্টার্কটিকায় যারা হারিয়ে যায় তারা একেবারে হারিয়ে যায়। তাদের আর ফেরানো যায় না।
