পেঙ্গুইনটার মৃতদেহ ঘিরে তখনও চার-পাঁচটা পেঙ্গুইন ঘোরাফেরা করছিল। মাঝে-মাঝেই মৃতদেহের ওপর মাথা ঝুঁকিয়ে কাছ থেকে নজর করে ওরা বুঝতে চাইছিল ওদের ভাইটি নড়াচড়া করছে না কেন।
শনশনে ঠান্ডা হাওয়া আমার গায়ে ছুঁচ ফুটিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু সামনে দাঁড়ানো দুই শত্রুর দিকে তাকিয়ে আমি শীত ভুলে যাচ্ছিলাম।
অদিতিকে আমার অপছন্দ হচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু পবনকে দেখে গা ঘিনঘিন করছিল। যেন থালায় বেড়ে দেওয়া ভাতের ওপরে একতাল সাদাটে পোকা কিলবিল করছে। ওদের গায়ের লালা চকচক করছে, মিশে যাচ্ছে ভাতের সঙ্গে। এবং সেই ভাতের গ্রাস কেউ তুলে দিতে চাইছে আমার মুখে।
আমি বুঝতে পারছিলাম, গত পরশু সকালে সুরেন্দ্র নায়েককে ড্রিল-হাউসে পাঠানোর পর অদিতি কেন স্টার্ট-আপে ওকে সাহায্য করার ছুতোয় যেচে ড্রিল-হাউসে যেতে চেয়েছিল। সেখানে ও আর পবন মিলে, বলতে গেলে আমাদের নাকের ডগায়, সুরেন্দ্রকে খুন করেছে। তারপর আমাদের বোকা বানাতে অদিতি ড্রিল-হাউস ছেড়ে চলে এসেছে। আর অদিতি চলে আসার পর পবন ড্রিল স্টার্ট করে দিয়েছে। সেই শব্দ পেয়ে বাইরে থেকে আমরা ভেবেছি সুরেন্দ্র ড্রিল স্টার্ট করল।
সুরেন্দ্রর ভ্যানিশ হওয়ার ব্যাপারটা যে কোনও প্রাগৈতিহাসিক সরীসৃপের কাণ্ড হতে পারে সে-ধারণা আমাদের মধ্যে চারিয়ে দিতে চেষ্টা করেছিল অদিতি। কারণ, ড্রিল-হাউস থেকে বেরিয়ে এসে ও বলেছিল, সুরেন্দ্র ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে–যেটা পুরোপুরি ওর বানানো। অথচ সুরেন্দ্র নায়েক তখন আর বেঁচে নেই। আর পবন শুরু থেকেই এমন একটা ভান করছিল যেন লেক এক্স-এর জলে ভয়ঙ্কর কোনও প্রাণী আছে, সেটা যে-কোনও সময় ড্রিলিং শ্যা বেয়ে উঠে আসতে পারে। অভিনয়ের গুণে পবন ওর ভয়টা সংক্রামক ব্যাধির মতো অনেকের মধ্যেই ছড়িয়ে দিতে পেরেছিল। আমাদের দলে সবচেয়ে ভিতু ছিল সুজাতা রায়। ও ভয়ে একেবারে হিস্টিরিক হয়ে উঠল। তখন এই কাল্পনিক ভয়কে কাজে লাগিয়ে পবন আর অদিতি হারাধনের দশটি ছেলে-র খেলা শুরু করল।
পবন এবার পায়ে-পায়ে আমার কাছে এগিয়ে আসতে লাগল। রক্তমাখা ছুরিটা ওর হাতের মুঠোয় পেশাদারি ঢঙে ঝুলছে। খুব নরম গলায় ও বলল, ক্লোজ্বড রুম প্রবলেম তৈরি করার পর লুকিয়ে টয়লেটে গিয়ে একটা পেঙ্গুইনকে খতম করলাম। তার পাশে যে-পেঙ্গুইনটা দাঁড়িয়ে ছিল সেটার বুকে রক্ত ছিটকে লাগল ইয়োর ড্যাম পেট উকিলসাহেব–শালা লইয়ারকা বচ্চা! তারপর ওটার বডি চাপা দিয়ে দিলাম বরফের নীচে। কিছু ব্লাড স্পট নষ্ট করলাম না–আপনার জন্যে ক্ল হিসেবে রেখে দিলাম। আমরা জানতাম, যদি কখনও আপনি ওই ব্লাড টেস্ট করাতে চান তো আপনাকে অদিতির হেল্প নিতে হবে। কারণ, আমাদের দলে আর কেউ ব্লাড টেস্ট করতে জানে না–নট ইভন সুজাতা। সুতরাং, সেদিক থেকে আমরা খুব সেফ ছিলাম।
অদিতি গ্লাভসের পিঠ দিয়ে মুখ মুছে নিয়ে বলল, সূর্যদা, আমার প্ল্যানটা এখন নিশ্চয়ই আপনি মোটামুটি বুঝতে পেরেছেন? পবন উধাও হওয়ার পর সবচেয়ে শক্ত কাজ ছিল ওকে সবার চোখের আড়ালে লুকিয়ে রাখা। ও কখনও থাকত আমার তাবুতে, আর কখনও থাকত ড্রিল-হাউসে। বিশেষ করে ও রাতটা কাটাত ড্রিল-হাউসে। তা ছাড়া, মাত্র দু-তিনটে রাতের তো মামলা! আর আমি ওর খাবারটা দরকারমতো পৌঁছে দিতাম।
আমার মনে পড়ে গেল ড্রিল-হাউসে কুড়িয়ে পাওয়া পাঁউরুটির টুকরোগুলোর কথা। এ ছাড়া রোহিত যে স্টোর রুম থেকে শব্দ শুনেছে বলে বলছিল সেটা যদি সত্যি হয় তা হলে বুঝতে হবে চুপিসারে অদিতি অথবা পবন ও-ঘর থেকে খাবার চুরি করছিল।
সুরেন্দ্র, চন্দ্রেশ্বর, রোহিত–ওদের ডেডবডিগুলো কোথায় লুকিয়েছ? আমি অদিতিকে জিগ্যেস করলাম। আর এগিয়ে আসা পবনের জন্যে মনে-মনে একটা উপায় খুঁজতে লাগলাম।
আমার বুকের ভেতরে কষ্ট হচ্ছিল। অভিযানের সাথী চার-চারজনকে নিষ্ঠুরভাবে খুন করতে পবন আর অদিতির হাত কাঁপেনি। শুধু খ্যাতির লোভে ওরা সাইকোপ্যাথ হয়ে গেছে!
অদিতি আমার প্রশ্নের জবাব দিল, ওরা সবাই শুয়ে আছে বরফের নীচে। সুরেন্দ্রকে পবন ছুরি দিয়ে নিকেশ করেছে। রোহিত আর চন্দ্ৰেশ্বর চন্দ্রবিন্দু হয়ে গেছে বিষ মেশানো ব্র্যান্ডি খেয়ে।
পবন আমার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। ঠোঁট সামান্য ফাঁক করা সামনের কয়েকটা দাঁত দেখা যাচ্ছে। সেই অবস্থাতেই খিকখিক করে হাসল ও। তারপর জাপানি সামুরাই যোদ্ধাদের অনুকরণে লম্বা ছুরিসমেত ডানহাতটা টান-টান করে বাড়িয়ে ধরল সামনে। ওর ছুরির ডগা আমার জ্যাকেট ছুঁয়ে ফেলল। কৃষ্ণা আর টুসকির কথা মনে পড়ল আমার। ওদের সঙ্গে আর কি দেখা হবে?
পবন বলল, ডেডবডিগুলো ক্যাম্পের আশপাশে যেখানে পোঁতা আছে সেগুলো আমরা একটা-একটা করে তুলে নিয়ে আসব। এনে পুঁতে দেব এখানে। আপনার আর সুজাতারটাও। তা হলে হেডকোয়ার্টার যদি পরে কোনও এনকোয়ারি করে কি ইনভেস্টিগেশান চালায় তো বডিগুলো আর খুঁজে পাবে না। সব ফুস! বাঁহাত ঘুরিয়ে ম্যাজিশিয়ানের মতো একটা ভঙ্গি করল পবন। তারপর হাসল আবার।
পবন, আমি তোমার বন্ধু। তোমার ভালো চাই। আমি রিপোর্টে সবকিছু টোন ডাউন করে তোমাদের ফেবারে লিখব–তাতে শাস্তি অনেক কম হবে। আমি…আমি…।
আপনি আমার কাছে এখন একটা পেঙ্গুইনের বেশি কিছু নন। ঠিক ওই পেঙ্গুইনটার মতন। আঙুল তুলে মরা পেঙ্গুইনটার দিকে দেখাল পবন ও ধড় আর মাথা আলাদা হয়ে পড়ে আছে।
