সূর্যদা, কেন মিছিমিছি ঝামেলা করছেন! নকল অনুনয়ের সুরে জঙ্গি মেয়েটা বলল, কেন বুঝতে পারছেন না, এটা বইয়ের লাস্ট চ্যাপটার লাস্ট চ্যাপটারে আপনার আর কিছু করার নেই…মরা ছাড়া…।
অদিতি, এখনও বলছি তুমি ভুল করছ। আমি ওকে বোঝাতে চাইলাম ও এখনও থামার সময় আছে।
খিলখিল করে হাসল অদিতি-অনেকক্ষণ হাসল। তারপর বড়-বড় শ্বাস নিয়ে বলল, থামার জন্যে এতগুলো মৃতদেহ ডিঙিয়ে আমরা এতটা পথ আসিনি। লেক এক্স-এর জলের অ্যানালিসিসের যাবতীয় খবর শুধু আমরা দুজন বিজ্ঞানের দুনিয়াকে জানাতে চাই। রিসার্চ পেপার যা-কিছু পাবলিশ করব সব আমাদের দুজনের নামে। আর যদি কপালে নোবেল-টোবেল জুটে যায় তা হলেও ভাগাভাগি করব আমরা দুজন। জানেন তো, খ্যাতি বেশি ভাগ হয়ে গেলে তার আর গুরুত্ব থাকে না। তাই দু-ভাগের বেশি করতে আমার মন চায়নি। অর্ধেক আমি, আর বাকি অর্ধেক ও। নো থার্ড পারসন। লাইক দ্য আইডিয়া? নাউ গেট রিড অফ দ্য ব্লাডি আইস অ্যাক্স, উইল য়ু?
ওর সঙ্গের লোকটা কে? ওর সঙ্গের লোকটা কে হতে পারে?
সূর্যদা, বাচ্চা ছেলের মতো জেদ করবেন না। আমরা দুজন, আপনি একা–য়ু ডোন্ট হ্যাভ আ ড্যাম চান্স। তাই ভদ্রভাবে মরার চেষ্টা করুন–বরফে কবর দেওয়ার আগে আপনার বডিটা নক্কা-ছক্কা হোক সেটা নিশ্চয়ই আপনি চাইবেন না! সো ট্রাই টু ডাই ডিসেন্টলি।
সুজাতাকে তুমি খুন করেছ?
হ্যাঁ, করেছি–তা ছাড়া আর উপায় কী! হাসল অদিতিঃ এখন ওর বডিটাকে এখানে কবর দেব। আর আপনাকে জ্যান্ত টেনে আনব বলে ক্যাম্পে খতম করিনি। ডেডবডি বয়ে আনার ঝামেলা তো আপনি জানেন! এখন সুবিধে হল, আপনি নিজেই কবরখানায় চলে এসেছেন…নিন, এবার আইস অ্যাক্সটা ছুঁড়ে ফেলে দিন!
এইবার ওর সঙ্গী একটা বড় ছুরি বের করে নিল স্নোমোবাইলের ভেতর থেকে। মেঘলা আলোয় ছুরির ফলাটা কেমন ঘোলাটে দেখাচ্ছিল।
আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না কী করব। মনে পড়ে গেল, গত পরশুই আমি অদিতির সামনে স্পর্ধা দেখিয়ে বলেছি, .আমি একা দুজনের চেয়েও একটু বেশি। এই কথাটা আমি অফিশিয়ালি সবাইকে জানিয়ে রাখতে চাই…। এখন সেটা প্রমাণ করার সময় এসে গেছে। কিন্তু রহস্যটা তো এখনও আমার কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি। থিয়োরি একটা খাড়া করেছি বটে, কিন্তু তার জায়গায়-জায়গায় এখনও কিছু কিছু ফাঁক থেকে গেছে। সেটা জানতে হলে অদিতির শাগরেদের পরিচয়টা আগে জানা দরকার।
তাই বললাম, যদি আইস অ্যাক্সটা না ফেলি?
একথা বলমাত্র যা ঘটে গেল তার জন্যে আমি তৈরি ছিলাম না।
অদিতিদের আশেপাশে বেশ কয়েকটা পেঙ্গুইন হাঁকডাক করতে-করতে ঘোরাফেরা করছিল। আচমকা তারই একটির গলা লক্ষ করে ছুরি চালাল লোকটা। আর চোখের পলকে পেঙ্গুইনটার মাথা মাটিতে। বরফে রক্তারক্তি। রক্ত ছিটকে লাগল হতভাগ্য পেঙ্গুইনটার পাশে দাঁড়ানো এক নিরীহ জাতভাইয়ের বুকে। পেঙ্গুইনগুলো ডাকাডাকি বন্ধ করে স্তব্ধ হয়ে গেল মুহূর্তে। যেন এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শোকে ওরা নীরবতা পালন করছে। আর এই ধরনের মৃত্যুর সঙ্গে পাখিগুলো আদৌ পরিচিত নয় বলে খানিকটা যেন হতভম্ব হয়ে গেছে।
যেখানে সুন্দর তোমাকে আদর করে ঘিরে রাখে সেখানে হঠাৎই অসুন্দর থাবা বসালে তুমি আঘাত পাও সবচেয়ে বেশি, তাই না?
এই পাখিটার করুণ মৃত্যু আমাকে পাথর করে দিল। আইস অ্যাক্সটা অজান্তেই খসে পড়ল আমার হাত থেকে। আর একইসঙ্গে মনে পড়ে গেল উকিলসাহেবের কথা।
আমার মাথার মধ্যে যেন হাজার ওয়াটের ইলেকট্রিক বাল্ব জ্বলে উঠল। সমস্ত হিসেব মিলে যেতে লাগল সহজ অঙ্কের মতো।
আমি পাগলের মতো চেঁচিয়ে উঠলাম, পবন! এ তুমি কী করলে! তুমি পাগল হয়ে গেছ। য়ু হ্যাভ গন রেভিং ম্যাড, ম্যান।
দাঁত বের করে হাসল পবন শর্মা। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, যাক, ফাইনালি আপনি চিনতে পারলেন তা হলে! চিফ, সরি ফর দ্য মিসচিফ কিন্তু আইস অ্যাক্সটা ফেলতে আপনি এত দেরি করলেন কেন? আপনাকে ফোর্স করার এ ছাড়া কোনও উপায় ছিল না। অপারেশান লেক এক্স এর শুরু থেকেই অদিতি ছক কষছিল। শি ওয়ান্টেড টু বি রিয়েল ফেমাস। বুদ্ধি সবই ওর– আমি শুধু ওর প্ল্যানমতো কাজ করে গেছি। দ্য হোল প্ল্যান ওয়াজ সো থ্রিলিং!
তা হলে ঠিক এইরকম করে শুরুতেই একটা পেঙ্গুইনকে খুন করেছে পবন শর্মা। সেই রক্ত ছিটকে লেগেছে উকিলসাহেবের বুকে। আমি সেটাকে মানুষের রক্ত ভেবেছি। অদিতি সেই রক্ত পরীক্ষা করে আমাকে ধোঁকা দেওয়ার জন্যে বলেছে, হ্যাঁ, ওটা মানুষেরই রক্ত।
কিন্তু বন্ধ ড্রিল-হাউস থেকে পবন শর্মা বাইরে বেরোল কেমন করে?
সে-কথা জিগ্যেস করতেই আবার হাসল পবন। ওর ডানহাতে ধরা ছুরিটা অলসভাবে ঝুলছে। হতভাগ্য পেঙ্গুইনটার রক্ত জমাট বেঁধে গেছে বরফের ওপরে। টের পাচ্ছি, হাওয়ার জোর ক্রমশ বাড়ছে।
চিফ, আপনার বোধহয় খেয়াল আছে, ড্রিল-হাউসের কাঠের তক্তাগুলো বাইরে থেকে আটকানো ছিল। তারই একটা খুলে আমি আলগা করে রেখেছিলাম। ঘটনার দিন ড্রিলটাকে অটোমেটিক মোডে চালিয়ে রেখে ভেতর থেকে চাপ দিয়ে তক্তাটা খুলে ফেলি। তার আগে অবশ্য তক্তাগুলোর জোড়ের ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেখে নিয়েছিলাম যে, বাইরেটা শুনশান আছে কি না। ব্যস, কাম ফতে। বাইরে বেরিয়ে তক্তাটাকে আবার ঠুকে জায়গামতো বসিয়ে দিয়েছি। ড্রিল হাউসের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছিলাম আগেই। সো দ্যাট ক্রিয়েটেড দ্য ক্লোজড রুম প্রবলেম। আপকা ইউনিক বন্ধ করে কা মামলা। ইট ওয়াজ আ নাইস টাচ, ওয়ান্ট ইট? দরাজ গলায় হা-হা করে হেসে উঠল পবন শর্মা। আমাকে বোকা ভাবতে ওর বেশ ভালো লাগছিল।
