আর যদি এমন হয় যে, অদিতি আর সুজাতা অন্য কারও মৃতদেহ–রোহিত, চন্দ্রেশ্বর, বা আর কারও–স্নোমোবাইলে তুলল, তা হলে সুজাতাকেই অদিতির কুকাজের সঙ্গী বলে মানতে হয়।
কিন্তু তাই যদি হয়, তা হলে অদিতির জ্যাকেটে রক্তের ব্যাখ্যাটা তো পাওয়া যাচ্ছে না!
আমার সব অঙ্ক গুলিয়ে যেতে লাগল।
আমি আর দেরি করলাম না। তাড়াহুড়ো করে ফিরে এলাম ক্যাম্পের কাছে। স্টোরের বাইরের দরজাটা হাট করে খোলা ছিল। চটপট স্টোরে ঢুকে একটা মোমোবাইল স্টার্ট করলাম।
ঠান্ডায় এই গাড়িগুলোর স্টার্ট নিতে কোনও সমস্যা হয় না। জাপানের হিয়োমোটো কর্পোরেশন-এর স্নোমোবাইলের বিশেষত্বই এই সাবজিরো এনভায়রনমেন্টে উষ্ণ দেশের সাধারণ গাড়ির মতোই আচরণ করে। আর এদের গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দও কম। তা ছাড়া বরফের ওপর চলার সময় ফ্রিকশনাল ফোর্স খুব কম বলে এই গাড়ির মোটিভ পাওয়ারও তেমন বেশি প্রয়োজন হয় না।
বাইরে এসে স্নোমোবাইল চালিয়ে দিলাম অদিতির তাবু লক্ষ করে। দেখি ওদের গাড়িটা তবু ছাড়িয়ে তখন অনেকটা সামনে এগিয়ে গেছে।
আন্টার্কটিকায় গাড়িতে চড়ে কোনও গাড়িকে অনুসরণ করার কাজটা মোটেই কঠিন নয়। কারণ, পলাতক গাড়িটা বরফে তার স্পষ্ট চলার দাগ রেখে যায়। তাই বরফের ঢালের ওঠা নামায় কখনও কখনও অদিতির গাড়িটা হারিয়ে গেলেও আমি পথ হারাইনি।
স্নোমোবাইলে ব্রেক নেই। অ্যাকসিলারেটরে চাপের হেরফের করে গতি কম-বেশি করতে হয়, এবং দরকার হলে গাড়ি থামানোও যেতে পারে। আর গাড়ির দুটো গিয়ারকে প্রয়োজনমতো সুইচ টিপে বদলানো যায়। বরফ যদি মোটামুটি মসৃণ হয় তা হলে মোমোবাইলের গতি ঘণ্টায় তিরিশ কি পঁয়তিরিশ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
এখন গাড়ির স্পিডোমিটারের কাঁটা প্রায় পঁচিশ কিলোমিটারের দাগ ছুঁই-ছুঁই। এবড়োখেবড়ো পথের জন্যে চলার সময়ে সামান্য ঝাঁকুনি দিচ্ছে। কিন্তু সামনের একটা ঢালের কাছে পৌঁছেই গাড়ির গতি কমিয়ে একেবারে দশে নিয়ে আসতে হল। কারণ, সামনের ঢালে সাগি অনেক বেশি।
আন্টার্কটিকায় যখন ঝোড়ো হাওয়া বয় তখন ভারী বাতাসের দুরন্ত গতির জন্যে বরফের ওপরে গভীর আঁচড় পড়ে যায়। ভিজে বালির ওপরে আঙুল টানলে যেরকম গর্ত হয় অনেকটা সেই ধরনের নকশা কাটা হয়ে যায় বরফের গায়ে। এরকম পাশাপাশি দুটো লম্বাটে গর্তের মাঝে থাকে বরফের আল। এ ধরনের গর্তকেই বলে সাব্রুগি। সাগির ওপর দিয়ে স্নোমোবাইল চালানো খুব ঝকমারি। তাই আমাকে গতিবেগ কমাতে হয়েছে। অবশ্য গতিবেগ কমিয়েছে অদিতিও।
অনেকটা সাসক্রুগি–অঞ্চল পেরোনোর পর বাটির মতো ঢালু একটা জায়গায় চলে এলাম। এতদিনের দিকনির্ণয়ের অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারছিলাম, অদিতি স্নোমোবাইল নিয়ে পেঙ্গুইন রুকারির দিকেই চলেছে।
কিন্তু কেন? শেষ পর্যন্ত কোথায় যেতে চায় ও?
সেটা বোঝা গেল খানিক পরেই। কারণ, পেঙ্গুইন রুকারির খুব কাছে গিয়ে থামল অদিতির গাড়ি।
অবশ্য গাড়ি না থামিয়ে উপায় ছিল না।
এতক্ষণ মাথার ওপরে গাঢ় নীল আকাশ ছিল, ছিল স্তিমিত হলুদ সূর্য, আর তুলোর স্তূপের মতো কয়েক গণ্ডা ধবধবে মেঘ। এখন সাদা মেঘে সূর্য ঢেকে যাওয়ায় বিস্তীর্ণ চরাচরে হোয়াইট আউট হয়ে গেছে। আন্টার্কটিকায় হোয়াইট আউট হল ব্ল্যাক আউটের ঠিক উলটো। অর্থাৎ, চারপাশ অন্ধকার কিংবা কালোর বদলে সাদাটে হয়ে যায়। এখন মেঘে ঢাকা সূর্যের আলো ঘষা কাচের মতো ঘোলাটে হয়ে গেছে। ফলে কোথাও কোনও ছায়া না পড়ায় সাদা বরফে কোনও উঁচু-নীচু জায়গা কিংবা সাগি মোটেই আর ভালো করে বোঝা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় গাড়ি চালানো খুব মুশকিল।
হয়তো সেইজন্যেই স্নোমোবাইল থামিয়েছে অদিতি। তারপর ওরা নেমে পড়েছে গাড়ি থেকে।
অদিতির গাড়ির কাছ থেকে বরফের ঢালটা আরও নীচে নেমে গিয়ে মিশে গেছে কৃত্রিম হ্রদের জলে। সেখানে অসংখ্য অ্যাডেলি পেঙ্গুইন ঘুরে বেড়াচ্ছে। তা ছাড়া, অদিতির গাড়ি থামতেই গোটা পাঁচ-ছয় কৌতূহলী পেঙ্গুইন এসে ওদের প্রায় ঘিরে ধরল।
ওদের কাছে গিয়ে স্নোমোবাইল থামালাম আমি। নেমে এলাম গাড়ি থেকে।
আর সঙ্গে-সঙ্গেই অদিতি শক্ত গলায় বলে উঠল, আইস অ্যাক্সটা আমাদের দিকে ছুঁড়ে দিন, সূর্যদা।
আমি সময় নিতে চাইলাম। ওর সঙ্গের পুরুষমানুষটির দিকে তাকিয়ে বুঝতে চাইলাম সে কে। কারণ, চেহারা দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই। মাথা টুপিতে ঢাকা, চোখে ঠুলির মতো জম্পেশ গগল্স, গায়ে হাড় কাঁপানো শীতের জ্যাকেট, পায়ে ভারী জুতো। শরীরের খোলা জায়গা বলতে শুধু দু-গালের দুটো ত্রিভুজ, নাক, আর গোঁফের নীচে ঠোঁটের রেখা।
অদিতিকে সাহায্য করতে নতুন কেউ কি এসেছে আমাদের ক্যাম্পে?
অসম্ভব! আমাদের চোখ এড়িয়ে নতুন কোনও লোক ক্যাম্পে আসতেই পারে না।
অদিতি আবার বলল, আইস অ্যাক্সটা আমাদের দিকে ছুঁড়ে দিন।
ওর গলাটা চারপাশের বরফের চেয়েও ঠান্ডা শোনাল।
ওদের কথা শুনে অনুমানে বুঝলাম, ওদের কাছে পিস্তলজাতীয় কোনও অস্ত্র নেই। থাকলে নির্ঘাত সেটা আমাকে দেখাত। তা ছাড়া, আন্টার্কটিকাতে লুকিয়ে পিস্তল-টিস্তল আনা মুশকিল। তাই আইস অ্যাক্সটা কোমর থেকে খুলে নিয়ে ডানহাতের শক্ত মুঠোয় চেপে ধরলাম। ভাবটা এমন, ছুঁড়ে দিতেও পারি, আবার না-ও দিতে পারি।
