ছেলেটা এবার সিরিয়াস মুখ করে বলল, হীরাকে নিয়ে চলে গিয়ে চুনিদা কোনও অন্যায় করেনি। ওদের মোহাব্বত আছে। শরদিন্দু মিত্তির মোহাব্বতের কী বুঝবে! ও শালা তো বউকে পুড়িয়ে মেরেছিল– ছেলেটার মুখ ঘেন্নায় কুঁচকে গেল।
এই মুহূর্তে শরদিন্দু মিত্রের জীবনী জানার কোনও আগ্রহ নেই আমার। সুতরাং কোনও মন্তব্য না করে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
ছেলেটা হাতের ঝাপটায় বাতাস কাটার ভঙ্গি করে বলল, আপনি যদি ফিরে না যান তা হলে চুনিদা আপনাকে ছেড়ে দেবে না। চুনিদা বহুত খতরনাক লোক। আপনি এসব ফ্যামিলির ঝামেলায় নাক গলাবেন না। ছেলেটা আঙুলে তুড়ি বাজাল দুবার। বলল, মিত্তিরের ওখানে আমাদের লোক আছে। সব খবরই আমরা পাই। সুতরাং সময় থাকতে থাকতে হাপিস হয়ে যান। ন-দো গিয়ারা। ফুটটুস…।
আমি হঠাৎই হাসতে শুরু করলাম। গলা ফাটানো হাসি।
হাসি দেখে চুনি ব্যানার্জির চামচে এবং আমার লোকাল গার্জেন কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। আর চায়ের দোকানের মালিক চমকে নড়েচড়ে বসল। ওর হাড়ে হাড়ে খটাখট শব্দ হল।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। ঢোলা জিসের প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকালাম। হাতটা যখন মুঠো করে বের করে নিয়ে এলাম তখন তার সঙ্গে স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন মিলিটারি অ্যান্ড পুলিশ মডেলের দুটো রিভলভার বেরিয়ে এল। মাত্র দুইঞ্চি ব্যারেলের এই হ্যান্ডগান ০.৩৮ স্পেশাল কার্ট্রিজ ফায়ার করতে পারে। বন্দুকবাজের সঙ্গে মোকাবিলায় এই খুদে রিভলভার ভীষণ কাজের। এর এক-একটার ওজন মাত্র পাঁচশো গ্রাম। আধুনিক ধাতুবিজ্ঞান এই রিভলভারকে একইসঙ্গে মাপে ছোট এবং ক্ষমতাশালী করে তুলতে পেরেছে।
ছেলেটার মুখের রক্ত পলকে মঙ্গলগ্রহে চলে গেল। ওর চোখ বড় বড় হয়ে উঠল। আর বাঁ গালের একটা পেশি কেঁপে উঠতে লাগল বারবার।
রিভলভার দুটো আমি বেঞ্চির ওপরেই রাখলাম। তারপর হাসতে হাসতেই প্যান্টের অন্য পকেটে হাত ঢোকালাম।
ছেলেটা এবার স্পষ্ট কেঁপে উঠল থরথর করে। বলল, মিস্টার শিকদার, আমি– আমি–।
আমি হেসে বললাম, আমি রোজ রিভলভার চেটে দেখি, চুষে দেখি, কামড়ে দেখি, চুমু খেয়ে দেখি–।
বলে একটা রিভলভার তুলে নিয়ে চুমু খেলাম। মিষ্টি শব্দ হল। ওকে বললাম, তোকে আজকের মতো ছেড়ে দিলাম। যা, মাঠে গিয়ে হা-ডু-ডু খেল।
ছেলেটা ফ্যাকাশে মুখে দৌড়ে পালাল। আমি ওকে দেখলাম কিছুক্ষণ।
আমার খবর ছেলেটা পেল কেমন করে? কে খবর দিল ওকে? আর চুনি ব্যানার্জি কি সত্যিই ভয়ংকর লোক? কতটা ভয়ংকর? শরদিন্দুর সঙ্গে কি পাল্লা দিতে পারবে সে?
আর হীরা! অষ্টাদশী ওই অপরূপ সুন্দরী কি সত্যিই ভালোবাসে চুনিকে? নাকি জটিল কোনও সমীকরণ লুকিয়ে রয়েছে এর আড়ালে?
রিভলভারগুলো আবার পকেটে রাখলাম।
শরদিন্দু মিত্র ছেলেখেলা করার জন্যে আমাকে ডাকেননি। এখন ছেলেখেলার সময় নয়। আমাকে আরও সাবধান হতে হবে।
চায়ের দোকানির দিকে চোখ পড়তেই দেখি বৃদ্ধ দু-হাঁটুর ফাঁকে মাথা গুঁজে বসে। বোধহয় ঠিক করেছে, একটু আগের দেখা অশ্লীল দৃশ্য জীবনে আর দেখবে না। অবশ্য এর জীবন বলতে আর কয়েকটা দিনও বাকি আছে কি না কে জানে!
চায়ের পয়সা মেটালাম একটা দু-টাকার নোট দিয়ে। বাচ্চা ছেলেটা কোথায় যেন লুকিয়ে পড়েছিল। ছুটে এসে টাকাটা নিল। ওকে জিগ্যেস করলাম টাক মাথা ছেলেটাকে চেনে কি না। কালো বাচ্চাটা মাথা নাড়ল। না, কোনওদিন দ্যাখেনি।
গাড়িতে উঠে স্পিড বাড়ালাম। নাঃ, নাটক মনে হয় জমে উঠেছে। জানি না সামনে এখন কী অপেক্ষা করছে।
.
ডায়মন্ডহারবারের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে বুঝলাম, আমার জন্যে একটা লাশ অপেক্ষা করছিল। এবং সেই লাশের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎকার হল রীতিমতো নাটকীয়ভাবে।
লাল রঙের মারুতি ওমনিটা ছুটে আসছিল আমাকে লক্ষ করে। আর ছুটে আসার পথে বিপজ্জনকভাবে টলছিল এপাশ ওপাশ।
এক লহমার জন্যে আমার মনে হয়েছিল কোনও সেন্ট পারসেন্ট মাতাল বেলা সাড়ে বারোটায় এই ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি চালানো প্র্যাকটিস করছে। কিন্তু গাড়িটা আমাকে পাশ কাটিয়ে যেতেই–অথবা বলা যেতে পারে, আমি কোনওরকমে ওটাকে পাশ কাটিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়িয়েছি, আর একইসঙ্গে আমার গাড়ির চাকা ভয়ঙ্কর আর্তনাদ তুলে পিচের রাস্তা ছেড়ে পাশের কাদামাটিতে গভীর ছাপ ফেলে টাল খেয়ে আবার উঠে এসেছে রাস্তায়। তবুও যা দেখার তা ওইটুকু সময়ের মধ্যেই দেখে নিয়েছি।
ওমনি গাড়িটা চালাচ্ছে একজন মাঝবয়েসি লোক। মাথায় কঁচাপাকা চুল। জামায় লাল রঙের ছোপ। আর গাড়ির পেছনের কাঁচে কয়েকটা ফুটো, সেগুলোকে ঘিরে মাকড়সার জালের মতো চিড় খাওয়া হিজিবিজি।
আর গাড়ির গতি কমিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর কী ভেবে গাড়ি থামিয়ে দিলাম একেবারে। জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে লাল ওমনিটা দেখতে লাগলাম।
ফঁকা রাস্তায় এলোমেলোভাবে ছুটে মিলিয়ে যেতে-যেতে গাড়িটার ড্রাইভার বোধহয় মত পালটাল। কারণ গাড়িটা রাস্তা থেকে নেমে গিয়ে সোজা মুখ থুবড়ে পড়ল পাশের নালায়। সেখানকার ঝোঁপঝাড় আগাছার মধ্যে গাড়িটার শতকরা সত্তরভাগই ঢাকা পড়ে গেল।
না, আর দেরি নয়। আমার একটা স্বভাব হচ্ছে সব সময় পরের ব্যাপারে নাক গলানো। এই স্বভাবটা বোধহয় জন্মগত কিংবা জন্মের আগে থেকেই। আর সেইজন্যেই নাকটাও কি একটু বেশি চোখা?
