অদিতি জ্যাকেটের বরফ ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, আমি তা হলে একটু আমার টেন্টে যাই। কয়েকটা টেস্ট আর রিডিং নেওয়া বাকি আছে।
সুজাতা প্রায় আঁতকে উঠলঃ আমি তা হলে কোথায় যাব? আমি একা-একা থাকতে পারব না। আমি আপনার সঙ্গে থাকব, সূর্যদা।
তুই আমার সঙ্গে চল– অদিতি প্রস্তাব দিল : তা হলে আমাকে একটু হেল্প করতে পারবি।
আমি বললাম, তুমি অদিতির সঙ্গেই যাও, সুজাতা। একা-একা ওর কাজের অসুবিধে হবে।
আসলে এখন আমার একটু একা থাকা দরকার।
সুজাতা ঘাড় বেঁকিয়ে আমার দিকে তাকাল। একপলক কী ভেবে নিয়ে অদিতিকে বলল, তাই চলো।
ওরা দুজন রওনা হয়ে গেল অদিতির তাঁবুর দিকে।
আমি রোহিতের বোতলটা পকেট থেকে বের করলাম। ছিপি খুলে বোতলটা নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শুকলাম।
নাঃ, অস্বাভাবিক কোনও গন্ধ নাকে আসছে না।
তখন বোতল থেকে কয়েক ফোঁটা তরল ঢেলে নিলাম ছিপিতে এবং তার রং দেখেই অবাক হয়ে গেলাম। রোহিতের বোতলের তরলটা উজ্জ্বল কমলা রঙের। আমাদের ড্রিল বিটটাকে লুব্রিকেট করার জন্যে একটা ক্যাডমিয়াম কম্পাউন্ড আমরা ব্যবহার করেছি। মনে হচ্ছে, সেই কম্পাউন্ডটা কেউ রোহিতের ব্র্যান্ডির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে।
ওই ক্যাডমিয়াম কম্পাউন্ডটা মারাত্মক বিষাক্ত কেমিক্যাল। সেটা রোহিতের বোতলে কে মেশাল?
মনে হয়, এই বোতল থেকে রোহিত আর চন্দ্ৰেশ্বর কয়েক সেঁক করে খেয়েছে। আর খাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই বুঝেছে, না খেলেই ভালো হত। তারপর ওদের সব এনার্জি খতম হয়ে গেছে। অথবা, বিষ খেয়ে কাবু হয়ে পড়ার পর খুনি এসে বাকি কাজটুকু শেষ করেছে।
সুতরাং, নিশ্চিত হওয়ার জন্যে রোহিতের বোতল থেকে একটু স্যাল্প নিয়ে টেস্ট করতে শুরু করলাম। যদি ক্যাডমিয়ামের ট্রেস পাই, তা হলে বুঝব আমার সন্দেহ সত্যি।
কুমেরু অভিযানে এসে আমাদের নানারকম অভিজ্ঞতা হয়েছে। নিজের বিষয় ছাড়াও অন্য বিষয়ে কাজ করতে হয়েছে। অন্য বিজ্ঞানীদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে গিয়ে অনেক জিনিস শিখে ফেলেছি আমি। সুরেন্দ্র বেঁচে থাকলে এই অ্যালিসিসটা ও-ই করত। তারপর বহু খুঁটিনাটি তথ্য আমাকে দিত। কিন্তু সেরকম জ্ঞান বা দক্ষতা আমার নেই। তাই শুধু ক্যাডমিয়ামের ট্রেস খুঁজব। যদি পাই…।
পেলাম।
পেয়েই নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগছিল। আমার দলের সাথীরা একজন-একজন করে উধাও হয়ে যাচ্ছে, আর আমি গ্রুপ লিডার হয়ে নির্বিকারভাবে সব দেখে যাচ্ছি–কিচ্ছু করতে পারছি না!
মনের কোণে সন্দেহ যে একটা উঁকি দিচ্ছে না তা নয়। কিন্তু সন্দেহ তো আর প্রমাণ নয়! তা ছাড়া আমার সন্দেহ যদি ভুল হয় তা হলে বিপদ আরও বাড়বে। আবার অদিতি আর সুজাতাও হয়তো ওদের মতো করে কাউকে সন্দেহ করছে। কে জানে, ওরাও হয়তো প্রমাণ খুঁজছে।
ভাবলাম, ওদের ডেকে নিই। তারপর আলোচনা করে বেস স্টেশনে রেডিয়ো মেসেজ পাঠাব।
এই কথা ভেবে পোশাক-টোশাক পরে তৈরি হয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। অদিতির তাবু পর্যন্ত হেঁটে যাব, না কি ওদের ওয়াকিটকি দিয়ে ডেকে পাঠাব? অদিতি কি ওয়াকিটকি সঙ্গে নিয়ে ওখানে গেছে?
ঠিক তখনই ইঞ্জিনের শব্দ শুনলাম।
আমাদের ক্যাম্পে বা ড্রিল-হাউসে আলো জ্বালানোর জন্যে ইঞ্জিন-জেনারেটর সেট চলছিল। সেই আওয়াজে নতুন আওয়াজটা চাপা পড়ে যেতেই পারত। পড়েনি যে, তার কারণ ইঞ্জিন জেনারেটর সেটের শব্দটা আমাদের কানে ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজের মতো হয়ে পুরোপুরি সয়ে গেছে। সেইজন্যেই এই বাড়তি আওয়াজটা আমার কানে ধরা পড়ল।
আমি স্টোরের দিকে হাঁটা দিলাম। কারণ, আওয়াজটা আমার সেদিক থেকেই এসেছে।
আমি স্টোরের বাইরের দরজার কাছে পৌঁছনোর আগেই একটা স্নোমোবাইল নিয়ে অদিতি বেরিয়ে এল। অদিতি যে, সেটা বুঝলাম ওর জ্যাকেটের রং দেখে। এমনিতে ও সুজাতার চেয়ে অনেক লম্বা, কিন্তু স্নোমোবাইলের ড্রাইভিং সিটে বসে থাকায় ওর উচ্চতা বোঝা যাচ্ছিল না।
আমি অবাক হয়ে ওকে জিগ্যেস করলাম, কী ব্যাপার? মোমোবাইল নিয়ে কোথায় যাচ্ছ?
অদিতি কেমন যেন ঘাবড়ে গিয়ে ইতস্তত করে বলল, ইয়ে…মানে…ওই পেঙ্গুইন রুকারিতে বেড়াতে যাচ্ছি। সুজাতা যেতে চাইছে…।
সুজাতা কোথায়?
আ-আমার টেন্টে। ও বলল স্নোমোবাইল নিয়ে আসতে।
সুজাতা একথা বলল। আমি অবাক হয়ে গেলাম : যে ভয়ে একমুহূর্তও একা থাকতে চাইছে না সে তোমাকে স্নোমোবাইল আনার জন্যে ছেড়ে দিল–তোমার সঙ্গে এল না!
না, মানে…ও বলল…। অদিতি একটা উত্তর তৈরি করার প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল। আর তখনই জিনিসটা আমার নজরে পড়ল। এতক্ষণ খেয়াল করিনি–এখন খেয়াল করলাম।
অদিতির জ্যাকেটে রক্তের ছিটে।
সুজাতাকে তুমি কী করেছ? বলেই আমি ওর ওপরে বলতে গেলে ঝাঁপিয়ে পড়লাম।
কিন্তু আমি নড়বার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে অদিতি স্নোমোবাইল চালিয়ে দিল। গাড়িটার ধাক্কায় আমি পড়ে গেলাম। কমলা রঙের গাড়িটা ছিটকে গেল বরফের ওপরে। গর্জন করে এগিয়ে চলল অদিতির তাঁবুর দিকে।
আমি কোনওরকমে সামলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। তারপর তাড়াতাড়ি হাঁটতে শুরু করলাম অদিতির তাঁবু লক্ষ করে।
খানিকটা এগোনোর পরই দেখি একটা দেহ ধরাধরি করে এনে রাখা হল স্নোমোবাইলে।
কিন্তু অদিতি তো একা নয়! ওর সঙ্গে আর-একজন কে?
যদি ধরে নিই ওরা দুজনে সুজাতার ডেড বডি স্নোমোবাইলে এনে রাখল, তা হলে অদিতির সঙ্গী কে?
