এ যেন সেই হারাধনের ছেলেদের কাহিনি। হারিয়ে গিয়েছিল দুজন–এখন দুই দুগুণে চারজন!
এসো, চটপট রুমটা সার্চ করে ফেলি। নির্দেশ দিতে গিয়ে আমার গলাটা কেমন কেঁপে গেল।
আমার কথায় অদিতি আর সুজাতা সংবিৎ ফিরে পেল যেন। তারপর যন্ত্রের মতো কাজ শুরু করল।
আমি ওদের দেখছিলাম। গত তিন-চার দিনে কত বদলে গেছে ওরা!
অথচ এখানে আসার সময় থেকেই ওরা দুজন উৎসাহ উদ্দীপনায় টগবগ করে ফুটত। সবসময় আন্টার্কটিকা নিয়ে নানান প্রশ্ন করে আমাকে আর রোহিতকে নাজেহাল করে দিত।
রোহিত একদিন কপট বিরক্তি নিয়ে আমাকে বলল, দাদা, এই দুজনকে নিয়ে আর পারা যাচ্ছে না। ওরা আমাকে এত কোশ্চেন করে যে, আপনি তো জানেন, আমি ওদের নাম দিয়েছি কোশ্চেন জোড়ি। এখন আমাকে জিগ্যেস করছে, আন্টার্কটিকায় লেডি রিসার্চার হিসেবে ওদের পজিশন কোথায়।
আমি তখন হেসে বললাম, ওদের পজিশন অনেক পেছনে।
কেন, অনেক পেছনে কেন! সুজাতা উদ্ধত ছাত্রীর মতো প্রশ্ন করেছিল আমাকে।
আমি নকল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, ইতিহাসকে কি আর বদলানো যায়! শোনো…১৯৪৭ এ এক মার্কিন অভিযাত্রী দল এখানে এসেছিল। সেই দলে দুজন মহিলা ছিল : এডিথ রন আর জেনি ডারলিংটন। আন্টার্কটিকায় মহিলা হিসেবে ওরাই প্রথম। তারপর, প্রায় ষাট বছর ধরে, বহু মহিলা এই বরফের মহাদেশে পা রেখেছে। ১৯৭৮ সালের ৭ জানুয়ারি আর্জেন্টিনার এক মহিলা অভিযাত্রী একটি শিশুর জন্ম দেন এই মহাদেশে। শিশুটির নাম রাখা হয় এমিলিও মার্কোস পালমা। আর শুধু ভারতের মহিলা অভিযাত্রীদের হিসেবে ধরলে অদিতি আর সুজাতার পজিশন…আচ্ছা, রোহিত, ওদের মধ্যে কে আগে জাহাজ থেকে নেমে আন্টার্কটিকায় বরফে পা দিয়েছিল বলো তো?
রোহিত চোখ সরু করে চিন্তার ভান করতে শুরু করল।
সুজাতা তড়িঘড়ি বলে উঠল, আমি আগে নেমেছি। অদিতিদি পরে নেমেছে…।
অদিতি হাত নেড়ে ওকে বাধা দিয়ে বলল, মোটেই না, আমি আগে নেমেছিলাম। তুই তো ছোট…তাই তোর মনে নেই…আগে-পরে গুলিয়ে ফেলেছিস…।
আমি তখন মধ্যস্থতা করতে চেয়ে বলেছি, থামো! থামো! ঝগড়া করে লাভ নেই। তোমরা দুজনে যুগ্মবিজয়ী হয়েছ। তোমাদের পজিশন টুয়েলথ–শুধু ইন্ডিয়ান লেডি রিসার্চার ধরলে…।
সবই মনে হচ্ছে, এই তো সেদিনের ঘটনা!
অথচ আজ, এখন? উচ্ছল টগবগে মেয়ে দুটো কী ভয়ঙ্কর মলিন হয়ে গেছে! যে-কোনও মুহূর্তে সাপ দেখতে পারে এই আতঙ্ক নিয়ে ওরা ড্রিল-হাউস সার্চ করছে।
এসব কথা ভাবছিলাম আর ড্রিল-হাউসের মেঝেটা খুব খুঁটিয়ে নজর করছিলাম। বুটের ডগা দিয়ে মেঝের বরফ খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে দেখছিলাম কোনও কিছু পাওয়া যায় কি না। আসলে এইভাবে দু-দুটো জোয়ান মানুষের হুট করে উধাও হওয়ার ব্যাপারটা আমরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।
হঠাৎই ঠক করে একটা হালকা শব্দ হল।
কী এটা! বরফের ওপরে ঝুঁকে পড়লাম আমি। কী যেন একটা চকচক করছে!
তাড়াতাড়ি পা দিয়ে বরফ খুঁড়তে লাগলাম। তারপর ঝুঁকে পড়ে কোমরে বাঁধা আইস অ্যাক্স খুলে নিলাম।
দশ সেকেন্ডের মধ্যেই আইস অ্যাক্সের কাজ শেষ। বরফ খুঁড়ে জিনিসটা বের করলাম বাইরে।
রোহিতের সেই এনার্জির বোতল।
বোতলটা তুলে নিয়ে আঁকাতেই বুঝলাম, তার ভেতরে এনার্জি এখনও রয়েছে।
বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেল আমার। এই বোতল ছেড়ে রোহিত তো কোথাও যাওয়ার ছেলে নয়!
খারাপ কিছু যে একটা ঘটে গেছে তা নিয়ে আমার আর কোনও সন্দেহ রইল না।
চোখ তুলে দেখি অদিতি তখন ড্রিলের ফ্রেমের গায়ে লাগানো মই বেয়ে ওপরে উঠছে। আর সুজাতা ড্রিল আর দেওয়ালের মাঝখানটায় ঝুঁকে পড়ে অনুসন্ধানের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
চট করে বোতলটা তুলে নিয়ে আমি জ্যাকেটের পকেটে ঢুকিয়ে দিলাম। বোতলটা আমি সবার চোখের আড়ালে পরীক্ষা করে দেখতে চাই।
অদিতি বোধহয় মইয়ের ওপর থেকে আমাকে লক্ষ করে থাকবে। ও চেঁচিয়ে জিগ্যেস করল, কিছু পেলেন, সূর্যদা?
আইস অ্যাক্স কোমরে গুঁজে আমি সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। গলার স্বর যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রেখে বললাম, না, সেরকম কিছু না।
কিন্তু অদিতির মুখ দেখে মনে হল একটা সন্দেহের ছায়া সেখানে খেলা করছে।
ওপরে তন্নতন্ন তল্লাশি চালিয়ে অদিতি নেমে এল। সুজাতাও এসে দাঁড়াল ওর পাশে।
আমি ভাবতে লাগলাম, দুজনের মধ্যে কে। কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গেই হাসি পেয়ে গেল আমার। ঠিক একই কথা নিশ্চয়ই সুজাতা আর অদিতিও ভাবছে।
বাইরে হাওয়ার তেজ বাড়ছিল। শোঁ-শোঁ শব্দ কানে আসছে এবার।
এখন কী করবেন? অদিতি জিগ্যেস করল।
ক্যাম্পে ফিরে গিয়ে একটু ভাবি। তারপর বেস স্টেশনে খবর দেব। সম্ভব হলে দু চার ঘণ্টার মধ্যেই ওরা প্লেন পাঠিয়ে দিক। খুনির সঙ্গে আর আমি পাশা খেলতে চাই না। আমার ঢের শিক্ষা হয়েছে।
আমি ড্রিল-হাউসের দরজার দিকে পা বাড়ালাম। সঙ্গে-সঙ্গে সুজাতা ছুট্টে চলে এল আমার কাছে। আমার হাত চেপে ধরে বলল, আমি আপনার সঙ্গে থাকব।
আমি আড়চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, থাকো না, কে বারণ করেছে।
আমাদের পেছন-পেছন অদিতিও চলে এল ড্রিল-হাউসের বাইরে।
নেহাত অভ্যেসবশেই আমরা এপাশ-ওপাশ তাকালাম। না, কেউ কোত্থাও নেই। তারপর এগোলাম ক্যাম্পের দিকে।
ক্যাম্পে ঢোকার সময় ওদের বললাম, আমি একা কিছুক্ষণ ল্যাবে কাজ করতে চাই। ওরা বরং ততক্ষণ নিজেদের কোনও কাজ থাকলে সেরে নিক।
