.
০৫.
পরদিন সকালে ব্রেকফাস্টের পর শুধু কাজ আর কাজ।
সম্ভবত আজই আন্টার্কটিকায় আমাদের শেষ কাজের দিন। হয়তো রাত থেকেই শুরু করে দেব তল্পিতল্পা বাঁধার কাজ।
তাই চটপট সবাইকে কাজ বুঝিয়ে দিলাম।
চন্দ্ৰেশ্বর আর রোহিত ড্রিল-হাউসে ডিউটি করতে গেল। সুজাতা আর অদিতি পড়ল মেরিন বায়োলজি আর মাইক্রোবায়োলজি নিয়ে।
আমি ক্যাম্পে বসে কাল রাতের কথা ভাবতে লাগলাম।
কাল রাতে সুজাতা যদি সত্যি-সত্যি অভিনয় করে থাকে তা হলে মানতেই হবে ও খুব বড় অভিনেত্রী। ওর নাম সুজাতার বদলে সুচিত্রা হতে পারত।
আমি ভাবছিলাম আর একটা অসম্ভব ধাঁধার সমাধান খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম।
খুনি ভুল করবেই। আমাদের খুনিও করেছে। কিন্তু কী সেই ভুল?
ভাবতে-ভাবতে থইথই জলে তলিয়ে যেতে লাগলাম।
অনেকক্ষণ পর মনে হল, এবার বাইরে বেরোই। চারিদিকে ঠিকঠাক নজর রাখি, যাতে নাটকের শেষ দৃশ্যে আর কোনও ছন্দপতন না হয়।
তাই বাইরের পোশাক গায়ে চাপিয়ে ক্যাম্প ছেড়ে বেরোলাম।
চারিদিকে শুধু বরফ অর বরফ। যেদিকে দুচোখ যায় সেদিকেই সাদা চাদর বিছিয়ে দিয়েছে প্রকৃতি। যেন এই চাদরের নীচে কোনও পবিত্র মৃতদেহ শোয়ানো রয়েছে। তবে মৃতদেহ তো একটি নয়–অনেক। তার মধ্যে পবন শর্মা আর সুরেন্দ্র নায়েকও রয়েছে।
সামান্য হাওয়া বইছিল। হয়তো নতুন কোনও তুষারঝড়ের খবর পাঠাচ্ছিল। আমি ড্রিল হাউসের দিকে কয়েক পা এগোতেই চোখ পড়ল টয়লেটের দিকে। তিনটে পেঙ্গুইন টয়লেটের কাছে ঘোরাফেরা করছে।
আমার একটু অবাক লাগল। ওখানে তো খাবার-দাবার কিছু নেই যে, পাখিগুলো এভাবে ঘোরাফেরা করবে!
পেঙ্গুইনকে দেখে কখনওই আমার পাখি বলতে ইচ্ছে করে না, কিন্তু বিজ্ঞানীরা যখন বলছেন তখন আর উপায় কী! আদিম যুগে সরীসৃপ থেকে বিবর্তনের ফলে এসেছিল পাখি। পেঙ্গুইন সেই আদিম পাখিদের একটি। আন্টার্কটিকা অঞ্চলে হিসেব মতো ছরকমের পেঙ্গুইন পাওয়া যায়–তার মধ্যে এম্পারার পেঙ্গুইন আর অ্যাডেলি পেঙ্গুইন হল মূল মহাদেশের বাসিন্দা। বাকিরা সব কুমেরু বৃত্তের বাইরে আন্টার্কটিকার আশপাশের দ্বীপগুলোতে থাকে। আন্টার্কটিকা মহাদেশের দুরকম পেঙ্গুইনের মধ্যে আবার অ্যাডেলি পেঙ্গুইনের সংখ্যা তুলনায় অনেক বেশি।
পেঙ্গুইনরা জলে পাকা সাঁতারু। এদের পায়ের পাতা হাঁসের মতো। সাঁতারের গতি ঘণ্টায় প্রায় তিরিশ কিলোমিটার। এরা জলের তলায় একশো ফুট গভীর পর্যন্ত চলে যেতে পারে, আর জলে কুড়ি মিনিট পর্যন্ত ডুবসাঁতার দিতে পারে। ডানা দিয়ে এরা সাঁতার কাটে, আর সাঁতারের দিক পালটায় পায়ের পাতা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে। সবচেয়ে অদ্ভুত লাগে যখন এরা জল থেকে লাফিয়ে ডাঙায় ওঠে। রকেটের মতো জল ভেদ করে বেরিয়ে সটান বরফের উঁচু ডাঙায় দাঁড়িয়ে পড়ে– ঠিক যেন কলের খেলনা। সমুদ্রের চিংড়ি এদের প্রধান খাদ্য বলে এরা আন্টার্কটিকায় উপকূল ঘেঁষে আস্তানা গাড়ে। কৃত্রিম এই রুকারিটা আন্টার্কটিকায় একমাত্র ব্যতিক্রম।
কৌতূহল আমাকে টয়লেটের দিকে টেনে নিয়ে গেল। আগামীকাল যদি আমাদের এই ক্যাম্প ছেড়ে চলে যেতে হয়, তা হলে পবন বা সুরেন্দ্রর মৃতদেহ খোঁজার সুযোগ বলতে শুধু আজই। তাই পায়ে-পায়ে পৌঁছে গেলাম টয়লেটের কাছে।
পরশু রাতের তুষারঝড়ে টয়লেটের চেহারা পালটে গেছে। বরফের পাঁচিলগুলো বেঢপ আকারের হয়ে গেছে। ভেতরে বরফ ঢুকে কেমন ঢিবির মতন হয়ে গেছে। ঠিক কোনদিকটায় যেন রক্তের দাগগুলো দেখেছিলাম? নাঃ, এখন সেখানে আর কোনও চিহ্নই নেই। সব বরফে চাপা পড়ে গেছে।
এমন সময় শুনলাম কে যেন আমাকে চেঁচিয়ে ডাকছে।
তাড়াতাড়ি টয়লেটের বাইরে বেরিয়ে এলাম।
ড্রিল-হাউসের কাছ থেকে দুজন আকাশে হাত তুলে নাড়ছে আর আমাকে ডাকছে, সূর্যদা, জলদি আসুন, কুইক!
ওদের হাইট দেখে মনে হল, সুজাতা আর অদিতি। কিন্তু ওরা এরকম উদভ্রান্তের মতো আমাকে ডাকছে কেন?
তাড়াতাড়ি ওদের কাছে গেলাম।
চন্দ্ৰেশ্বর আর রোহিতকে পাওয়া যাচ্ছে না! অদিতি হাঁফাতে হাঁফাতে বলল।
ড্রিল-হাউসে ঢুকে দেখি ওরা কেউ নেই! সুজাতা প্রায় কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল।
আবার ড্রিল-হাউস! আবার দুজন উধাও! এ কী অলৌকিক কাণ্ড ঘটছে বারবার! কোথায় গেল চন্দ্রেশ্বর আর রোহিত? ওরা তো ছেলেমানুষ নয় যে, হঠাৎ করে হারিয়ে যাবে!
আর হারিয়ে যাবেটাই-বা কোথায়?
বরফের ওপরে যতটা তাড়াতাড়ি পারা যায় পা ফেলতে চেষ্টা করলাম। উধাও হওয়ার এই সিঁড়িভাঙা অঙ্ক যেভাবে হোক আমাকে সমাধান করতেই হবে।
অদিতি আর আবেগজর্জর সুজাতাকে সঙ্গে করে ড্রিল-হাউসে ঢুকলাম। ড্রিল-হাউসটাকে এই মুহূর্তে কোনও অপদেবতার অভিশপ্ত কফিন বলে মনে হচ্ছিল।
না, সুজাতা আর অদিতি ভুল বলেনি। ড্রিল-হাউসে কেউ নেই!
চন্দ্ৰেশ্বর আর রোহিত যদি আমাদের না জানিয়ে কোথাও লুকিয়ে পড়ে থাকে, তা হলে মানতেই হবে সে বড় নিষ্ঠুর রসিকতা।
আমার কিন্তু মনে হচ্ছিল, ওরা এমন জায়গায় লুকিয়ে পড়েছে যেখান থেকে আর ফিরে আসা যায় না। অদিতি আর সুজাতারও নিশ্চয়ই সেরকমই মনে হচ্ছিল।
আমরা সবাই চোখ-ঢাকা গগল্স তুলে দিয়েছিলাম মাথার ওপরে। লক্ষ করলাম, অদিতির চোয়াল শক্ত, আর সুজাতা থরথর করে কাঁপছে। ওদের মুখে খসখসে রুক্ষ ভাঁজ।
