হ্যাঁ। ঠান্ডা গলায় বললাম আমি, আমাদের মধ্যে কাকে তোমার খুনি বলে মনে হয়?
ভালো করে দেখতে না পেলেও অনুমান করতে পারলাম, সুজাতা আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর ও বলল, সূর্যদা, সেরকমভাবে কাউকে সন্দেহ হয় না। তবে নিশ্চয়ই আমরা যারা বাকি রয়েছি…তাদের মধ্যেই কেউ। এই ধরুন, আপনি…আমি…চন্দ্ৰেশ্বর…আমরা পাঁচজন…। ।
আচ্ছা সুজাতা, এমন কিছু কি তুমি দেখেছ, যাতে তোমার সন্দেহ হয়েছে, খটকা লেগেছে…?
না, সেরকম কিছু তো মনে পড়ছে না…। ইতস্তত করে ও বলল।
আমি আবার জিগ্যেস করলাম, অকওয়ার্ড কোনও ইনসিডেন্ট–ছোট হোক, বড় হোক– কিছু মনে পড়ছে না?
কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর আমি কী একটা বলতে যাব, তখনই সুজাতা বলে উঠল, আপনি বলছেন বলে মনে হচ্ছে…আজ খুব সকালে আমি টয়লেটে যাব বলে উঠেছিলাম। তখন দেখি রোহিত স্টোর রুম থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছে। আমাকে দেখেই বলল, খিদে পাচ্ছে বলে খাবার খুঁজতে স্টোরে ঢুকেছিল। কিন্তু ওর হাতে খাবারের কোনও ক্যান-ট্যান কিছু ছিল না।
হয়তো পকেটে ছিল…।
তা অবশ্য হতে পারে। কিন্তু তারপরই স্টোর রুমে আপনার ওই অ্যাক্সিডেন্ট…ওটা কি আপনি জেনুইন অ্যাক্সিডেন্ট বলে মনে করেন, সূর্যদা?
কে বলেছে সুজাতার বুদ্ধি নেই!
তুমি ঠিকই গেস করেছ। ওটা বোধহয় অ্যাক্সিডেন্ট নয়। কেউ ওটা সাজিয়েছে।
ওটা রোহিতের ডিজাইন হতে পারে?
সুজাতা এত নির্লিপ্তভাবে কথাটা বলল যে, আমার অবাক লাগল।
রোহিত আইস এক্সপার্ট। বরফের হালচাল ও সকলের চেয়ে ভালো জানে। তাহলে কি ও-ই সরিয়ে দিয়েছে পবন শর্মা আর সুরেন্দ্র নায়েককে–তারপর বরফের আড়ালে লুকিয়ে ফেলেছে ওদের ডেডবডি?
কিন্তু দুটো ডেডবডি লুকোনোর জন্যে আইস এক্সপার্ট হওয়ার দরকার নেই–আইস অ্যাক্স দিয়ে বরফ খুঁড়ে ফেললেই হল। অবশ্য তাতে সময় লাগবে–তা ছাড়া আন্টার্কটিকার বরফও বেশ শক্ত। সুতরাং, দু-দুটো মৃতদেহ লুকিয়ে ফেলার জন্যে বরফ খুঁড়তে হলে সেটা আমাদের চোখের আড়ালে করাটা রীতিমতো কঠিন।
সেই কঠিন কাজটাই কি রোহিত সেরে ফেলেছে।
কিন্তু তাতেও যে সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
রোহিত কিংবা আর যে-ই খুনি হোক, সে কি খুন করবে বলে আগে থেকেই কোনও গর্ত খুঁড়ে রাখতে পারে?
প্রথম কথা, বরফ মাটি নয় যে, গর্ত খুঁড়ে রাখলে সেটা সহজে বুজে যাবে না। এখানে প্রায়ই ঝড় উঠছে…সে-ঝড়ে গর্ত নিশ্চিতভাবে বুজে যাবে। তা ছাড়া, আমাদের ক্যাম্পের কাছাকাছি গর্ত খুঁড়ে রাখলে সেটা আর-সবার চোখে পড়ে যাবে।
নাঃ, অঙ্ক মিলছে না।
আন্টার্কটিকায় ডেডবডি উধাও করাটা বেশ কঠিন ব্যাপার। অথচ সেটাই হয়েছে। ডেডবডি দুটো যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
চিন্তাগুলো মনের ভেতরে বয়ে গেল ঝড়ের মতো।
তখনই টের পেলাম, সুজাতার হাত আমার হাত চেপে ধরেছে।
সুর্যদা, ব্যাপারটা রোহিতের ডিজাইন হতে পারে? চাপা গলায় আবার জিগ্যেস করল সুজাতা।
আমি আলতো করে আমার হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম, হতে পারে। আবার না-ও হতে পারে। অঙ্কের উত্তর এখনও মেলেনি, সুজাতা। খবরটা দিয়ে তুমি ভালো করলে।
সুজাতা আমার হাতটা আঁকড়ে ধরল আবার। বলল, আপনাকে একটা রিকোয়েস্ট করব, সূর্যদা?
আমি এতটুকু বিচলিত হলাম না। যে-কোনও রিকোয়েস্টের স্পষ্ট উত্তর দিতে আমি ভালোবাসি। তাই বললাম, বলো, কী রিকোয়েস্ট?
সুজাতা এরপর যা করল তাতে আমি অবাক হয়ে গেলাম।
অন্ধকারে ও একটা আংটি গুঁজে দিল আমার হাতে। বলল, সূর্যদা, এই আংটিটা আমার সবচেয়ে প্রিয়। আমাকে একজন দিয়েছিল আমেরিকা যাওয়ার আগে। সেই ভালোবাসা নষ্ট হয়ে গেলেও আংটিটা ও যখন দিয়েছিল তখন আমাদের ভালোবাসা নষ্ট হয়নি। তখন রোজ ভোর হত ভালোবাসা দিয়ে, রাত নামত ভালোবাসা নিয়ে। কী দারুণ সময় ছিল! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সুজাতা : এই আংটিটা আপনি রাখুন, সূর্যদা। এটা আপনি নিলে আমার ভীষণ ভালো লাগবে।
সুজাতা হঠাৎই কাঁদতে শুরু করল। কাঁদতে কাঁদতেই বলল, আপনাকে যখনই দেখি..কেন জানি না, ওর কথা মনে পড়ে যায়। আপনি এটা রাখুন, সূর্যদা, প্লিজ…।
কাঁদতে কাঁদতেই আমাকে একরকম জাপটে ধরল সুজাতা। আংটি ধরা হাতের তালুটা জোর করে মুঠো করে দিল। তারপর কাঁদতেই থাকল।
শুনতে পেলাম, কান্নার গোঙানির মধ্যেই ও বারবার বলছে, আমার কিচ্ছু ভাল্লাগছে না…আমার কিচ্ছু ভাল্লাগছে না…।
আমি চুপচাপ সুজাতাকে অনুভব করতে লাগলাম। ওর পিঠে হাত রাখলাম।
জীবন এইরকমই কখনও নিষ্ঠুর, কখনও সুন্দর।
অনেকক্ষণ পর শান্ত হল সুজাতা। ওর আঙুল আমার আঙুল নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগল।
আমি একসময় বললাম, সুজাতা, এবারে যাও–তোমার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ো। কাল অনেক কাজ আছে।
উত্তরে ও বলল, না সূর্যদা–আমি এখানে শোব…।
আমি কিছু বলে ওঠার আগেই সুজাতা আমার কাছ ঘেঁষে শুয়ে পড়ল। ছোট্ট খুকির বায়না করার মতো বলল, আমি আপনার কাছে ঘুমোব–।
তোমার যা খুশি…।
বহু পরীক্ষা আমি পার হয়ে এসেছি…সুজাতা নতুন করে আর কী পরীক্ষা নেবে।
তবে ঠিক সেই মুহূর্তে আমি যা ভাবছিলাম সেটা জানতে পারলে সুজাতা খুব কষ্ট পেত।
আমি ভাবছিলাম, আমাকে চুপিসাড়ে খুন করতে এসে আমি জেগে আছি দেখে সুজাতা এরকম ন্যাকা-ন্যাকা অভিনয় করছে না তো!
