ওটার হাতলটা চেপে ধরার সঙ্গে-সঙ্গেই অন্ধকারের মানুষটা চাপা ফিসফিসে গলায় ডেকে উঠল, সূর্যদা–
কে? গলাটা কার? সে কি জিপার খোলার সামান্য খসখস শব্দটা শুনতে পেয়েছে?
আমি কোনও জবাব দিলাম না। শুধু আইস অ্যাক্সের হাতলের ওপরে আমার মুঠো আরও শক্ত করলাম।
চন্দ্রেশ্বর, রোহিত, অদিতি, কিংবা সুজাতা–যে-ই হোক, তাকে আমি চমকে দেব।
সূর্যদা…। আবার চাপা ডাকটা ভেসে এল।
সে কি জানতে চাইছে, আমি জেগে আছি না ঘুমিয়ে আছি? যদি ঘুমিয়ে থাকি, তা হলে কাজ শেষ করতে কোনও অসুবিধে হবে না। আর যদি জেগে থাকি, তা হলে…।
সূর্যদা, ঘুমিয়ে পড়েছেন নাকি?
এবার বোঝা গেল, মেয়ের গলা। হয় সুজাতা, নয়তো অদিতি।
আমি সাড়া দিলাম : কে?
ও, আপনি জেগে আছেন? আমার কিছুতেই ঘুম আসছে না…ভীষণ ভয় করছে।
সুজাতাকে এবার চেনা গেল। এই সময়ে ও আমার কেবিনে এসেছে কেন? নেহাত ভয় পাচ্ছে বলে?
আইস অ্যাক্সের ওপরে আমার হাত শিথিল হল। স্লিপিং ব্যাগের জিপারটা আরও খানিকটা খুলে শরীরটাকে সহজ করে নিলাম। তারপর উঠে বসলাম।
সুজাতা আমার খুব কাছে চলে এল। চাপা গলায় ইনিয়েবিনিয়ে বলল, আমার ভীষণ ভয় করছে, সূর্যদা। এভাবে আমি আর পারছি না।
আমি সুজাতার উষ্ণতা টের পেলাম। আলতো করে বললাম, ভয় পাওয়ার কী আছে! আর তো দু-একটা দিন!
সেইজন্যেই তো আমি আর পারছি না। অন্ধকারে সুজাতার হাত আমার শরীর খুঁজে পেল : আর কদিন পরেই তো আমাদের ফিরে যেতে হবে। আবার সেই একঘেয়ে জীবন।
সুজাতার গল্পটা আমি জানি–ওর মুখেই শুনেছি। পড়াশোনা শেষ করার বছর দুয়েকের মধ্যে ও একটি ছেলের প্রেমে পড়ে। ম্যানেজমেন্টের ঝকঝকে ছাত্র। চোখের সামনে বিরাট স্বপ্ন। ওদের সাধ ছিল, আমেরিকায় গিয়ে সেল করবে। ছেলেটি আমেরিকা রওনা হওয়ার দিনসাতক আগে সুজাতার মা হার্ট অ্যাটাকে অসুস্থ হয়ে পড়ে। ফলে ওকে সি-অফ করতে সুজাতা এয়ারপোর্টেও যেতে পারেনি।
তারপর কী যে হল! বিদেশে ও চলে যাওয়ার পর দুটো চিঠি পেয়েছিল সুজাতা। উত্তরও দিয়েছিল। সেই উত্তরের আর কোনও উত্তর আসেনি। ব্যাপারটা এমন আচমকা শেষ হয়ে গেল যেন কোনও গল্পের বইয়ের শেষ পৃষ্ঠাগুলো কেউ একটানে ছিঁড়ে নিয়েছে।
এইভাবেই শেষ হয়েছে সুজাতার অসম্পূর্ণ গল্পটা।
একঘেয়ে জীবন কেন বলছ? আন্টার্কটিকাতেই বরং আমার একঘেয়ে লাগছে। আমি তো মাঝে-মাঝেই হোমসিক হয়ে পড়ছি।
আমার কথায় সুজাতা বোধহয় হাসল। সেই ধরনেরই একটা চাপা শব্দ পেলাম যেন। তারপর তেতো গলায় বলল, :, হোম থাকলে তবে না হোমসিক! আমার এখানেই ভালো। লাগছে, সূর্যদা।
হতাশ হওয়া ভালো নয়, সুজাতা। হতাশা একটা অসুখ। আমি অন্ধকারেই আন্দাজ করে ওর পিঠ চাপড়ে চিলাম : তুমি যাও–ঘরে গিয়ে ঘুমোনোর চেষ্টা করো…।
ও আমার হাতটা চেপে ধরল। তারপর চাপা গলায় প্রশ্ন করল, আপনার মন বলে কিছু নেই?
আছে। তবে সেই মনটা পড়ে আছে কলকাতায়। আর এখানে? এখানে আমি বরফের দেশের প্রাণী ছাড়া আর কিছু নই।
আপনি এত অন্যরকম কেন বলতে পারেন?
তুমিই বলো তুমি তো মেরিন বায়োলজিস্ট…।
এবার আমাকে আঁকড়ে ধরল সুজাতা। আমার কাঁধের কাছে মুখ ঘষতে ঘষতে বলল, আমি যে ভীষণ কষ্ট পাচ্ছি, সূর্যদা।
আমি ওকে বাধা দিলাম না। কৃষ্ণা আর টুসকির বর্ম আমাকে আন্টার্কটিকায় বরফ করে দিয়েছে।
ওকে শুধু বললাম, তুমি খুব লাকি, সুজাতা, যে তুমি কষ্ট পেতে জানো। অনেক মানুষ আছে যারা কষ্টও টের পায় না। ভাবো তো, তাদের কী কষ্ট!
যেমন আপনি…। কথা বলতে বলতে আমার হাতের আঙুলে পাগলের মতো মোচড় দিতে লাগল ও।
আমি অন্ধকারে হেসে ফেললাম। বুক ঠেলে একটা বড় শ্বাস বেরিয়ে এল। সুজাতা আমার ব্যাপারটা ঠিক বুঝবে না। ভালোবাসার দুর্গে ফাটল ধরাতে গেলে তার চেয়েও তীব্র ভালোবাসা দরকার হয়। কৃষ্ণা আর টুসকিকে হারানো কি এতই সহজ। সুজাতা এটা বোঝে না?
মেয়েটার জন্যে কষ্ট হল আমার। বুঝতে পারছিলাম, মনে-মনে ও খুব একা। আর এটাও বুঝতে পারছিলাম, ও আর অদিতি একই ধাতুতে গড়া নয়।
সুজাতা আমার গায়ে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে উঠলঃ সূর্যদা, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে…।
আমি ওর মাথায় হাত রেখে বললাম, সুজাতা, তোমাকে একটা কথা বলি…।
কী কথা? শ্বাস টানতে টানতে জিগ্যেস করল ও।
ভগবানের দোকানে পাঁচফোড়নের প্যাকেট বিক্রি হয়–তাতে সুখ, দুঃখ, আনন্দ, যন্ত্রণা, ভালোবাসা, কষ্ট সব মেশানো থাকে। কেউ চাইলেই শুধু সুখ, আনন্দ আর ভালোবাসার প্যাকেট কিনতে পারে না। আসলে ওই পাঁচফোড়নের প্যাকেটটাই জীবন। তোমার কি ধারণা আমার কোনও দুঃখ-কষ্ট নেই? আছে। কারও বাইরেটা দেখে ভেতরটা বোঝা যায় না। তুমি মন খারাপ কোরো না। দেখো, দুদিন পরেই তোমার মন ভালো হয়ে যাবে। তুমি যাও…ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ো…দেখবে ঘুম এসে যাবে।
সুজাতা কিছুক্ষণ চুপচাপ রইল। আমি ওর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। ওর উষ্ণতা টের পাচ্ছিলাম খানিকটা। ওর মাথা থেকে হাত নামিয়ে নিলাম ধীরে-ধীরে।
সুজাতা মেয়ে খারাপ নয়। অবশ্য আমরা কেউই খারাপ নই। তা সত্ত্বেও আমাদের মধ্যে একজন ভয়ঙ্কর খুনি লুকিয়ে রয়েছে।
আমি ডাকলাম : সুজাতা।
উ। ও আমাকে আঁকড়ে ধরল।
তোমার কাউকে সন্দেহ হয়?
সুজাতা আমাকে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে বসল পলকে : সন্দেহ?
