ড্রিল-হাউসে যে কাজ বাকি আছে তাতে এ-বেলায় শেষ হবে না। কাল সকালটাও লেগে যাবে। দেখা যাক, কত তাড়াতাড়ি পাততাড়ি গোটানো যায়!
চন্দ্ৰেশ্বর আর রোহিত বেরিয়ে যাওয়ার পর সুজাতা রান্নাঘর গুছিয়ে ফেলার কাজে লেগে পড়েছিল। আর অদিতি ল্যাবে ব্যস্ত ছিল–বোধহয় ব্লাড টেস্ট করছিল।
আমি একা-একা আনমনা চিন্তায় ডুবে গেলাম।
এলোমেলো ভাবতে-ভাবতে মনে পড়ে গেল বাড়ির কথা। কৃষ্ণার কথা, টুসকির কথা।
আন্টার্কটিকার সঙ্গে কলকাতার সময়ের তফাত মাত্র সাড়ে চার ঘণ্টার মতো। এখন তা হলে কী করছে টুসকি? পড়ছে, না খেলছে? শেষ ওদের টেলেক্স করেছি দিনসাতেক আগে। যে-মেসেজটা টেলেক্স করতে হবে সেটা আমরা রেডিয়ো কমিউনিকেশানের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিই বেস স্টেশনে। সেখান থেকে ওরা স্যাটেলাইটের সাহায্য নিয়ে টেলেক্স মেসেজ গন্তব্যে পৌঁছে দেয়।
কৃষ্ণা আর টুসকির কথা ভাবতে ভাবতে হোমসিক হয়ে পড়লাম। সবকিছু ভুলে গিয়ে মনে হতে লাগল কতক্ষণে বাড়ি ফিরে গিয়ে টুসকিকে জাপটে ধরে চুমোয়-চুমোয় ভরিয়ে দেব। আমার ছোট্ট মেয়েটা আইসক্রিম-পাগল। যখন আন্টার্কটিকার জন্যে বাড়ি ছেড়ে রওনা হই তখন ও বারবার বলছিল, বাবার কী মজা! ওখানকার বরফের ওপরে রোজ সিরাপ ঢেলে দিয়ে দিব্যি মজা করে খেতে পারবে। শত চেষ্টাতেও ওকে বোঝাতে পারিনি যে, আন্টার্কটিকার এসে কারও আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করবে না।
টুসকির কথাটা ভাবতে গিয়ে মনে-মনে দৃশ্যটা দেখতে পেলাম : ধবধবে সাদা বরফের ওপরে কে যেন লাল রঙের রোজ সিরাপ ছড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমি সেই সিরাপে জিভ ছোঁয়াতেই মিষ্টির বদলে নোনতা স্বাদ পেলাম। সিরাপটা কখন যেন বদলে গেছে রক্তে।
সঙ্গে-সঙ্গে আমার ঘরকাতরতা উবে গেল। ভেসে গেল কৃষ্ণা আর টুসকির চিন্তা। রূঢ় বাস্তব ধাক্কা মারল আমাকে।
তন্দ্রার মধ্যেই আবছাভাবে মনে হচ্ছিল কে যেন আমাকে ডাকছে। এখন বুঝলাম, অদিতি। ও আমার কেবিনের দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছে হাতে কয়েকটা কাচের স্লাইড আর একটা স্যা ব্যাগ।
সূর্যদা, আমার টেস্ট করা হয়ে গেছে। স্যাটা মানুষের রক্ত। হিমোগ্লোবিন পার্সেন্টেজ আর হোয়াইট ব্লাড করপাস-এর শেপ দেখে বোঝা গেছে।
কথাটা বলতে গিয়ে অদিতির গলা কেঁপে গেল। ও জ্যাকেটের হাতা দিয়ে চোখ মুছল। বোধহয় পবনের খুনের ব্যাপারটা ওকে আবার ধাক্কা দিল।
আমি তাড়াতাড়ি উঠে পড়লাম। ওর হাত থেকে জিনিসগুলো নিয়ে গুছিয়ে রেখে দিলাম। মনের মধ্যে একটা দুষ্টু বুদ্ধি খেলা করছিল। বুঝলাম, সন্দেহ বড় বিষম বস্তু।
আমি অদিতির মুখের দিকে তাকালাম। নাঃ, ওকে আর বাড়তি ঝুঁকির মধ্যে ফেলাটা ঠিক হবে না।
ওকে বললাম, আমি ড্রিল-হাউসে যাচ্ছি..সুজাতার কাজ হয়ে গেলে ওকে নিয়ে ড্রিল হাউসে এসো। হাতের সব কাজ সেরে নিই। তারপর কাল হালকা মেজাজে পেঙ্গুইন রুকারিতে বেড়াতে যাব। আর কাল রাতে রেডিয়ো মেসেজ পাঠিয়ে ফাইনাল প্যাকিং শুরু করব। ও. কে.?
ও. কে., সূর্যদা। বলে অদিতি রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
আমার দলের এই মেয়েটা এককথায় সম্পদ। সবসময়েই ও যে-কোনও কাজের জন্যে তৈরি। এরকম বিপজ্জনক অভিযানে এরকম বেপরোয়া মেয়ে খুব জরুরি।
.
অন্ধকারে চুপচাপ শুয়ে শুরু থেকে ঘটনাগুলো ভাবছিলাম।
প্রথমে পবন শর্মা খুন হল। উধাও হল ওর মৃতদেহ।
এরপর উধাও হল সুরেন্দ্র নায়েক।
ব্যাপারটা অনেকটা পবন শর্মার মতোই–শুধু রক্তের দাগটুকু যা পাওয়া যায়নি।
পবন আর সুরেন্দ্র–ওরা দুজনেই উধাও হয়েছে ড্রিল-হাউস থেকে।
পবনের ধারণা ছিল, ড্রিলিং শ্যা বেয়ে কোনও প্রাগৈতিহাসিক সরীসৃপ লেক এক্স থেকে উঠে আসতে পরে। অথচ সুরেন্দ্র কিন্তু মোটেই ভিতু ছিল না।
দুরকমের দুজন মানুষ ড্রিল-হাউস থেকে উধাও হয়ে গেল।
এখন তো আমরা লেক এক্স-এর জলে পৌঁছে গেছি! কোনও সরীসৃপের সন্ধান তো আমরা পাইনি! আসলে পবন আর সুরেন্দ্রকে সরীসৃপের মতো কোনও মানুষ খুন করেছে। আমাদেরই কেউ একজন।
তারপর আজ সকালের ঘটনা কিংবা বলা ভালো দুর্ঘটনা।
স্টোর রুমের ওই অ্যাক্সিডেন্টটার জন্যে আমি মোটেই তৈরি ছিলাম না। কিন্তু আমাকে খতম করাই কি খুনির উদ্দেশ্য ছিল? কারণ, আমার বদলে অন্য কেউ সেখানে যেতেই পারত। তবে যেত না শুধু খুনি–সে ফাঁদ পেতেছে আমাদের জন্যে। আমাদের সবাইকে খতম করে সে কি একা বেঁচে থাকতে চায়?
আনমনা ভাবতে ভাবতে হাত চলে গিয়েছিল মাথায়। চোট পাওয়া জায়গাটায় এখনও বেশ ব্যথা আছে।
ঠিক তখনই কে যেন আমার ঘরে ঢুকল।
আমাদের ঘরে দরজা একটা আছে বটে, তবে সেটা এতই পলকা যে, থাকা-না-থাকা প্রায় সমান। সেইজন্যেই আমি বরাবর দরজা ভেজিয়ে ঘুমোই–সেটা দলের সবাই জানে। এতদিন দলের অন্য অনেকেই আমার মতো দরজা ভেজিয়ে ঘুমোত, কিন্তু পবন আর সুরেন্দ্রর ব্যাপারটার পর থেকে অদিতি আর সুজাতা দরজায় ছিটকিনি এঁটে শোয়।
কেবিনের জানলা পরদায় ঢাকা ছিল বলে ভেতরটা বেশ অন্ধকার। ফলে কাউকে দেখতে না পেলেও দরজায় সূক্ষ্ম আওয়াজে আমার ছনম্বর ইন্দ্রিয় বলে উঠল, কেবিনে কেউ ঢুকে পড়েছে।
খুনি কি এতবড় ঝুঁকি নেবে?
ক্যাম্পের ভেতরেই সে কি খুন করতে চায় আমাকে?
কিন্তু খুনি তো জানে না, হাতের নাগালের মধ্যে একটা আইস অ্যাক্স রেখে আমি ঘুমোই। স্লিপিং ব্যাগের জিপার খানিকটা খুলে ডানহাতটা বের করলাম। অতি সন্তর্পণে আমার হাত সরীসৃপের মতো হেঁটে এগিয়ে গেল আইস অ্যাক্সটার দিকে।
