কেন, স্নোমোবাইলে চড়ে ওই পেঙ্গুইন রুকারিটায় যাব। পেঙ্গুইনদের ছবি তুলব। আমার দিদির ছেলেটাকে সত্যি-পেঙ্গুইন না দিতে পারি, অন্তত পেঙ্গুইনের ফটোগ্রাফ তো দিতে পারব। আপনি আমার সঙ্গে যাবেন তো, সূর্যদা?
গত পাঁচমাসে পেঙ্গুইন রুকারিতে আমরা দুবার গেছি। কারণ, শুধু-শুধু স্নোমোবাইলের তেল পোড়ানোর কোনও মানে হয় না। কিন্তু এখন অভিযান বলতে গেলে প্রায় শেষ। ফলে এখন আর অত হিসেব করে চলার দরকার নেই। বেড়ানোর মুডে ওখানে একবার যাওয়া যেতেই পারে।
সুতরাং সুজাতাকে বললাম, হয়তো কাল-পরশুই আমরা এই ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাব। অতএব, অন্তত একবার বেড়াতে বেরোনোটা আমাদের পাওনা। তোমার কথাই রইল…তবে আজ নয়, কাল। কী, রাজি তো?
সুজাতা ছোট্ট মেয়ের মতন কঁকুনি দিয়ে ঘাড় নাড়ল। ও রাজি। ও কৃতজ্ঞতার চোখে আমার দিকে তাকাল।
সুজাতাকে বেশ স্বাভাবিক আর হাসিখুশি লাগছিল। বোধহয় অনেক চেষ্টার পর ভয়টাকে ও মন থেকে তাড়াতে পেরেছে। ওকে খুশি দেখে আমার ভালো লাগছিল।
ওকে বললাম, তুমি ড্রিল-হাউসে যাও…আমি আর অদিতি একটু পরে যাচ্ছি।
ও চলে যেতেই অদিতিকে নিয়ে আমার ঘরে এলাম।
ঘরের এককোণে অনেক স্যাল্প ব্যাগ আর কনটেনার রাখা ছিল। তা থেকে একটা স্যা ব্যাগ তুলে নিলাম। ব্যাগটা আলোয় দিকে তুলে ধরে দেখলাম। রক্তের দানাগুলো চিকচিক করছে।
ব্যাগ থেকে দুটো দানা বের করে আর-একটা স্যাল ব্যাগে ভরলাম। সেটা অদিতিকে দিয়ে বললাম, তোমার টেস্ট করা হয়ে গেলে তুমি ওরিজিনাল স্যাম্পলের কয়েকটা স্লাইড আমাকে দেবে। এখানকার রিপোর্টের সঙ্গে ওগুলো আমাকে হেডকোয়ার্টারে জমা দিতে হবে।
অদিতি ঘাড় নেড়ে বলল, আজ বিকেলের মধ্যেই রিপোর্ট পেয়ে যাবেন।
এবার চলো, ড্রিল-হাউসে যাই।
ও স্যাম্পল ব্যাগটা ল্যাবে রেখে চট করে ফিরে এল, বলল, চলুন…।
ক্যাম্পের বাইরে বেরোনোমাত্রই আমরা একটা ধাক্কা খেলাম : ড্রিলের শব্দ আর শোনা যাচ্ছে না। শুধু চাপা গরগর আওয়াজে জেনারেটর চলছে।
আমি আর অদিতি ড্রিল-হাউসের দিকে এগোচ্ছি, ঠিক তখনই চন্দ্ৰেশ্বর আর সুজাতা ছুটে বেরিয়ে এল ড্রিল-হাউসের বাইরে। দু-হাত শূন্যে তুলে চন্দ্ৰেশ্বর চেঁচিয়ে বলল, বস, উই হ্যাভ মেড ইট। হিপ হিপ হুররে!
আমি আর অদিতি প্রায় ছুটে গেলাম ওদের দিকে।
সুজাতা চিৎকার করে বলল, সূর্যদা, শেষপর্যন্ত আমরা জিতেছি। উই হ্যাভ ক্রিয়েটেড হিস্ট্রি। তারপর ছুটে এসে আমাকে বুকে জাপটে ধরল, আনন্দে কী একটা বলতে গেল, কিন্তু আবেগে কেঁদে ফেলল।
বুঝলাম, ড্রিল কেন থেমে গেছে। ক্যাম্পের ভেতরে আমি আনমনা হয়ে কথা বলছিলাম বলে বুঝতে পারিনি ড্রিলের শব্দ কখন থেমে গেছে।
আমি সুজাতার পিঠ চাপড়ে শাবাশ! বললাম। তারপর ওকে ধরে নিয়ে গেলাম ড্রিল হাউসে।
সেখানে রোহিত তখন একমনে কাজ করছে। আমাদের দেখেই ও বলল, পৃথিবীতে আমরাই প্রথম লেক এক্স-এর জল টাচ করলাম। আমরা ইতিহাসের পাতায় ঢুকে গেলাম।
অদিতি শুধু চাপা গলায় বলল, ইটস আনবিলিভে! ফ্যানট্যাটিক!
সুজাতা আমাকে ইশারায় কাছে ডাকল। ড্রিল করে তোলা স্যাগুলো উত্তেজিতভাবে আমাকে দেখাল।
স্যাম্পল কনটেনারগুলো পরপর সাজিয়ে রাখা। তাতে বরফের পাশাপাশি রয়েছে হলদে কাদা-কাদা একটা পদার্থ বরফ, জল আর লুব্রিক্যান্টে মাখামাখি। আর তার পাশেই দুটো কনটেনারে রয়েছে বাদামি রঙের ঘোলাটে জল–লেক এক্স-এর জল।
আমি আনন্দে চিৎকার করে উঠে কনটেনারগুলোর ওপরে ঝুঁকে পড়লাম। তারপর চোখ কপালে তুলে সুজাতাকে প্রশ্ন করলাম, রেপটাইল আর আইসওয়মগুলো কোথায় গেল?
আমার ঠাট্টাটা বুঝতে সুজাতার কয়েক সেকেন্ড দেরি হল। তারপর মুচকি হেসে মুখ নামিয়ে বলল, সরি, সূর্যদা!
আমি উঠে দাঁড়িয়ে ওর হাত চেপে ধরলাম : সুজাতা, এখন সরি-টরির সময় নয়। এখন শুধু আনন্দের সময়। এসো, হাতের কাজগুলো আগে সেরে নিই, তারপর সেলিব্রেট করা যাবে।
আমরা সবাই মিলে কাজে মেতে গেলাম। লেক এক্স-এর জলের স্যাগুলো সিল্ড কনটেনারে করে নিয়ে যেতে হবে হেডকোয়ার্টারে। যাবতীয় অ্যানালিসিস সেখানেই হবে–এইরকমই নির্দেশ আছে আমাদের ওপরে।
গানের সুর ভাজতে-ভজতে যখন আমরা কাজ করছি তখনও বুঝতে পারিনি পরদিনই আমাদের বেহালার সুর বাজাতে হবে।
.
০৪.
দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর একটু গা এলিয়ে দিলাম। যে কাজের দায়িত্ব নিয়ে এখানে এসেছিলাম। সেটা মোটামুটি শেষ হওয়াতে বেশ নিশ্চিন্ত লাগছিল। এখন বেশ হালকা মনে বুদ্ধিটাকে খেলানো যায়। তাই স্লিপিং ব্যাগে শুয়ে পবন শর্মা আর সুরেন্দ্র নায়েকের উধাও হওয়ার কথা ভাবছিলাম। আর ভাবছিলাম স্টোর রুমের সেই দুর্ঘটনার কথা।
এইসব ব্যাপার নিয়ে রিপোর্টে ঠিক কী লিখব সেটাই ভেবে পাচ্ছিলাম না।
সকালে ড্রিল-হাউসে গোছগাছের কাজে অনেক বেলা হয়ে গিয়েছিল। তাই লাঞ্চের জন্যে আমরা ক্যাম্পে চলে এসেছি। খাওয়াদাওয়ার পর আমি বিশ্রাম নিলেও বাকিরা বিশ্রাম নেয়নি।
চন্দ্ৰেশ্বর আর রোহিত আবার ড্রিল-হাউসে গেছে বাকি কাজ গুছিয়ে শেষ করার জন্যে। আমি যখন বলেছি, এত টায়ার্ড হয়ে পড়েছ…একটু রেস্ট নিলে পারতে। তাতে কিছু এনার্জি তৈরি হত। তার উত্তরে রোহিত মুচকি হেসে বলেছে, দাদা, এনার্জি আমাদের সঙ্গেই আছে। বলে ওর জ্যাকেটের পকেট থেকে চ্যাপটা বোতলটা বের করে আমাকে দেখিয়েছে। তারপর ওরা দুজনে হাসাহাসি করতে করতে ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে গেছে।
