আমি খাবারের স্টোরের কাছে গেলাম। চিকেন স্যুপের কৌটোগুলো খুঁজতে লাগলাম।
হঠাৎই দেখি, নীচের দিকে অনেকগুলো বাক্স একটু অগোছালো এবং বিপজ্জনকভাবে বাইরে বেরিয়ে আছে। গতকালও এরকম অগোছালো ব্যাপারটা ছিল না। তা ছাড়া খাবারের বাক্সগুলো একটু যেন অন্যরকমভাবে সাজানো।
মনে হল, ওগুলো ঠিক করে না সাজালে পড়ে গিয়ে ছত্রখান হয়ে যেতে পারে।
দলের প্রত্যেকেই জানে, আমি একটু খুঁতখুঁতে মানুষ সবকিছু সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখতে ভালোবাসি। তাই ওরা সকলেই গুছিয়ে কাজ করাটা অভ্যেস করে নিয়েছে।
তা হলে এই ব্যাপারটা কেমন করে হল!
স্বভাব যায় না মলে!
তাই বাক্সগুলোর কাছে গিয়ে ঝুঁকে পড়ে ওগুলো টেনেটুনে ঠিকঠাক করে সাজাতে চাইলাম।
আর ঠিক তখনই দুর্ঘটনাটা ঘটে গেল।
একগাদা টিন, ক্রেট আর প্যাকিং বক্স হুড়মুড় করে পড়তে লাগল আমার ঘাড়ে।
ভাগ্যিস নীচের বাক্সগুলোর টাল খেয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা আমি একপলক আগে টের পেয়েছিলাম। তাই সঙ্গে-সঙ্গে আঁপিয়ে পড়েছি পাঁচ হাত দুরে কাঠের মেঝেতে। কিন্তু তা সত্ত্বেও পুরোপুরি আঘাত এড়াতে পারলাম না। একটা ভারী ক্রেট ডান কাঁধের ওপরে এসে পড়ল। বেশ কয়েকটা টিনের বাক্স খসে পড়ল মাথায়। মাথার ওপরে একটা জায়গা ব্যথায় টনটন করতে লাগল, সেইসঙ্গে জ্বালাও টের পেলাম। বোধহয় মাথা ফেটে গেছে।
শব্দ শুনে অদিতি ছুটে এল রান্নাঘর থেকে। ওর পেছন-পেছন এল চন্দ্রেশ্বর, রোহিত আর সুজাতা।
কী হয়েছে, সূর্যদা! সুজাতা ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল।
রোহিত কী হল, দাদা? বলে ছুটে এল আমার কাছে। আমাকে হাত ধরে তুলল।
ততক্ষণে অদিতি আমার কাছে এসে বেশ দুশ্চিন্তার গলায় জানতে চাইল, কোথাও লাগেনি তো? দেখি…।
আমি মাথায় হাত দিয়ে যন্ত্রণায় উঃ করে উঠলাম।
চন্দ্ৰেশ্বর আমার মাথার চুল সরিয়ে কাটা জায়গাটা দেখতে চাইল : লেট মি হ্যাভ আ লুক, বস।
ওর পাশে উদ্বিগ্ন মুখে সুজাতা : দেখি, সূর্যদা, কোথায় লেগেছে? ও আমার মাথার চুল সরিয়ে ক্ষতচিহ্নটা খুঁজতে লাগল।
শেষপর্যন্ত সুজাতা আর চন্দ্ৰেশ্বর মিলে আমার প্রাথমিক চিকিৎসা করল। আমি হতভম্ব ভাবটা কাটাতে একটা চেয়ারে গা এলিয়ে বসলাম। তারপর ঠান্ডা মাথায় বুঝতে চেষ্টা করলাম ব্যাপারটা ঠিক কী হল।
অদিতি বলল, আপনার একটা বিরাট ফাড়াকেটে গেছে! আর-একটু হলেই বিচ্ছিরিরকম একটা অ্যাক্সিডেন্ট হত।
অ্যাক্সিডেন্ট? আমি অদিতির চোখে তাকালাম। আচ্ছা, মেয়েটা কি এতই বোকা! এখনও বুঝতে পারেনি?
এটা অ্যাক্সিডেন্ট নয়–আমাদের কাউকে খুন করার চেষ্টা। সেইজন্যেই খুনি ওরকম ফাঁদ পেতেছিল। নীচের দিকে খাবারদাবারের খালি টিন আর বাক্সগুলো রেখে তার ওপরে ভরতি ভারী বাক্সগুলো চাপিয়ে দিয়েছিল। এইভাবে একটা মরণফাঁদ পেতেছিল সে।
কিন্তু আমাদের নজর এড়িয়ে এতগুলো বাক্স কি খুনির পক্ষে নাড়াচাড়া করা সম্ভব? তাই যদি হয় তা হলে খুনির গায়ে অনেক জোর থাকা দরকার, আর হাতে অনেক সময়।
মনের সন্দেহের কথা অদিতিকে বলতেই ও বলল, হতে পারে, সূর্যদা। কাল রাতে এই আড়াইটে-তিনটেনাগাদ আমি স্টোর রুম থেকে শব্দ পেয়েছিলাম। ভাবলাম, বোধহয় আমাদেরই কেউ স্টোর রুমে স্লিপিং ব্যাগের খোঁজে গেছে–তাই আর উঠে দেখিনি।
অদিতির কথায় রোহিত বলল যে, হ্যাঁ, ও-ও ওইরকম শব্দ শুনেছে, তবে তখন ও ঘড়ি দেখেনি বলে সময়টা ঠিক বলতে পারবে না।
কিন্তু ওরা আমাকে এসব কথা আগে বলেনি কেন কে জানে!
আমার আঘাত সেরকম গুরুতর কিছু নয়, কিন্তু খুনির সাহস আর স্পর্ধা দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেছি।
চন্দ্ৰেশ্বর আর রোহিত ক্রেট, টিন, আর বাক্সগুলোকে টেনে-টেনে আবার সাজিয়ে রাখতে লাগল। অদিতি আর সুজাতা রান্নাঘরের দিকে গেল চিকেন সুপ তৈরি করতে।
একটু পরে গরম-গরম চিকেন সুপ খেয়ে শরীরটা বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠল। স্টোর রুমের কাজ সেরে এসে রোহিত আমাকে বলল, দাদা, ড্রিল ডিউটিতে আমি যাচ্ছি।
আমি বললাম, এখন আমরা সবাই ড্রিল-হাউসে যাব। কারণ, আমার ধারণা, আজ দু একঘণ্টার মধ্যেই আমরা বরফ কেটে লেক এক্স-এর জলে পৌঁছে যাব।
রোহিত বলল, আমি আর চন্দ্ৰেশ্বর গিয়ে মেশিনটা স্টার্ট করি আপনারা পরে আসুন।
অগত্যা রাজি হতেই হল।
রোহিত ক্যাম্প ছেড়ে বেরিয়ে গেল। চন্দ্ৰেশ্বর খইনি টিপতে টিপতে ওর পিছু নিল।
ওরা চলে যেতেই অদিতিকে আমি কাছে ডাকলাম। সুজাতা তখন বাসন-কোসন ধোওয়ার কাজে ব্যস্ত।
অদিতিকে রক্ত পরীক্ষার কথাটা জানালাম। বললাম, ব্যাপারটা যেন বাকি তিনজন কিছুতেই না জানতে পারে।
অদিতি ভেতরে-ভেতরে অবাক হলেও মুখে সেরকম কোনও ভাব প্রকাশ করল না। শুধু ঘাড় নেড়ে বলল, আজকেই করে দিচ্ছি।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর ও আবার বলল, এখানে আর ভালো লাগছে না। এরকম সন্দেহ আর বিপদ মাথায় নিয়ে কখনও একসঙ্গে থাকা যায়!
আমি বললাম, বেশি নয়, আর একটা কি দুটো দিন..জলের স্যাল্প হাতে পাওয়ামাত্রই আমরা দক্ষিণ গঙ্গোত্রীকে খবর পাঠাব।
কী আর করা যাবে ভঙ্গিতে হাত নাড়ল অদিতি।
এমন সময় সুজাতা হাতের কাজ সেরে ঘরে এল। বলল, সূর্যদা, আমাদের এখানকার কাজ তো মোটামুটি শেষ হয়ে এসেছে, আজ বিকেলে তা হলে একটু বেড়াতে বেরোব?
আমি আর অদিতি হেসে ফেললাম।
আমি বললাম, এখানে কোথায় বেড়াতে বেরোবে?
