কেন জানি না, মনে হল, শেষ লাইনটা ও অন্যরকমভাবে বলল। আমার চোখ থেকে চোখ এতটুকুও সরাল না। আর কেউ সেটা লক্ষ করল কি না কে জানে!
টাইটানিকের গল্পটা বলার জন্যে অদিতি চন্দ্ৰেশ্বরকে তাগাদা করল।
চন্দ্ৰেশ্বর কয়েকবার জাবর কেটে বলতে শুরু করল।
ইয়ারটা ছিল নাইনটিন টুয়েলভ, ফোর্টিন্থ এপ্রিল। সেদিন রাতে নিউফাউন্ডল্যান্ডের কাছে একটা আইসবার্গের সঙ্গে টাইটানিকের কলিশন হয়। ওই অ্যাক্সিডেন্টে পরদিন ভোরবেলা টাইটানিক ডুবে যায়। তার সঙ্গে প্যাসেঞ্জার আর ক্রু মিলিয়ে মোট পনেরোশো তেরোজন মানুষও ডুবে মারা যায়। তারপর থেকে নর্থ আটলান্টিকের শিপিং লেনের আইসবার্গ ডেঞ্জার জোনগুলোতে ইন্টারন্যাশনাল আইস প্যাট্রল চালু করা হয়। প্যাট্রল ভেসেল থেকে অন্যান্য জাহাজে রেডিয়ো মেসেজ পাঠিয়ে বিপজ্জনক আইসবার্গ আর প্যাক আইসের খবর জানানো হয়। তাতে টাইটানিকের মতো ট্র্যাজিক অ্যাক্সিডেন্টের পসিবিলিটি অনেক কমে গেছে।
রোহিত বলল, দাদা, টাইটানিককে কবছর আগে স্যালভেজ করা হয়েছে না?
আমি বললাম, হ্যাঁ। ১৯৮৫ সাল থেকে স্যালভেশানের কাজ শুরু হয়েছিল। সে-বছর অ্যালভিন ব্যাথিস্ফিয়ার ব্যবহার করে টাইটানিকের বয়লারের কিছু অংশ উদ্ধার করা গিয়েছিল। এরপর ১৯৮৭-তে টাইটানিকের প্রায় দেড়শো জিনিস জল থেকে তোলা হয়েছিল। নাও, এখন বরফের গল্প ছেড়ে বডি তোলো বাইরে গিয়ে বরফ সরানোর কাজ করতে হবে। চলো, চলো।
খাওয়ার টেবিল ছেড়ে উঠতে উঠতে অদিতি বলল, আর দু-একদিনের মধ্যেই আমরা আন্টার্কটিকা ছেড়ে চলে যাব। তো স্মৃতি হিসেবে এখান থেকে বরফ ছাড়া আর কিছু নিয়ে যাওয়ার উপায় নেই তাও আবার যাওয়ার পথে গলে জল হয়ে যাবে।
সুজাতা উৎসাহী খুকির মতো বলে উঠল, আর নিয়ে যাওয়া যেত পেঙ্গুইন। আমার দিদির ছেলেটা বারবার করে বলে দিয়েছে, মাসি, একটা বাচ্চা পেঙ্গুইন তোমাকে নিয়ে আসতেই হবে– কোনও কথা শুনব না। কিন্তু… সুজাতার মুখটা মনখারাপগোছের হয়ে গেল। বেজারভাবে বলল, কিন্তু তার তো কোনও উপায় নেই! পেঙ্গুইন আন্টার্কটিকার বাইরে সহজে বাঁচে না।
কেন? রোহিত জিগ্যেস করল।
এক নম্বর কারণ হল, ওরা ভীষণ ঠান্ডা ছাড়া থাকতে পারে না। আর দু-নম্বর হল, এই বিশুদ্ধ পরিবেশে থেকে ওরা এমন হ্যাঁবিচুয়েটেড হয়ে গেছে যে, ওদের রোগজীবাণু প্রতিরোধের ক্ষমতা প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে, এই অঞ্চলের বাইরে গেলেই ওরা রোগজীবাণুর আক্রমণে মারা পড়ে। এককথায়, বাঁচিয়ে নিয়ে যাওয়া প্র্যাকটিক্যালি ইমপসি। তাই ভাবছি কী নিয়ে যাব। শেষ পর্যন্ত হয়তো ওই জলই নিয়ে যেতে হবে।
ক্যাম্প থেকে বেরোতে-বেরোতে চন্দ্ৰেশ্বর বলল, এই জল! জল! করেই আমাদের মাথা জল হয়ে যাবে।
আমি হেসে বললাম, ঠিকই বলেছ সরকারের লক্ষ-লক্ষ টাকা খরচ করে আমরা এই অভিযানে এসেছি স্রেফ একটু জলের জন্যে।
সুজাতা আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে হাসল।
বাইরে বেরিয়ে প্রথমে শুরু হল তুষারঝড়ের বরফ সরানোর কাজ। বেলচা, গাঁইতি, কোদাল–যা পারলাম কাজে লাগালাম। অতিরিক্ত পরিশ্রমে জ্যাকেটের ভেতরে জামা ঘেমে যেতে লাগল। তখন আমরা ক্যাম্পে ফিরে গিয়ে আগে জামা শুকিয়ে নিতে লাগলাম–নইলে ঘামে ভেজা জামা জমে শক্ত হয়ে যাবে।
আমার নাক দিয়ে সর্দি গড়িয়ে পড়ছিল। গ্লাভসের পিঠ দিয়ে নাক মুছতে গিয়ে টের পেলাম গোঁফের কাছটা জ্বালা করছে। কনকনে ঠান্ডায় হাতের আঙুল অসাড় হয়ে আসছিল। তখন ক্যাম্পে ঢুকে গ্লাভস খুলে হাতে হাত ঘষেছি। আঙুল বারবার মুঠো করে আর খুলে জমাট ভাবটা কাটিয়েছি।
প্রায় দু-ঘণ্টা অমানুষিক খাটুনির পর ক্যাম্প, ড্রিল-হাউস, আর অদিতির তাঁবু বরফ সরিয়ে ঠিকঠাক করা হল। তখন আমি বললাম, এখন একমগ করে গরম-গরম চিকেন সুপ না হলে চলছে না। সুপ খেয়ে তারপর ড্রিল চালু করব।
সঙ্গে-সঙ্গে অদিতি বলল, আমি কিচেনে গিয়ে গ্যাস জ্বালছি, আপনি স্টোর থেকে সুপের ক্যান নিয়ে আসুন।
ঠিক আছে, নিয়ে যাচ্ছি। বলে আমি স্টোরের দিকে পা বাড়ালাম।
আমাদের স্টোর আর রান্নাঘরের দুটো করে দরজা : একটা বাইরের দিকে, আর-একটা ক্যাম্পের ভেতর দিয়ে। রান্নাঘরের বাইরের দরজাটা বেশিরভাগ সময়েই বন্ধ থাকে–শুধু বাসনপত্র ধোওয়ার সময় খোলা হয়। তবে স্টোরের বাইরের দরজাটা আমরা ব্যবহার করি বেশি। এখানে চুরি-টুরির কোনও ভয় নেই বলে দরজাগুলো স্রেফ শেকল দিয়ে আটকানো থাকে।
বাইরের দরজার শেকল খুলে আমি স্টোরে ঢুকলাম।
বেশ বড় মাপের স্টোর রুম মালপত্রে বোঝাই। আমরা এই ক্যাম্প ছেড়ে চলে গেলে পরের অভিযাত্রী দল এখানে আসবে। এখন আন্টার্কটিকার বেশিরভাগ ক্যাম্পই একাধিক টিম ব্যবহার করে গ্রীষ্মের টিম, আর শীতের টিম। তবে যে ক্যাম্পকে বাতিল করে দেওয়া হয় সেটা ভুতুড়ে বাড়ির মতো পড়ে থাকে–তুষারঝড়ের প্রবল ঝাপটার সঙ্গে মোকাবিলা করে যে-কদিন পারে টিকে থাকে। আমাদের ক্যাম্পে শীতের দল আসবে, তারপর আবার গ্রীষ্মের দল। আপাতত সেইরকমই ঠিক আছে।
সুইচ টিপে স্টোর রুমের আলো জ্বালোম।
একদিকে দেওয়াল ঘেঁষে খাবারের ক্রেট, টিন আর প্যাকিং বক্স। প্রায় ঘরের চাল পর্যন্ত উঁচু হয়ে আছে–লোড করা ফুল পাঞ্জাব ট্রাক যেমন দেখতে হয়। আর তার ঠিক বিপরীতদিকে নানান যন্ত্রপাতি, স্পেয়ার ইঞ্জিন-জেনারেটর সেট, ট্রান্সফর্মার, ট্রান্সমিটার, শাবল, গাঁইতি, আইস অ্যাক্স, সিনথিটিক দড়ি, তাঁবু, পোশাক-আশাক, তিনটে স্নোমোবাইল গাড়ি–আরও কত কী!
