রোহিত একটু দম নেওয়ার জন্যে থামতেই সুজাতা বলল, কই, আমরা তো অত সুন্দর আইসবার্গ দেখিনি!
উত্তরে মুচকি হাসল রোহিত ও ওসব দেখার জন্যে ভাগ্য চাই, ভাগ্য! আমি এই এরিয়ার সমুদ্রে বহু ঘুরেছি কত সুন্দর সুন্দর চেহারার আইসবার্গ দেখেছি। দেখেছি আইসবার্গের ওপরটা ক্ষয়ে গর্ত হয়ে যাওয়ার পর তার ভেতরে বরফ গলে মিষ্টিজলের ছোট্ট পুকুর তৈরি হয়েছে। আর সেই পুকুরের জলে ঝাঁপ দিয়ে তেষ্টা মেটাচ্ছে অ্যালবাট্রস–যাকে সিন্ধুসারস বলে।
এইসব দেখে আমার খুব সাধ হত আইসবার্গে চড়ে সমুদ্রে ভেসে বেড়াতে। এইভাবে বেড়াতে বেড়াতে একদিন হয়তো গোটা পৃথিবীটাই চক্কর মেরে আসতাম। ভাবো তো, কী থ্রিলিং!
অদিতি কফির মগে লম্বা চুমুক দিয়ে মন্তব্য করল, তদ্দিনে তোমার আইসবার্গ গলে জল হয়ে যেত।
রোহিত কফি শেষ করে হাতে-হাত ঘষল কয়েকবার, তারপর বলল, না, ম্যাডাম, বড় বড় আইসবার্গ সহজে গলে জল হয় না। পুরোপুরি গলে জল হতে ওগুলো প্রায় দু-বছর কি তার বেশি সময় নেয়। ভাবুন তো, ঈশ্বরের কী অদ্ভুত লীলা–নোনা সমুদ্রের জলে ভেসে বেড়াচ্ছে অসংখ্য মিষ্টি জলের পাহাড়! যেসব জায়গায় খাওয়ার জলের খুব অভাব সেখানে যদি কোনওভাবে এইসব পাহাড় পৌঁছে দেওয়া যেত। যেমন ধরুন, আরবদেশগুলোর মতো শুকনো জায়গায় যদি আন্টার্কটিকা থেকে আইসবার্গ কয়েকটা টাগবোট দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় তা হলে কেমন মজা! সমুদ্রপথে এই ডিসট্যান্সটা হবে প্রায় আটহাজার কিলোমিটার মতো, আর নিয়ে যেতে সময় লাগবে বড়জোর একবছর। যদি ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় আইসবার্গগুলোর ওপরটা পাতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকে নেওয়া হয়, তা হলে বরফ গলবে অনেক কম। আর প্লাস্টিকের আড়ালে কিছুটা করে বরফ গলে তৈরি হয়ে যাবে মিঠে জলের হ্রদ। সেখান থেকে সরাসরি পাম্প করে মরুভূমির কোস্টাল এরিয়াতে দিব্যি জল পাঠানো যাবে।
তবে যা-ই বলো, এতে অনেক খরচ পড়ে যাবে। অদিতি বলল।
অদিতি ওর বিষয়ের বাইরেও অনেক খোঁজখবর রাখে। আইসবার্গ নিয়ে এত কথা আমারও জানা ছিল না। আমি শুধু জানি, পানীয়জলের অভাব মেটাতে আরবের দেশগুলোতে বিশবছর আগে একটা ডিস্যালিনেশন প্রজেক্ট নেওয়া হয়েছিল। এই প্রজেক্টের উদ্দেশ্য ছিল, প্রথমে সমুদ্রের নোনাজল থেকে নুন বের করা। তারপর নুনবিহীন জলকে সমুদ্রতীরের কাছাকাছি থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্টের কুলিং ওয়াটার হিসেবে ব্যবহার করা। এর পরের ধাপের কাজ ছিল সেই কুলিং ওয়াটার কে প্রসেস করে ড্রিঙ্কিং ওয়াটার তৈরি করা। তবে শেষ পর্যন্ত সেই প্রজেক্ট খুব একটা লাভজনক হয়ে দাঁড়ায়নি।
রোহিত মাথা নেড়ে অদিতির কথায় সায় দিল হ্যাঁ, খরচ পড়বে বটে, তবে ইটস আ নভেল পসিবিলিটি। তারপর একটু সময় নিয়ে বলল, আরও একটা নভেল পসিবিলিটির কথা সায়েন্টিস্টরা ভেবেছে–আন্টার্কটিকাকে ন্যাচারাল কোল্ড স্টোরেজ হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না…।
ব্যাপারটা নিয়ে বিদেশি পত্রপত্রিকায় কয়েকটা লেখা আমার চোখে পড়েছে।
বিজ্ঞানীরা বলছে, পৃথিবীর বাড়তি খাদ্য-শস্য যদি জাহাজে করে আন্টার্কটিকায় নিয়ে এসে সঞ্চয় করে রাখা যায়, তা হলে এর বিশুদ্ধ হিমশীতল পরিবেশে সেগুলো একটুও নষ্ট হবে না। তারপর, দরকার মতো, সেইসব খাদ্য-শস্য এখান থেকে নিয়ে গিয়ে খরচ করা যেতে পারে। এতে সারা পৃথিবীতে দুর্ভিক্ষের সমস্যা আর থাকবে না।
তবে এই কাজের পথে এখনও পর্যন্ত একটাই বাধা–খরচ।
চন্দ্ৰেশ্বর চুপচাপ বসে রোহিতের কথা শুনছিল। ও কফি শেষ করে মুখে মশলাপাতি কিছু একটা পুরে দিয়ে জাবর কাটছিল। হঠাৎই জড়ানো গলায় বলল, সুনিয়ে কোশ্চেন জোড়ি, আইসবার্গ নিয়ে আমিও কুছু কুছু জানি।
ওর কথা বলার ধরনে অদিতি আর সুজাতা তো হেসে কুটিপাটি।
সুজাতা হেসে জিগ্যেস করল, তা কী সেই কুছু কুছু জানতে পারি?
আলবাত! তখন থেকে দেখছি তোমরা রোহিতের দিকে ধেয়ান দিয়ে বসে আছ…।
রোহিত বলল, চন্দ্রেশ্বর, তোমাকে ভাই আমি একটুও ঈর্ষা করি না।
ঈর্ষা? চন্দ্ৰেশ্বর অবাক হয়ে রোহিতের দিকে তাকাল : ঈর্ষা মানে কী?
আমি কপাল চাপড়ে বললাম, ওঃ, আবার সেই ল্যাঙ্গুয়েজ প্রবলেম।
অদিতি চন্দ্ৰেশ্বরকে বলল, ওসব ছাড়ো–তোমার আইসবার্গের গল্প শোনাও।
চন্দ্ৰেশ্বর হাসল। উৎসাহ পেয়ে জাবর কাটা থামিয়ে ওর কুছু কুছু শুরু করল।
টাইটানিকের নাম সবাই শুনেছ তো! লাক্সারি লাইনার টাইটানিক…।
সুজাতা ফস করে বলে উঠল : ও গল্প সবার জানা।
চন্দ্রেশ্বরের উৎসাহ দপ করে নিভে গেল। মুখে ফুটে উঠল বেজার ভাব। দুজন তরুণীর মনোযোগ পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হয়-হয় দেখে মরিয়া হয়ে পালটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল সুজাতার দিকে : বলো তো কী জানো?
সুজাতা হার-না-মানা ভঙ্গিতে বলল, আইসবার্গে ধাক্কা লেগে টাইটানিক জাহাজটা ডুবে গিয়েছিল। ইংল্যান্ড থেকে জাহাজটা আমেরিকা যাচ্ছিল। ওটাই ছিল ফাস্ট ভয়েজ।
চন্দ্ৰেশ্বর অবজ্ঞার হাসি হেসে বলল, ব্যস? স্টোরি খতম? বলো তো, অ্যাক্সিডেন্টটা কবে হয়েছিল, কজন মারা গিয়েছিল?
আমি সুজাতাকে বললাম, তুমি বড় ডিসটার্ব করো, সুজাতা। চন্দ্ৰেশ্বরের মুড এসে গেছে, ওকে বলতে দাও।
সুজাতা এক অদ্ভুত চোখে আমার দিকে তাকাল। ধীরে-ধীরে বলল, আপনি বলছেন, তাই চুপ করে যাচ্ছি। আপনি আমার বস।
