আমি ফটো দুটো নিলাম, টাকার বান্ডিলটাও। পকেটে রাখলাম।
আপনার যদি গাড়ির দরকার হয় বলুন, নজর সব ব্যবস্থা করে দেবে–
আমি বললাম, দরকার নেই। আমার একটা ছোট প্রিমিয়ার পদ্মিনী আছে। আপনাদের মতো ক্লায়েন্টদের সহযোগিতায় কেনা। ওটা দিয়েই কাজ চলে যাবে। একটু থেমে আবার বললাম, সত্যিই কি হীরাকে আপনার কালকের মধ্যেই চাই?
কেন, পারবেন না? ভুরু কুঁচকে গেল শরদিন্দুর।
হয়তো পারব, তবুও একটা দিন বেশি চাইছি।
বেশ। এখন সবই আপনার হাতে–। একটু থেমে আরও বললেন, নজর আপনাকে দুটো আনলিস্টেড ফোন নাম্বার দিয়ে দেবে। কোনও জরুরি খবর থাকলে ওই নাম্বারে ফোন করতে পারেন।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। ঘরের দরজার দিকে পা বাড়ালাম।
শরদিন্দু পিছন থেকে ডাকলেন, মিস্টার শিকদার–।
আমি থমকে দাঁড়ালাম। ঘুরে তাকালাম।
শরদিন্দু বললেন, মেটাল মার্চেন্ট হিসেবে আর কোনও সাহায্য করতে পারি?
যথারীতি মেটাল শব্দটার ওপরে জোর দিয়েছেন শরদিন্দু।
আমি হাসলাম। পুরোনো কথাটাই বললাম, ধন্যবাদ, তার দরকার হবে না। আমি রোজ একডজন আর্মস দিয়ে ব্রেকফাস্ট খাই।
বেরিয়ে এলাম ঘর ছেড়ে। সঙ্গে নজর মহম্মদ। এবং দরজার কাছে আবার সেই খুদে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁত খুঁটছে। দাঁত ছাড়া বোধহয় খোঁটার মতো আর কিছু ওর নেই।
রাস্তায় বেরিয়ে যখন গাড়িতে উঠছি তখন আনলিস্টেড কোনও নাম্বার দুটো নজর মহম্মদ আমাকে দিল। ডান হাত আদাবের ভঙ্গিতে দুবার নেড়ে বলল, ফির মিলেঙ্গে, শুকরিয়া।
আমিও ওকে পালটা অভিবাদন জানিয়ে গাড়িতে স্টার্ট দিলাম। চারপাশে যানবাহনের কোলাহলে বোঝা যায় বেলা বেড়েছে। রাস্তায় লোকজনও প্রচুর। যে যার কাজে ব্যস্ত।
গাড়ি চালিয়ে কিছুটা এগোতেই হীরার মুখটা মনে পড়ল। অপরূপ ওই মেয়েটা এখন কী করছে, কেমন অবস্থায় আছে? আর তখনই লক্ষ করলাম, একটা সাদা মারুতি আমার গাড়ির প্রায় ছায়া হয়ে গেছে।
আমার হাসি পেল। এরকম টিকটিকির লেজ হেঁটে ফেলতে আমার বেশ মজা লাগে।
.
ডায়মন্ডহারবার রোডে মিনিট পঁয়তাল্লিশ গাড়ি চালানোর পর তাকালাম রিয়ারভিউ মিরারের দিকে। টিকটিকির লেজ ছেটে ফেলতে রিয়ারভিউ মিরারের উপকারিতার কোনও জবাব নেই।
বর্ষা চলছে। তাই রাস্তার দুপাশে প্রকৃতি সবুজ জামা-প্যান্ট পরে সেজেগুজে দাঁড়িয়ে। মাঝে মাঝে টুকরো দু-একটা দোকানপাট অথবা ছন্নছাড়া কঁচা-পাকা বাড়ি।
চায়ের তেষ্টা পাচ্ছিল। তাই রাস্তার ধারের একটা চায়ের দোকানের কাছে গাড়ি দাঁড় করালাম। গাড়ি থেকে নেমে বেঞ্চিতে বসে এক কাপ চায়ের কথা বললাম।
কানটা মাপে বড়সড় হলেও নিতান্ত ঝোঁপড়ি। মালিকের বয়েস দেখে মনে হয় ছশো নিরেনব্বই বছর। চলাফেরার সময় যে কোনও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঠকাঠক শব্দ করে যখন-তখন খসে পড়তে পারে। তারই হুকুমে এক ছোকরা এক গ্লাস চা দিয়ে গেল আমাকে।
চায়ে প্রথম চুমুক দিতেই পায়ের কাছে একটা ছায়া দেখতে পেলাম। কে যেন আমার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। কালো প্যান্ট পরা একজোড়া পা। পায়ে স্নিকার।
আকাশ মেঘলা। একটু আগে পথে ঝিরঝিরে বৃষ্টি পেয়েছিলাম, যদিও এখন নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও আবছা ছায়াটা আলাদা করে চিনতে পারলাম আমি। চায়ের গ্লাস থেকে মুখ না তুলে, ছায়ার মালিকের দিকে না তাকিয়ে আমি আন্দাজ করতে চেষ্টা করলাম, কে এসে আমার সামনে দাঁড়িয়েছে।
চায়ের দোকানে দ্বিতীয় খদ্দের বলে কেউ নেই। তবে সামনের পাকা রাস্তায় কদাচিৎ লোকজন চলাফেরা করছে, কয়েকটা গাড়িও ছুটে যাচ্ছে মাঝে মধ্যে।
প্রায় দশ সেকেন্ড কেটে গেল চুপচাপ। তারপর একটা ভরাট গলা বলে উঠল, মিস্টার শিকদার, কোথায় যাচ্ছেন? হোটেল রিভারভিউ?
আমার দেখা ছায়ার কণ্ঠস্বর। এ-গলা আমি আগে কখনও শুনিনি।
গ্লাসের চা মোটামুটি গরম। সুতরাং প্রথম ধাপ হিসেবে সেটা এই কালো প্যান্টের মুখে ছুঁড়ে দেওয়া যায়। তারপর শরীরের দুর্বলতম জায়গা লক্ষ্য করে কষিয়ে বুটের এক লাথি। ব্যস, ততক্ষণে মক্কেল ভার্টিকাল অবস্থা থেকে হরাইজন্টাল অবস্থায় পৌঁছে যাবে। সুতরাং তারপর ওর শরীরের ওপরে ফ্রি স্টাইল চালানো যেতে পারে।
মানুষ যা ভাবে সবসময় তা করে না। আমিও করলাম না। একবার মনে হল, এটা সেই সাদা মারুতির কেউ নয়তো! তা ছাড়া লোকটা আমার নাম জানল কেমন করে? শরদিন্দু মিত্র কি একে পাঠিয়েছে আমার ওপরে নজর রাখার জন্যে?
অবশেষে মুখ তুলে তাকালাম।
বছর তিরিশের এক যুবক। কিন্তু মাথায় চুল বিরল। চোখ ছোট। তামাটে গালে ছোট মাপের একটা পুরোনো ক্ষতের দাগ। পরনে চেকশার্ট। তাতে লাল আর সবুজ ডোরা।
যুবক হাসছিল। আমি কিছু বলার আগেই বসে পড়ল আমার পাশে। বলল, মিস্টার শিকদার, হীরার খোঁজে আপনি না গেলেই ভালো হয়।
ছেলেটি বোধহয় আমার স্থানীয় অভিভাবক। আমার ভালোমন্দ নিয়ে ভাবছে। চমৎকার!
আমি চায়ের গ্লাস নামিয়ে রাখলাম ভিজে মাটিতে। মুখের ভাব যথাসম্ভব মোলায়েম রেখে জিগ্যেস করলাম, আপনি কে? মিত্তিরের চামচে?
যুবকের মুখ শক্ত হল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আপনিও তো এখন তাই।
আমি নড়েচড়ে বসলাম। এরকম মোকাবিলায় মজা আছে। অমিতাভ শিকদার মোকাবিলায় মজা পায়।
যা বলার চটপট বলে ফেলুন। আমাকে এক্ষুনি রওনা দিতে হবে।
