শোনো, সুজাতা, লেক এক্স-এর সঙ্গে পবন আর সুরেন্দ্রর ডিস্যাপিয়ারেন্সের কোনও সম্পর্ক নেই। তুমি যে বলছ দুটো ব্যাপার কানেক্টেড…তার কোনও প্রমাণ তুমি পেয়েছ?
সুজাতা চুপ করে রইল। তবে মুখের ভাবে বোঝা গেল আমার কথা ও মানতে রাজি নয়।
শোনো… আমি বলে চললাম, ওদের উধাও হওয়ার নিশ্চয়ই কোনও যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা আছে। মানে…।
সত্যিকারের আছে কি? বলল চন্দ্রেশ্বর, দু-দুটো মানুষ পরপর দু-দিন হুউস করে উধাও হয়ে গেল। তাদের আর কোনও চিহ্ন পাওয়া গেল না। এর পেছনে কোথায় যুক্তি কোথায় কারণ! বস, ডোন্ট মাইন্ড, খুব অবাস্তব শোনালেও বেস ক্যাম্পকে লেক এক্স ফ্যাক্টরটার কথা বলা দরকার।
সুজাতা ধীরে-ধীরে বলল, এরপর…বেশি দেরি হয়ে গেলে..খবরটা দেওয়ার জন্যে আমরা কেউই হয়তো আর থাকব না।
আমি চোয়াল শক্ত করলাম। রোহিত, চন্দ্রেশ্বর, আর সুজাতা–ওরা চায় যতই উদ্ভট হোক, বেস ক্যাম্প লেক এক্স-এর ভয়ের ব্যাপারটা জানুক। বাকি রইলাম আমি আর অদিতি। অদিতির কী মত কে জানে! আমাদের প্রজেক্ট প্রায় শেষ হয়তো কালই বরফ কেটে জলের সন্ধান পাবে ড্রিল। এরকম একটা সময়ে এইরকম বিতর্ক আমার ভালো লাগছিল না।
শেষ পর্যন্ত ভি এইচ এফ ট্রান্সমিটারে খবর পাঠাতে বসলাম।
বেস স্টেশনের রেডিয়ো অপারেটর ঘুম-জড়ানো গলায় আমাদের ডাকে সাড়া দিল। আমি জানালাম যে, আমাদের টিমের আর-একজন, সুরেন্দ্র নায়েককে পাওয়া যাচ্ছে না।
খবরটা পেয়েই অপারেটরের ঘুম কেটে গেল।
আমি সংক্ষেপে ঘটনাটা জানালাম। বললাম যে, আমাদের এখানে ক্লিজার্ড চলছে।
উত্তরে সে বলল, ওখানেও তুষারঝড় এখনও থামেনি।
আমার পাশে ছিল রোহিত। আর রোহিতের পাশে সুজাতা। আমি মনে-মনে ঠিক করেছিলাম, লেক এক্স-এর উদ্ভট থিয়োরির কথা বেস স্টেশনকে জানাব না। ওরা হয়তো ভাববে আমরা পাগল হয়ে গেছি। কিন্তু সেটা আর হল না।
কারণ, হঠাৎই সুজাতা রোহিতকে ডিঙিয়ে ট্রান্সমিটারের ওপরে একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারপর উত্তেজিতভাবে বলল ওই অবাস্তব থিয়োরির কথা। বলতে-বলতে আবেগে ভয়ে ও কাঁদতে শুরু করল। এবং কথা শেষ করেই বলে দিল, ওভার অ্যান্ড আউট। ফলে রেডিয়ো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
আমরা পাঁচজন চুপচাপ বসে রইলাম। বেস স্টেশন এখন কী ভাববে কে জানে! আবার রেডিয়ো যোগাযোগ করে সুজাতার কথা যে পাগলের প্রলাপ সেটা বলাটা ঠিক হবে না। ওরা ভাববে দলের ওপরে আমি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছি।
সুজাতা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। আমি ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম। ওর ওপরে রাগ করে কোনও লাভ নেই। ওর মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি।
রাতে আমরা যখন খেতে বসলাম তখন তুষারঝড় প্রায় থেমে গেছে।
.
সারারাত ভালো ঘুম হল না।
স্লিপিং ব্যাগে এপাশ-ওপাশ করে আর নানান দুঃস্বপ্ন দেখে রাত কাটল। ভোরবেলায় শেষ যে-স্বপ্নটা দেখে ঘুম ভাঙল সেটা বেশ বিচিত্র।
একটা লেপার্ড সিল একটা অ্যাডেলি পেঙ্গুইনকে একেবারে রক্তাক্ত ক্ষত-বিক্ষত করে দিয়েছে। কোনওরকমে প্রাণে বেঁচে নিরীহ প্রাণীটা বুকে ভর দিয়ে ডানা দিয়ে সাঁতার কাটার ভঙ্গিতে বরফের ওপর দিয়ে পিছলে পালাচ্ছে। আর বরফের ওপরে রেখে যাচ্ছে রক্তের দাগ। স্তিমিত সূর্যের আলো বরফের মসৃণ তল থেকে ঠিকরে পড়ছে। সেই আলোয় রক্তের দাগটাকে অদ্ভুত উজ্জ্বল দেখাচ্ছে।
তখনই আইডিয়াটা আমার মাথায় এল। ঘুমও ভেঙে গেল একইসঙ্গে।
ঠিক করলাম, বিষয়টা নিয়ে অদিতির সঙ্গে গোপনে কথা বলব। উকিলসাহেবের বুক থেকে যে-রক্তের দানাগুলো আমি তুলে নিয়েছিলাম সেগুলো এখনও আমার কাছে যত্ন করে রাখা আছে। এখনও আমার ধারণা ওগুলো পবনের রক্ত। ধারণা কেন, প্রায় সুনিশ্চিত বিশ্বাস, কারণ, উকিলসাহেবকে দেখে আমার আহত বলে মনে হয়নি।
অদিতি যদি ওই রক্ত পরীক্ষা করে আমাকে বলে যে, ওটা মানুষের রক্ত–পেঙ্গুইনের নয়, তা হলে আমি ধরে নেব পবন খুন হয়েছে, সুরেন্দ্রও। এরপর কার পালা কে জানে!
গ্যাসের উনুন জ্বেলে রোজই আমাদের জল তৈরি করে নিতে হয়। খাওয়ার জল, মুখ ধোওয়ার জল, বাসনমাজার জল–সবই পাওয়া যায় বরফ গলিয়ে। যেহেতু গ্যাস খরচ কম হওয়াটাই ভালো, সেহেতু জলের বরাদ্দ মাথাপিছু মাপা–এক কাপ কি বড়জোর দুকাপ। আর স্নানের তো কোনও প্রশ্নই নেই!
ঘুম থেকে উঠে বরাদ্দ জলে হাত-মুখ ধুয়ে চলে গেলাম ব্রেকফাস্ট টেবিলে। বাকি চারজন তখন বড় প্লাস্টিকের কাপে করে কফি খাচ্ছে।
ওদের দেখামাত্রই প্রথম যে কাজটা আমার মন করে বসল সেটা হল আদমসুমারি। কাল রাতে আমরা পাঁচজন ছিলাম, আজ সকালেও পাঁচজন আছি তো!
স্যান্ডউইচ, আলুভাজা, কাজুবাদাম আর কফি দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে নেওয়ার সময় মনেই হল না বাড়ি থেকে বহু দূরে বরফের মহাদেশে বসে আছি।
রোহিত তখন সুজাতাকে আইসবার্গের গল্প বলছিল।
বিজ্ঞানী হিসেবে সুজাতার বহু তথ্য জানা থাকলেও মন দিয়ে শুনছিল রোহিতের কথা। এতে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিটা অন্তত খানিকক্ষণ ভুলে থাকা যাবে।
আইসবার্গের মাপের কথা বলতে গিয়ে রোহিত বলল, এক-একটা আইসবার্গ লম্বায় কয়েক হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। আর এর হাইট গড়ে কয়েক কিলোমিটার। প্রথম যখন বরফের স্তরটা নিজের ভারে আইস শেলফ থেকে ভেঙে বেরিয়ে আসে তখন এই ভাঙা টুকরোগুলোর চেহারা থাকে একেবারে টেবিলের মতো ফ্ল্যাট। ওরকম আইসবার্গ তো এখানে আসার সময় দেখেছ! তারপর মাসের পর মাস, বছরের পর বছর সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে আইসবার্গগুলো ক্ষয়ে যায়, ওদের চেহারা পালটায়। ভেসে যাওয়ার পথে এলোমেলো জলের ঝাপটায় ওদের গায়ে বিচিত্র সব শেপের গুহা তৈরি হয়। কখনও তৈরি হয় বরফের ছুঁচলো পিক, কখনও বা আর্চ–দেখে মনে হতে পারে ঠিক যেন কাচের তৈরি রাজপ্রাসাদ।
