সময়টা এমন হইহই করে কাটছিল যে, আমরা একরকম ভুলেই গেলাম, কী কাজে আমরা এসেছি, আর কী রহস্যময় বিপদে আমরা জড়িয়ে পড়েছি।
হাসি, ঠাট্টা, আর মজায় সুজাতা অনেক স্বাভাবিক হয়ে উঠল। অদিতিও মনে হল পবনের করুণ পরিণতির ধাক্কাটা দিব্যি সামলে নিয়েছে।
রাত আটটা নাগাদ তুষারঝড় উঠল।
বিকেল থেকেই ঝোড়ো হাওয়া দিচ্ছিল। এই ঝোড়ো হাওয়াটা ব্লিজার্ডের সুনিশ্চিত খবর নিয়ে আসে। সুতরাং আমরা তৈরি ছিলাম।
বিকেলে ড্রিল-হাউসে আমি কাজ করেছি। তবে আমি সতর্ক ছিলাম। হঠাৎ করে কেউ যদি আমাকে আক্রমণ করতে আসে তা হলে তাকে আমি অনায়াসেই চমকে দিতে পারব। একটা স্টেরিলাইজড স্টেইনলেস স্টিলের কনটেনার আমার জ্যাকেটের ভেতরে লুকোনো আছে। তাতে রয়েছে গাঢ় নাইট্রিক অ্যাসিড। খুনি হোক কি বরফের পোকা হোক, কিংবা লেক এক্স-এর ভয়ঙ্কর সরীসৃপও যদি হয়, তাকে প্রাথমিকভাবে শায়েস্তা করতে পারবে এই অ্যাসিড। তারপর, প্রতিরক্ষার দ্বিতীয় ধাপে, রয়েছে একটা বড় মাপের ক্রু ড্রাইভার। আমাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলার চেষ্টা করলে খুনি হাড়ে-হাড়ে বুঝতে পারবে, আমি পবন শর্মা বা সুরেন্দ্র নায়েক নই। সূর্যচ্যুতি সেন আলাদা জিনিস।
ড্রিল ডিউটির সময় আমি ড্রিল-হাউসে আবার একদফা অনুসন্ধান চালিয়েছি। টর্চ হাতে নিয়ে কাঠের মেঝের প্রতিটি ইঞ্চি খুঁটিয়ে দেখেছি। তাতে সেরকম কিছুই পাইনি। শুধু জেনারেটরের পিছনে এককোণে দু-তিনটে টুকরো পেয়েছি।
অনেকক্ষণ ধরে টুকরোগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বুঝতে পেরেছি ওগুলো পাঁউরুটির টুকরো–শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
সকালে ব্রেকফাস্টে আমরা টোস্ট, আখরোট আর কফি খেয়েছিলাম। কে জানে, তখন হয়তো অদিতি কিংবা সুরেন্দ্র ব্রেকফাস্ট সঙ্গে নিয়ে ড্রিল-হাউসে এসে ঢুকেছে। আবার গতকাল পবনও এসে থাকতে পারে। কিন্তু কাল পবন উধাও হওয়ার পর আমরা যে তল্লাশি চালিয়েছিলাম তাতে এগুলো পাওয়া যায়নি। তা থেকে সিদ্ধান্তে আসা যায়, হয় আমরা কাল ভালো করে খোঁজ করিনি, অথবা আমাদের গতকালের তল্লাশির পর এগুলো কেউ এখানে ফেলে গেছে।
পাঁউরুটির কয়েকটা টুকরো ছাড়া ড্রিল-হাউসে আর কিছু পাইনি আমি। তবে ইচ্ছে করেই এগুলোর কথা কাউকে আর বলিনি।
সুজাতার কথায় আমার চটকা ভাঙল।
ও বলল, সুর্যদা, ব্লিজার্ড শুরু হয়ে গেছে…।
রোহিত বলল, তার মানে কাজ বাড়ল। কাল ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু বরফ সরানোর কাজ করতে হবে।
আন্টার্কটিকার ঠান্ডা আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। শীতের পোশাক পরে সেই ঠান্ডার সঙ্গে লড়াই করা যায়। কিন্তু যদি কনকনে ঝোড়ো হাওয়া বইতে থাকে তা হলে শীতের পোশাক মোটেই আর যথেষ্ট নয়। তুষারঝড়ের সময় শনশনে হাওয়ায় উড়তে থাকে শুকনো বরফের কুচি মরুভূমিতে যেমন বালির ঝড় ওঠে অনেকটা সেইরকম।
এই ঝড়ের সময় ক্যাম্পের বাইরে বেরোনোই মুশকিল। চামড়ার এতটুকু খোলা জায়গা পেলে বরফকুচির ঘায়ে সেখানে আঁচড় পড়বেই। মনে হয় যেন হাজার-হাজার ছুঁচ ফুটিয়ে দিচ্ছে। কেউ। তবু কিংবা ক্যাম্পকে বাঁচাতে অনেক সময় ব্লিজার্ডের মধ্যেই আমাদের বাইরে বেরোতে হয়েছে। তখন যে-দৃশ্য দেখেছি তা জীবনে ভোলার নয়। অসংখ্য বরফের কুচি হাওয়ায় ভেসে ঢেউয়ের পরে ঢেউ তুলে ছুটে চলেছে। সেই ঢেউয়ের মাঝে অন্ধের মতো হাবুডুবু খাচ্ছি আমরা কয়েকজন আমাদের ঘিরে ফেলেছে সাদা অন্ধকার।
আন্টার্কটিকার এসে থেকে অনেক তুষারঝড় আমরা দেখেছি। ঝড়ের সময় আমরা এ পর্যন্ত হাওয়ার সবচেয়ে বেশি গতি পেয়েছি ঘণ্টায় একশো আশি কিলোমিটার।
আজকের ঝড়টার তেজ কম হলেও আমার কেমন অদ্ভুত লাগছিল। মনে হচ্ছিল, আমাদের পাঁচজনের ভেতরের ঝড় যেন হঠাৎই বাইরে বেরিয়ে এসেছে।
চন্দ্ৰেশ্বর আর রোহিতকে বললাম, ক্যাম্পের বাইরে জানলা আর দেওয়ালগুলো ভালো করে চেক করতে। এই উড়ন্ত বরফের মজা হল এই যে, ওরা যেখানেই ধাক্কা খায় সেখানেই লেপটে আটকে যায় আঠার মতো।
ওরা দুজনে সিনথেটিক দড়ি আর শাবল নিয়ে বেরিয়ে গেল। বেরোনোর আগে চোখ, মাথা, শরীর ভালো করে ঢেকে নিল। ওদের বললাম, রান্নাঘর আর স্টোরটায় ভালো করে নজর দিতে। কারণ, ক্যাম্পে ল্যাবগুলোর আমরা যতটা যত্ন নিই, রান্নাঘর বা স্টোরের বেলায় তার দশভাগের একভাগও নিই না।
অদিতি আর সুজাতাকে বললাম, তোমরা বসে গল্প করো–আমি সবকটা ঘর ঘুরে একবার দেখে আসি।
মিনিটদশেকের মধ্যেই আমাদের কাজ সারা হয়ে গেল, কিন্তু দুরন্ত গতির ঝড়ের জন্যে মনে হল যেন একঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে।
গল্পগুজবে আরও খানিকটা সময় কেটে যাওয়ার পর সুজাতা হঠাৎ বলল, বেস ক্যাম্পে খবর পাঠাবেন না, সূর্যদা?
রোহিত বলল, হ্যাঁ, সুরেন্দ্র উধাও হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা জানান…।
সুজাতা বলল, আর লেক এক্স-এর ব্যাপারে বেস ক্যাম্পকে অ্যালার্ট করে দেবেন।
অ্যালার্ট করে দেব মানে! আমি অবাক হয়ে সুজাতার মুখের দিকে তাকালাম। এই দুদিনে ওর বয়েস অনেক বেড়ে গেছে। এক কাল্পনিক জলের সরীসৃপ আর বরফের পোকা ওকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
সুজাতা আমার চোখে তাকাতে সাহস পেল না। চোখ নামিয়ে বলল, এই যে পবন শর্মা আর সুরেন্দ্র নায়েক হাওয়ায় মিলিয়ে গেল…।
আমি ভীষণ বিরক্ত হলাম। এইরকম একটা একঘেয়ে থিয়োরি আর কঁহা তক শোনা যায়!
