কিছুক্ষণ সবাই চুপ করে রইল।
তারপর অদিতি নরম গলায় বলল, হ্যাঁ, আমি ফেমাস হতে চাই বিজ্ঞানী হিসেবে। আর একইসঙ্গে বন্ধুদের বাঁচাতে চাই, নিজেও বাঁচতে চাই।
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, সরি, কিছু মনে কোরো না। আমি একটু আপসেট হয়ে পড়েছিলাম।
সুজাতা মুখে হাত চাপা দিয়ে আচমকা উঠে চলে গেল। মনে হল যেন কান্না চাপতে চাইছে। আন্টার্কটিকার ইমোশনাল স্ট্রেস বড় মারাত্মক।
অদিতি বলল, সুরেন্দ্র নায়েকের স্ট্রেঞ্জ ডিস্যাপিয়ারেন্সের ব্যাপারটা বেস ক্যাম্পে জানাবেন তো…?
হ্যাঁ, জানাব– রাতে।
প্রতিদিন রাতে আমি বেস ক্যাম্পের সঙ্গে রেডিয়ো যোগাযোগ করি। সেই খবর তারপর ছড়িয়ে পড়ে বহু জায়গায়। আন্টার্কটিকার সারা বছর ধরেই নানান দেশের গবেষণা চলে। তার জন্যে নানান জায়গায় রয়েছে শিবির। ভারতীয় গবেষক দল এই বরফের দেশে প্রথম পা রেখেছিল ১৯৮২ সালের ৯ জানুয়ারি। সেদিনই জাতীয় পতাকা উড়েছিল দক্ষিণ গঙ্গোত্রীতে। তারপর থেকে নিয়মিত ভারতীয় অভিযাত্রী দল আন্টার্কটিকার এসেছে। তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে গবেষণার ততটা গোপনীয়তা নেই, যেমনটি আছে অপারেশন লেক এক্স-এর বেলায়। আমাদের এবারের অভিযানের আসল উদ্দেশ্য যদি অন্যান্য দেশ জেনে যায়…তারপর ওদের দলের কেউ যদি এখানে আমাদের ক্যাম্পে এসে…নাঃ, আমিও কী সব এলোমেলো ভাবছি।
রোহিত যেন আমার মনের কথা টের পেয়ে বলে উঠল, দাদা, অন্য কোনও রাইভাল কান্ট্রি আমাদের রেডিয়ো মেসেজ ইন্টারসেপ্ট করে যদি লেক এক্স-এর ব্যাপারটা টের পেয়ে যায়, তারপর স্পেশাল টাইপের প্লেন নিয়ে এই অঞ্চলে এসে ল্যান্ড করে…।
চন্দ্ৰেশ্বর বাধা দিল রোহিতকে : তা হলে বেস ক্যাম্পের রেডার ওটাকে স্পট করবে অনেক আগে। আনঅথরাইজড কোনও এয়ারক্র্যাফট এখানে ঢুকতে পারবে না। তা ছাড়া, যদিও বা ঢুকতে পারে, তা হলে তার ইঞ্জিনের শব্দ আমরা নিশ্চয়ই শুনতে পেতাম।
সায় দিয়ে মাথা নাড়ল রোহিত? ঠিকই বলেছ। এ ছাড়া পায়ে হেঁটে কোনও অ্যাকশন স্কোয়াডের পক্ষে এই পোল অফ ইনঅ্যাসেসিবিলিটিতে এসে পৌঁছনো অবাস্তব। কারণ, পিঠে রুকস্যাক ঝুলিয়ে আন্টার্কটিকার এতটা পথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব নয়। আর সবচেয়ে বড় কথা হল, এখানে লুকোনোর কোনও জায়গা নেই।
আমি বললাম, অ্যাবসোলিউটলি কারেক্ট। এই থিয়োরিটা শুধু ইমপ্ৰব্যা নয়, আটারলি ইমপসি। বাইরে থেকে কেউ আমাদের এই ক্যাম্পে ঝড় তুলতে আসেনি–আমাদের মধ্যেই কেউ ঝড় তুলেছে।
সবাই চুপ করে রইল। আমার কথা সকলের অপছন্দ হলেও ব্যাপারটা সত্যি। বোধহয় মনে-মনে প্রত্যেকে সেই বিশ্রী প্রশ্নটাই ভাবতে লাগলঃ আমাদের মধ্যে কে?
প্রায় দু-মিনিট পর আমি বললাম, ঠিক আছে–এবারে কাজের কথা হোক। চন্দ্রেশ্বর, তুমি আর সুজাতা স্যাপ্ল টেস্টিং-এ লেগে পড়ো। রোহিত আর অদিতি, তোমরা অ্যাটমোসফেরিক ডেটা কালেক্ট করো। আমি ড্রিল-ডিউটিতে যাচ্ছি।
সুজাতা বলে উঠল, স্টার্ট-আপ-এর সময় আপনার একা অসুবিধে হবে, সূর্যদা। আমি আপনাকে হেল্প করে তারপর চন্দ্ৰেশ্বরের সঙ্গে টেস্টিং-এ হাত লাগাচ্ছি।
আমি সুজাতার দিকে তাকিয়ে দেখলাম।
মেয়েটার মনের খোঁজ পাচ্ছিলাম ধীরে-ধীরে। স্পষ্ট বুঝতে পারি, ও আমার কাছে আসতে চাইছে। অদিতি আর পবনের ঘনিষ্ঠতার কথা সুজাতাই আমাকে প্রথম জানিয়েছিল।
আমি জানি, এটাই স্বাভাবিক। বরফে ঢাকা ধু-ধু প্রান্তরের এই বেনজির নির্জনতা মনকে কেমন যেন করে দেয়। তখন একটা মন আর-একটা মনের উষ্ণতা খুঁজতে চায়। কাজের সময় মন খুব ব্যস্ত থাকে বলে এলোমেলো চিন্তা তেমন অসুবিধেয় ফ্যালে না। তবে হাতে বাড়তি সময় পেলেই মনটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায়। দুনিয়ার যত বাস্তব-অবাস্তব চিন্তা মনে ভিড় করে আসে।
তবে আমার কথা আলাদা। আমি যখনই এরকম ভাবার সময় পাই তখন বাড়ির কথা ভাবি। কৃষ্ণার কথা। আর আমাদের ছোট্ট মেয়ে টুসকির কথা।
টুসকিকে এত পুতুল-পুতুল দেখতে যে, শো-কেসে সাজিয়ে রাখলে লোকে ভুল করে ওকে সত্যিকারের পুতুল ভেবে বসবে।
রোহিত উঠে দাঁড়াল। বলল, দাদা, উঠুন–এবার কাজে লেগে পড়ি।
চন্দ্ৰেশ্বর বলল, সবকিছু ঠিকঠাক চললে আর মাত্র কটা দিন। তারপরই বাড়ি ফেরা। কতদিন যে বউয়ের হাতের রান্না খাইনি!
সুজাতা ঠোঁট টিপে বলল, স্ত্রৈণ।
চন্দ্ৰেশ্বর অবাক হয়ে তাকাল সুজাতার দিকেঃ কেয়া, ম্যাডাম, ইয়ে স্ত্রৈণ কেয়া হ্যায়?
আমি হেসে ওর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললাম, ওটা দেবভাষা–তুমি ওর মানে বুঝবে না। ওই শব্দটার মানে হল, তুমি তোমার বউকে খুব ভালোবাসো।
চন্দ্ৰেশ্বর খুশি হয়ে মাথা নেড়ে সায় দিলঃ ও তো সহি বাত।
আমরা বাইরে বেরোতেই চন্দ্ৰেশ্বর বলল, ড্রিল-ডিউটিতে আপনি তো একা থাকবেন। যদি কোনও…ইয়ে..ডেঞ্জার হয়…মানে…।
আমি ওর চোখে চোখ রেখে বললাম, আমি একা দুজনের চেয়েও একটু বেশি। এই কথাটা আমি অফিশিয়ালি সবাইকে জানিয়ে রাখতে চাই। সুজাতা, তুমি সবাইকে এটা বলে দিয়ো। যদি খুনি আমাকে উধাও করার ঝুঁকি নেয় তা হলে দ্যাট উইল বি হেল অফ আ রিস্ক।
চন্দ্ৰেশ্বর চোখ সরিয়ে নিল আমার চোখ থেকে।
.
০৩.
সন্ধেবেলায় সবাই আড্ডার মেজাজে ছিলাম।
অদিতি বেশ কয়েকটা গান শোনাল। রোহিত সেই গানে কখনও কখনও গলা মেলাল। চন্দ্রেশ্বর নানারকম নেশা করা নিয়ে অনেকগুলো মজার গল্প শোনাল। তারপর আমরা সবাই তাসের প্যাকেট নিয়ে বসলাম। ঘণ্টাখানেক ফিশ আর রামি খেলা হল।
