কারণ, সাফল্যের শেষ ধাপে পৌঁছে আমি বোকার মতো অসাবধানি হতে রাজি নই।
ঝড়ের সময়, ড্রিল-হাউসে যখন কেউ কাজ করছে তখন, ড্রিল-হাউসের দরজা খুলে গিয়ে বরফ ঢুকে পড়তে পারে ভেতরে। সেইজন্যে আমি বলেছি, কয়েকটা ফুয়েল ড্রাম দরজার পাশে রাখতে যাতে ঝড়ের সময় দরজাটা ভেতর থেকে মোটামুটি আটকে রাখা যায়।
এখন দরজা ভেজানোই ছিল। সেটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই বিশাল যন্ত্র, বিকট শব্দ, আর সুরেন্দ্র নায়েকের গরহাজিরি আমাদের ধাক্কা মারল।
আমি আর সুজাতা যখন ফ্যালফ্যাল করে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি তখন অদিতি, রোহিত আর চন্দ্ৰেশ্বর এসে ড্রিল-হাউসে ঢুকল।
এরপর যেন অ্যাকশন রিপ্লে শুরু হল।
পবন শর্মা উধাও হওয়ার পর আমরা যা-যা করেছিলাম, এবারও সেসব করতে লাগলাম। ড্রিল-হাউসকে তন্নতন্ন করে সার্চ করলাম। এবং ফলাফল হল বিরাট শূন্য।
অদিতি মই বেয়ে উঠে গেল ওপরে। হ্যাঁচ খুলে শরীরের অর্ধেকটা বাড়িয়ে দিল বাইরে। তারপর, মিনিটকয়েক পর, ও নেমে এল নীচে। আমার দিকে তাকিয়ে ধীরে-ধীরে মাথা নাড়ল।
নেই। সুরেন্দ্র নায়েক কোথাও নেই।
আমি ড্রিলটা বন্ধ করলাম। তবে আলোর সার্কিটটা অন রাখলাম। ঠোঁট কামড়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলাম।
সুজাতা আমার কাছে এসে জিগ্যেস করল, এবারে আপনি কী বলবেন, সূর্যদা?
আমি ওর দিকে তাকালাম। এতদিন আন্টার্কটিকার থাকার ধকল এবং পরপর দুজন সাথী আশ্চর্যভাবে উধাও হওয়ার ঘটনা ওকে ভীষণ চাপে ফেলে দিয়েছে।
আমিও কি চাপের মধ্যে পড়িনি? কেন সুজাতার প্রশ্নের জবাব আমি দিতে পারছি না? হাতের ইশারায় সবাইকে আমি ক্যাম্পে ফিরতে বললাম।
.
দুপুরে লাঞ্চের পর গোলটেবিল বৈঠক বসল।
ড্রিল করার কাজ আমরা চালিয়ে যাব, না কি বন্ধ করব? এই প্রশ্নটা নিয়ে বিতর্ক শুরু হল।
সকালবেলা যখন ড্রিলিং শুরু হয় তখন তো সুরেন্দ্র বহাল তবিয়তে ড্রিল-হাউসে ছিল। কারণ, অদিতি গিয়ে ওকে সাহায্য করে বেরিয়ে আসার পর ড্রিল স্টার্ট করেছে সুরেন্দ্র। তখন আমরা ড্রিল-হাউসের কাছাকাছিই ছিলাম। সুরেন্দ্রকে চোখে না দেখলেও ওর যন্ত্রের শব্দ শুনেছি।
সুজাতা একটু ইতস্তত করে বলল, সূর্যদা, বরফের নীচের দিকের লেয়ারে–মানে, লেক এক্স-এর কাছাকাছি লেয়ারে নতুন ধরনের কোনও বরফের পোকা নেই তো!
পোকা! হেসে ফেলল চন্দ্ৰেশ্বর আর রোহিত।
আমি বললাম, প্রায় ছমাস আমরা এখানে আছি–সেরকম কোনও পোকা আমরা দেখিনি। তা ছাড়া জমাট বরফের মধ্যে পোকা থাকবে কেমন করে!
যেমন করে আইসফিশ বেঁচে থাকে!
সুজাতার কথায় রোহিত আর চন্দ্ৰেশ্বরের হাসি মিলিয়ে গেল পলকে। আমিও থমকে গেলাম।
ঠিকই বলেছে সুজাতা–মেরিন বায়োলজিস্টের মতোই কথা বলেছে।
আন্টার্কটিকার আইসফিশ বা বরফমাছের খোঁজ যখন বিজ্ঞানীরা পেয়েছিলেন, তারা ভাবতেই পারেননি এমনটা সম্ভব। এই মাছের শরীরে একবিন্দুও হিমোগ্লোবিন নেই। এর রক্ত সাদা বললেও ভুল হয় না। আর শুধু রক্ত কেন, বরফমাছের কানকো, লিভার সবই সাদা। তবে সাধারণ লাল-রক্তের মাছের মতো বরফমাছেরও শ্বাস-প্রশ্বাস চালানোর জন্যে অক্সিজেন দরকার হয়। পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মাছের দরকারি অক্সিজেনের সিংহভাগটাই জোগান দেয় হিমোগ্লোবিন। উষ্ণতা যত কমে আসে হিমোগ্লোবিনের অক্সিজেন জোগান দেওয়ার ক্ষমতাও ততই কমে যায়। ফলে সাধারণ মাছের ক্ষেত্রে এই ক্ষমতা বরফমাছের অন্তত দশগুণ। কিন্তু সাধারণ মাছ আর বরফমাছ জল থেকে অক্সিজেন নেয় একই হারে। তা থেকেই বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে পৌঁছন যে, বরফমাছের হৃৎপিণ্ড রক্ত পাম্প করে সাধারণ মাছের চেয়ে অনেক দ্রুত হারে। তার প্রমাণ পাওয়া গেল সহজেই। পরীক্ষা করে জানা গেছে, একই মাপের লাল-রক্তের মাছের তুলনায় বরফমাছের হৃৎপিণ্ড প্রায় তিনগুণ বড়।
যদি শারীরবিজ্ঞানের অজানা কোনও কৌশলে সত্যি এই ধরনের কোনও পোকা থেকে থাকে বরফের অতল স্তরে! বেগুনের ভেতরে যেমন পোকার খোঁজ পাওয়া যায়–অথচ বাইরে থেকে বোঝা যায় না–যদি সেরকম কিছু হয়!
সুজাতা, তুমি কি বলতে চাও যে, বরফের কোনও পোকা–যার খোঁজ বিজ্ঞানীরা এখনও। পাননি–ড্রিলিং শ্যা বেয়ে উঠে এসেছে…তারপর পবন শর্মা আর সুরেন্দ্র নায়েককে খতম করে দিয়েছে?
গলায় যতটা জোর দিতে চেয়েছিলাম ততটা হল না। চন্দ্ৰেশ্বর মুখের ভেতরে কী একটা চিবোচ্ছে, কিন্তু ওর ঠাট্টার কিংবা অবিশ্বাসের ভাবটা প্রায় মিলিয়ে গেছে। রোহিত মাথা নীচু করে জ্যাকেটের ওপরে আঙুল বোলাচ্ছে। আর অদিতি নির্বিকার।
সুজাতা বলল, সূর্যদা, ঠান্ডা মাথায় ভাবুন। আমি বলছি না যে, আইসফিশের মতো আইসওয়র্ম আছেই। আমি শুধু বলছি, ইটস আ পসিবিলিটি।
আমি খানিকটা গোঁয়ারের মতোই বলে উঠলাম, পোকা থাক বা না থাক আমরা থামছি না। দরকার হয় আমি একাই ড্রিল করব। লেক এক্স-এর জলের স্যাল্প আমার চাই-ই চাই। এর জন্যেই আমরা মাসের পর মাস জানোয়ারের মতো পরিশ্রম করেছি। আমি…আমি…।
অদিতি হঠাৎ ঠান্ডা গলায় বলল, আসলে আপনি ফেমাস হতে চান। রিসার্চ পেপার, টিভি ইন্টারভিউ, ওয়ার্ল্ডওয়াইড পাবলিসিটি। বিখ্যাত হওয়ার নেশায় আপনি অন্যদের কথা ভাবছেন না।
কেন, তুমি ফেমাস হতে চাও না? চন্দ্রেশ্বর, রোহিত, সুজাতা–ওরা চায় না! আমি একে-একে দেখলাম প্রত্যেকের দিকে ওয়েল, একটা কথা আমি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে চাই। আমি থামছি না। পোকা কিংবা সাপ তো দূরের কথা, যদি ড্রিলিং শ্যা বেয়ে একটা গোটা ডাইনোসরও উঠে আসে তবুও আমি থামছি না।
