অদিতি আর রোহিত বোধহয় অদিতির ল্যাবের দিকে যাচ্ছিল। সুরেন্দ্রর কথায় অদিতি রোহিতকে বলল, তুমি এগোও–আমি মিস্টার নায়েকের সঙ্গে গিয়ে একটু হাত লাগিয়ে দিই। তারপর আমাকে লক্ষ করে : সুর্যদা, আপনি বরং আপনার কাজ করুন–এদিকটা আমি হেল্প করছি।
অদিতি আর সুরেন্দ্র চলে গেল ড্রিল-হাউসের দিকে। আমি আর রোহিত কিছুক্ষণের জন্যে কাজের কথায় ডুবে গেলাম।
একটু পরেই দেখি অদিতি ড্রিল-হাউস থেকে বেরিয়ে আসছে। আমাদের কাছে এসে ও হাতে হাত ঘষে হাত ঝাড়তে লাগল। তারপর হেসে বলল, মিস্টার নায়েকও এখন ভয় পেয়ে গেছে। বলছে, অদিতি ওই জলে কী আছে নোবডি নোজ। আমরা তো আমাদের লজিক দিয়ে চিন্তা করে বলছি ওই লেকে কোনও মস্টার রেপটাইল নেই–কোনও ভয়ংকর প্রাণীও নেই। কিন্তু আমরা কি জোর দিয়ে এ কথা বলতে পারি…। তো আমি ওকে সাহস দিয়ে এসেছি।
অদিতির কথা শেষ হওয়ার আগেই ঘরঘর শব্দে ড্রিল চালু হয়ে গেল। সুরেন্দ্র নায়েক ড্রিল স্টার্ট করে দিয়েছে।
রোহিত বলল, আজ বিকেলে না হলেও কাল সকালে ড্রিল-বিটটা লেক এক্স-এর জল টাচ করবে। অ্যান্ড অ্যাট দ্য সেম টাইম উই শ্যাল টাচ হিস্ট্রি।
অদিতি হাত নেড়ে বলল, কী থ্রিলিং ব্যাপার!
আমি বললাম, আমাদের খ্যাতির খানিকটা পবন শেয়ার করতে পারলে ভালো লাগত।
একথায় সবাই কেমন চুপ করে গেল।
একটু পরেই রোহিত ওর জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা চ্যাপটা ধাতুর বোতল বের করল। আমরা সবাই জানি ওতে ব্র্যান্ডি আছে। অভিযানের শুরুতেই রোহিত আমাকে বলেছে যে, শীতের দেশে ওটা না খেলে ওর চলে না। আমি যেন ওকে সে-অনুমতি দিই। শুধু অনুমতি দেওয়া নয়, আমিও ওর কাছ থেকে মাঝে-মাঝে একটু-আধটু চেখে দেখি। এই প্রবল ঠান্ডায় জিনিসটা দারুণ কাজ দেয়।
চকচকে বোতলটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে রোহিত বলল, দাদা, আজ ভীষণ ঠান্ডা– ঠান্ডা তাড়াতে এক চুমুক খেতে পারেন।
আমি বোতলটা নিলাম। দু-ঢোক খেয়ে রোহিতকে ওটা ফেরত দিলাম।
সত্যি, ঠান্ডাটা এবার কম লাগছে যেন।
রোহিত আর অদিতি এবার অদিতির ল্যাবের দিকে হাঁটা দিল। সেদিকে তাকিয়ে দেখি তিনটে অ্যাডেলি পেঙ্গুইন গম্ভীরভাবে বরফের ওপরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
আমি এবার ক্যাম্পের ল্যাবের দিকে এগোলাম। ড্রিল-হাউসের আওয়াজ শুনতে-শুনতে হঠাৎই মনে হল, শেষ পর্যন্ত ড্রিলটা টিকবে তো! শব্দ শুনে মনে হচ্ছে ওটা যেন মরিয়া হয়ে ব্রেকিং লোডে কাজ করছে।
ল্যাবে স্যাগুলো টেস্ট করতে করতে নানান দুশ্চিন্তার ঢেউয়ে তলিয়ে গিয়েছিলাম। বারবার মনে হচ্ছিল, শুধু ড্রিলটা নয়, আমরাও ব্রেকিং লোডে কাজ করছি। তবে আর বেশিদিন বাকি নেই বড়জোর দু-চারদিন।
এইসব কথা এলোমেলো ভাবছিলাম আর যান্ত্রিকভাবে স্যাগুলো টেস্ট করছিলাম। এই স্যাপ্ল টেস্টিং আমি চন্দ্রেশ্বর গুপ্তার কাছে শিখেছি। আন্টার্কটিকা অভিযানে এসে শুধুমাত্র নিজের এরিয়া নিয়ে কাজ করলে হয় না, মাঝে-মাঝে দরকার পড়লে অন্য ডিসিপ্লিনেও কাজ করতে হয়। চুপচাপ বেকার বসে থাকার চাইতে শিখে-পড়ে নিয়ে সে কাজ করা অনেক ভালো।
হঠাৎ সুজাতার কাঁপা গলার চিৎকারে আমি চমকে উঠলাম।
সুর্যদা! শিগগির! সুরেন্দ্র নায়েককে পাওয়া যাচ্ছে না!
ঝটিতি ঘুরে দাঁড়াতে গিয়ে স্যাপ্ল স্টোর করার কয়েকটা স্টেরিলাইজড কনটেনার ল্যাবের টেবিল থেকে পড়ে গেল মেঝেতে।
ঠং-ঠং করে বিচ্ছিরি শব্দ হল।
কিন্তু আমি সুজাতার মুখের দিকে তাকিয়ে পাথর হয়ে গেলাম। এ কোন সুজাতা!
বরফের প্রতিফলন থেকে বাঁচতে সুজাতার চোখে রোদচশমা। দু-গালের যেটুকু দেখা যাচ্ছে। সাদা, ফ্যাকাসে, রক্তহীন। জ্যাকেটের এখানে-ওখানে আর মাথার টুপিতে বরফের কুচি লেগে রয়েছে।
আর মেয়েটা থরথর করে কাঁপছে, ওর ঠোঁট নড়ছে, কিন্তু কোনও শব্দ বেরোচ্ছে না।
আমি ওকে দু-হাতে চেপে ধরে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলাম। তখনই ওর কাঁপুনি হাতে টের পেলাম।
সুজাতা এতক্ষণ রান্নাঘরে ছিল বলে জানতাম কারণ, দুপুরের রান্নার তদারকি ওর দায়িত্ব। আর চন্দ্রেশ্বর গুপ্তার ওকে সাহায্য করার কথা।
তা হলে সুজাতা জানল কী করে যে, সুরেন্দ্র নায়েককে পাওয়া যাচ্ছে না!
সেকথাই জিগ্যেস করলাম ওকে।
উত্তরে ও বলল, রান্নার কাজ করতে করতে একঘেয়ে লাগায় ও ক্যাম্প ছেড়ে বাইরে বেরোয়। আমি তখন ল্যাবে কাজ করছিলাম, তাই ওর বেরিয়ে যাওয়াটা খেয়াল করিনি। ড্রিল হাউস নিয়ে একটা ভয় ওর মনে কাজ করছিল। অথচ মেরিন বায়োলজিস্ট হিসেবে একটা কৌতূহলও মাথাচাড়া দিচ্ছিল বারবার। তাই ও সুরেন্দ্রর কাজ কতটা এগিয়েছে দেখতে ড্রিল হাউসে যায়।
গিয়ে দ্যাখে ড্রিল চলছে তবে সুরেন্দ্র ড্রিল-হাউসে নেই।
ডাকাডাকি করে বা এদিক-ওদিক খোঁজ করে কোনও ফল না পাওয়ায় সুজাতা দৌড়ে এসেছে আমার কাছে।
সঙ্গে-সঙ্গে আমি চন্দ্ৰেশ্বরকে রান্নাঘর থেকে ডেকে নিলাম। তারপর তিনজনে বেরিয়ে এলাম ক্যাম্পের বাইরে।
চন্দ্ৰেশ্বরকে বললাম, যাও, ওই ক্যাম্প থেকে অদিতি আর রোহিতকে ডেকে আনো এক্ষুনি।
চন্দ্ৰেশ্বর অদিতির ক্যাম্পের দিকে রওনা হল। আমি আর সুজাতা ড্রিল-হাউসের দিকে গেলাম।
না, এবার দরজা ভাঙতে হল না, কারণ গতকালের ঘটনার পর ড্রিল-হাউসের দরজা ইচ্ছে করেই আর মেরামত করা হয়নি। বরং বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করার ব্যবস্থাটা আরও জোরদার করেছি–একটা তালাও লাগানোর ব্যবস্থা করেছি, যাতে কেউ লুকিয়ে ড্রিল-হাউসে ঢুকে ড্রিলটাকে স্যাবোটাজ করতে না পারে।
