হ্যাঁ–জানাব। কাল সকালে। পবন শর্মাকে ফিরে আসার জন্যে আমি আরও আট ঘণ্টা সময় দেব–ও যে আর নেই সেটা সম্পর্কে ডেড শিয়োর হওয়ার জন্যে এই সময়টা আমি দিতে চাইছি। তারপর দক্ষিণ গঙ্গোত্রীতে রেডিয়ো মেসেজ পাঠাব।
আমরা উঠে পড়লাম। এখন বিশ্রাম নেওয়ার পালা। ঘুমিয়ে রাত কাটাব একথা বলাটা যদিও এখানে মানানসই নয়, তবুও অভ্যেস সহজে যায় না। কথাবার্তায় আমরা সবসময় পুরোনো অভ্যেসটাই ব্যবহার করছি।
আমাদের ক্যাম্পে প্রত্যেকের জন্যে আলাদা ছোট-ছোট ঘর কাঠের পার্টিশান দিয়ে তৈরি। এ ছাড়া রয়েছে কাজ চালানোর মতো তিনটে ছোট মাপের ল্যাব। একটা স্টোর রুম, আর রান্নাঘর।
আমার খুপরিতে ঢুকে আশ্রয় নিলাম স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে। স্লিপিং ব্যাগটা ঠান্ডায় বেজায় শক্ত হয়ে গিয়েছিল। প্রায় পনেরো মিনিট ধরে ওটাকে লাঠিপেটা করে তবে নরম করতে পারলাম।
সূর্য এখন দক্ষিণ দিগন্তে নেমে এসেছে বলে তেজ খানিকটা কমে গেছে। তবে আকাশে দিব্যি আলো রয়েছে। এখন এখানে রাত এইরকমই। প্রথম-প্রথম আমার কিছুতেই ঘুম আসত না। বিগ আই–মানে, অনিদ্রা রোগ হয়েছিল। পরে ব্যাপারটা মানিয়ে নিয়েছি।
স্লিপিং ব্যাগের অন্ধকারে ঢুকে পবন শর্মার কথা ভাবছিলাম। আমাদের ড্রিল মেশিনটার কলকবজা ও খুব ভালোভাবে জানত। সাধারণ টুকিটাকি ফন্ট ও দিব্যি চটপট সারিয়ে দিত। এখন যদি মেশিনটা হঠাৎ বিগড়ে যায় তা হলে যা-কিছু মেরামতের কাজ দলের একমাত্র ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আমাকেই করতে হবে। মনে-মনে চাইলাম, লেক এক্স-এ ঢোকার আগে ড্রিল মেশিনটা যেন বিকল না হয়।
.
পরদিন ব্রেকফাস্টের পর সুরেন্দ্র যখন ড্রিল-হাউসের ডিউটিতে যাচ্ছিল তখন দেখলাম, ক্যাম্পের বাইরে রোহিত চিরিমার ওর সঙ্গে কথা বলছে। হয়তো গতকালের ব্যাপার নিয়েই আলোচনা করছে।
অদিতি তৈরি হয়ে ওর ল্যাবের দিকে যাচ্ছিল, সুরেন্দ্র আর রোহিতের কাছে দাঁড়িয়ে গেল। হাত-পা নেড়ে কথা বলতে লাগল।
ব্রেকফাস্টের সময় অদিতি আমাকে জিগ্যেস করেছে রেডিয়ো ট্রান্সমিশন চালু করে বেস ক্যাম্পে ও পবন শর্মার খবরটা পাঠাবে কি না। আমি বলেছি, না, একটু পরে আমিই খবর দেব।
বেস ক্যাম্পে খবরটা দেওয়ার সময় শুধু এটুকু বললাম যে, গতকাল থেকে পবন শর্মাকে পাওয়া যাচ্ছে না। বোধহয় ও আর বেঁচে নেই।
ইচ্ছে করেই রক্তের ছিটে, হারানো আইস অ্যাক্স–এসবের কথা বললাম না। তাতে বেস ক্যাম্পের লোকজন উতলা হয়ে পড়বে, হয়তো এখানে প্লেন পাঠাতে চাইবে।
শিবির থেকে শিবিরে যাতায়াতের জন্যে প্লেনের ব্যবস্থা রয়েছে আমাদের জাহাজে। দক্ষিণ গঙ্গোত্রীর কাছাকাছি উপকূলে ফাস্ট আইসের কোল ঘেঁষে আমাদের জাহাজ অ্যাডভেঞ্চারার নোঙর করে আছে। অভিযান শেষ হলে এই জাহাজে চড়েই আমরা দেশে ফিরে যাব।
বেস ক্যাম্পের নির্দেশ পেলে তবেই জাহাজ থেকে নির্দিষ্ট শিবির লক্ষ করে প্লেন ওড়ানো হয়।
আমি বললাম যে, চিন্তায় কোনও কারণ নেই সিচুয়েশান আন্ডার কন্ট্রোল। কোনও হেল্প পাঠাতে হবে না।
কারণ, পবনের এই উধাও হওয়ার ব্যাপারটা আমি নিজেই একটু খতিয়ে দেখতে চাই।
উত্তরে বেস ক্যাম্প থেকে আমাকে যা জানাল তাতে আমার দুশ্চিন্তা বেড়ে গেল। ওরা বলল, ওখানে ক্লিজার্ড চলছে–কোনওমতেই প্লেন ওড়ানো সম্ভব নয়।
ওইসব অঞ্চলে তুষারঝড়ের মূল কারণ ক্যাটাবেটিক উইন্ডস। নানান ধরনের ইনভারশন উইন্ডের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হল ক্যাটাবেটিক উইন্ড। এই উইন্ড দু-রকমের হয় : অর্ডিনারি আর এক্সট্রর্ডিনারি। এর রহস্য এখনও বিজ্ঞানীরা পুরোপুরি ভেদ করতে পারেনি। উপকূলের দিকে জমির ঢাল যত বাড়ে ক্যাটাবেটিক উইন্ড ততই জোরালো হয়ে ওঠে। এই ঝড়ের দুরন্ত গতির মূলে রয়েছে মাধ্যাকর্ষণ। আন্টার্কটিকার ঠান্ডায় বাতাসের ঘনত্ব অনেক বেড়ে যায়। সেই ভারী বাতাস বরফের ঢাল বেয়ে যতই নামে ততই তার গতি বাড়তে থাকে অনেকটা যেন দুরন্ত গতির পাহাড়ি নদীর মতন। ১৯০৮ আর ১৯১১ সালের দুটি অভিযানে আন্টার্কটিকা গিয়েছিলেন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার ডগলাস মসন। ১৯১১-র অভিযানে তিনিই ছিলেন দলনেতা। ফিরে এসে দ্য হোম অফ দ্য ব্লিজার্ড নামে একটা বই লেখেন তিনি। সেই বইতে মসন ক্যাটাবেটিক উইন্ডের ভারী চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন ও ঝড়ের গতিকে সামাল দিতে তার দলের অভিযাত্রীরা সামনে এতটাই ঝুঁকে পড়ে হাঁটছিল যে, মনে হচ্ছিল এই বুঝি তারা বরফের ওপরে মুখ থুবড়ে পড়ল।
আমি ব্লিজার্ডের খবরটা অদিতিকে দিলাম। তাতে ও বলল, ব্লিজার্ড অর নো ব্লিজার্ড লেক এক্স-এর জলের স্যা আমরা নিচ্ছিই–থামছি না।
গুড স্পিরিট। আমি ওর পিঠ চাপড়ে দিলাম। না, আমার দলের এই মেয়েটা বেশ সাহসী আর ডাকাবুকো।
ড্রিল করে যে-আইস কোরগুলো উঠছে আমরা সেগুলো নানানভাবে পরীক্ষা করে দেখছি। গতকালের কয়েকটা কোর স্যাল্প এখনও টেস্ট করা বাকি।
আমি রোহিত, সুরেন্দ্র আর অদিতির দিকে খানিকটা এগোতেই সুরেন্দ্র চেঁচিয়ে বলল, চিফ, একটু ড্রিল-হাউসে চলুন–স্টার্ট-আপে একটু হেল্প করবেন।
আসলে ড্রিলটা চালু করার সময় দুজন লোক লাগে। নানারকম প্রোটেকশন লজিক চেক করতে হয়। লুব্রিক্যান্ট দিতে হয় অনেক জায়গায়। তারপর চালু করা–সেটা একার পক্ষে সহজ নয়। ড্রিল চালু অবস্থায় আমি আর পবন মাঝে-মাঝে ওটা দেখতে যেতাম যে ওটা ঠিকমতো চলছে কি না। এখন এই কাজটা আমার একার ঘাড়ে পড়েছে।
