আমরা নানান দিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছি। পবন শর্মা ড্রিল-হাউসে একমনে কাজ করছে। খুনি–যে পবনের খুব চেনা, আমাদেরই একজন গিয়ে ওকে যা-হোক-একটা ছল-ছুতোয় ডেকে নিয়ে এল। আইস অ্যাক্সটা খুনি আগে থেকেই টয়লেটে রেখে এসেছিল। পবনকে মনগড়া একটা গল্প শুনিয়ে সে টয়লেটে যেতে বলল। তারপর অন্য পথ ধরে ঘুরপাক খেয়ে একটু পরে সে ও গিয়ে হাজির হল টয়লেটে। উকিলসাহেব ওদের যে-কোনও একজনের পিছু ধরে টয়লেটে চলে গিয়েছিল। তারপর…।
তারপর খুনি পবনের গলায়, ঘাড়ে, কিংবা বুকে ধারালো আইস অ্যাক্স সজোরে চালিয়ে দিয়েছে। পবন শর্মা নিশ্চয়ই তখন বসেছিলনইলে উকিলসাহেবের বুকে রক্ত ছিটকে লাগার কথা নয়। আর আমাদের সবারই গায়ে ভারী প্যারাশুটের জ্যাকেট রক্ত-টক্ত লাগলেও অনায়াসেই মুছে ফেলা যায়। এই ঠান্ডায় সেই কাজটা আরও সহজ। তাই খুনির পোশাকে রক্তের দাগ পাওয়া যাবে না।
কিন্তু পবন শর্মা আর খুনি কখন টয়লেটে গিয়েছিল সেটা বোঝা খুব মুশকিল। কারণ, ড্রিলের শব্দ মোটেই বন্ধ হয়নি। আমরা যে যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থেকেছি। টেরই পাইনি কখন পবন শর্মা বা অন্য কেউ টয়লেটের দিকে গেছে।
এই খুনের একমাত্র সাক্ষী খুনি আর উকিলসাহেব।
ইস, পেঙ্গুইনরা যদি কথা বলতে পারত!
ওরা পাঁচজন নিজেদের মধ্যে নানারকম কথা বলছিল। বলছিল, দক্ষিণ গঙ্গোত্রীর বেস স্টেশনে পবন শর্মার খুনের খবরটা জানানো হবে কি না।
আমি ওদের ইশারায় থামিয়ে দিয়ে বললাম, খুনি এই ঘরেই আছে। অন্যরকম কিছু বলতে পারলে আমার ভালো লাগত কিন্তু উপায় নেই। তাই খুনি ছাড়া বাকি পাঁচজনকে বলছি সাবধানে থাকতে। আত্মরক্ষা বেঁচে থাকার একটা জরুরি শর্ত। আমরা পাঁচজন যেন আত্মরক্ষার জন্যে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করি। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর আরও বললাম, খুনিকেও আমার একটা কথা বলার আছে। একটা খুন যখন হয়ে গেছে তখন আর কিছু করার নেই। কিন্তু আর কোনও সমস্যা দেখা দিলে আলোচনার মাধ্যমে সেটা সমাধান করা যেতে পারে–খুনটা কোনও সমাধানের পথ নয়। এটা আমার একটা রিকোয়েস্ট জানি না, খুনি আমার রিকোয়েস্ট শুনবে কি না।
সবাই চুপ। কেউ একটি কথাও বলল না।
আসলে আমরা এমন একটা জায়গায় আছি যেখানে গোপনীয়তা বলে প্রায় কিছুই নেই। মানে, আমাদের সব আলোচনাই খুনি জানতে পারবে–হয়তো আলোচনাতে সে অংশও নেবে। তাকে না চেনা পর্যন্ত তাকে বাদ দিয়ে কোনও আলোচনার তেমন সুযোগ নেই। আর… হাসলাম আমি যখন তাকে আমরা চিনতে পারব তখন এইরকম আলোচনার আর কোনও প্রয়োজন থাকবে না। সত্যি, ভারি অদ্ভুত সিচুয়েশান।
হঠাৎই অদিতি জিগ্যেস করল, কিন্তু, সূর্যদা, পবন খুন হল কেন?
জানি না। আমি বললাম।
শুরু থেকে এই প্রশ্নটা আমার বুকের ভেতরে তোলপাড় করে চলেছে? কেন খুন হল পবন শর্মা? খুনের মোটিভটা কী? হাজার ভেবেও আমি এই প্রশ্নের কোনও উত্তর পাইনি।
ক্যাম্পের আবহাওয়া ক্রমশ ভারি হয়ে এসেছিল। তাই আমি কাজের প্রসঙ্গ তুললাম। কাল কার কী ডিউটি তা নিয়ে আলোচনা শুরু করলাম।
চন্দ্রেশ্বর গুপ্তার সিগারেট শেষ হয়ে গিয়েছিল অনেকক্ষণ আগেই। তার খানিকপরেই ও একটা চকচকে ছোট প্যাকেট ছিঁড়ে উপুড় করে দিয়েছে মুখের ভেতরে। বোধহয় পানমশলা-টশলা কিছু হবে। সেটা চিবোতে চিবোতে ও জড়ানো গলায় বলল, লেক এক্স-এর জল বিজ্ঞানের অনেক থিয়োরিকে হয়তো বদলে দেবে। বিশেষ করে প্যালিওজিওগ্রাফি আর প্যালিওইকোলজির অনেক চ্যাপটার হয়তো নতুন করে লিখতে হবে।
অদিতি সায় দিলঃ একটা লেক হাজার-হাজার বছর ধরে নেচার থেকে টোটালি আইসোলেটেড। তাতে খুব খুদে প্রাণী মাইক্রোস্কোপিক ক্রিচার, জলের গাছপালা, এমনকী মাছও কয়েক লক্ষ বছর ধরে অ্যাবসলিউট আইসোলেশনে–মানে, আমাদের প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গেছে। ফলে সেখান থেকে নতুন কিছু পাওয়া যেতেই পারে। আমরা হয়তো অনেক নতুন-নতুন প্রজাতির খোঁজ পাব।
সুজাতা হাতে হাত ঘষল বেশ কয়েকবার। তারপর মিনমিন করে বলল, ওখানে মাছ টাছের চেয়ে বড় কিছুও থাকতে পারে, অদিতিদি।
তা থাকতেই পারে। তা হলে দেশে ফিরে পাবলিসিটির লেভেলটা একবার চিন্তা করো। আমরা সবাই রাতারাতি ফেমাস হয়ে যাব।
সুরেন্দ্র হাই তুলল শব্দ করে। তারপর বলল, আমাদের কেয়ারফুল হতে হবে! লেকের জল বা লাইফ ফর্ম টক্সিক হতে পারে–তাতে অসুখবিসুখ হওয়ার পসিবিলিটি থাকবে। লেকের এনভায়রনমেন্ট আর আমাদের এনভায়রনমেন্টের মধ্যে বিস্তর ফারাক থাকতে পারে।
অদিতি বলল, তবে আমার মনে হয় লেক থেকে স্রেফ জল ছাড়া আর কিছু পাওয়া যাবে না। প্লেন অ্যান্ড সিম্পল এইচ টু ও।
রোহিত বলল, তাই যদি হয় তা হলে আমি অন্তত শক্ত হব। আমি অনেক কিছু এক্সপেক্ট করছি। স্রেফ জল নিয়ে আমি দেশে ফিরতে চাই না।
আমিও। চন্দ্ৰেশ্বর রোহিতের কথায় সায় দিল? তবে ড্রিলটার কন্ডিশন ভালো নয়, বস। আর কদিন ওটার দম থাকবে কে জানে!
আমি বললাম, সেটা নিয়ে আমিও চিন্তায় আছি। আমার মনে হচ্ছে কাল কি পরশুর ভেতরে আমরা লেকের জলে পৌঁছে যাব। তার মধ্যে ড্রিলটা যেন না বিগড়োয়।
সুরেন্দ্র আবার হাই তুলল, বলল, আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে–আমি শুতে গেলাম। তারপর আমার দিকে ফিরে বলল, পবনের ডিস্যাপিয়ারেন্সের ব্যাপারটা বেস স্টেশনে জানাবেন না?
