এখন ও জিগ্যেস করল, বস, আর য়ু শিয়ের পবন ইজ ডেড?
হ্যাঁ। কারণ, একটা আইস অ্যাক্স উধাও, পেঙ্গুইনের বুকে রক্তের দাগ, টয়লেটের বরফে রক্তের ছিটে সবগুলো যোগ দিলে একটাই আসার পাওয়া যায়–পবন ইজ ডেড। আর আমার ধারণা, ওর ডেডবডিটা এখানে আশেপাশে বরফের নীচেই কোথাও চাপা দেওয়া আছে।
কে–কে খুন করেছে ওকে? রোহিত জানতে চাইল।
আমি ঠোঁট টিপে মাথা নাড়লাম হতাশায়, বললাম, জানি কে খুন করেছে…।
সবাই চমকে টানটান হয়ে বসল আমার কথায়।
..যে খুন করেছে সে এখন এই ক্যাম্পে আমাদের চোখের সামনে বসে আছে। তেতো গলায় বললাম আমি কারণ বাইরের কেউ এখানে এসে পবনকে খুন করতে পারে না।
যদি প্লেন বা হেলিকপ্টারে করে এসে থাকে? একথা বলল অদিতি। এখন ও নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়েছে। অন্তত ওপর-ওপর দেখে তাই মনে হচ্ছে।
সুরেন্দ্র নায়েক তড়িঘড়ি আপত্তি জানিয়ে বলল, না, না–সেটা হলে আমরা ইঞ্জিনের শব্দ পেতাম। তা ছাড়া, যে-কোনও প্লেন এই এরিয়ায় এসে ল্যান্ড করতে পারবে না। স্পেশাল প্লেন দরকার।
যদি কেউ পায়ে হেঁটে চুপিসারে এসে কাজ সেরে যায়…।
বুঝতে পারলাম, অদিতি কিছুতেই মানতে পারছে না আমাদেরই একজন পবনকে খতম করেছে। কিন্তু বাস্তব তো এরকমই হয়। কিছু করার নেই।
অদিতির কথার জবাব দিতে হল না। তার আগে ও নিজেই বিড়বিড় করে বলল, এই পোল অফ ইনঅ্যাসেসিবিলিটিতে কে-ই বা পায়ে হেঁটে আসতে পারবে!
আমি বললাম, ঠিক ধরেছ। আমাদের তিন নম্বর ক্যাম্প এখান থেকে অন্তত নব্বই কিলোমিটার দূরে। যদি তর্কের খাতিরে ধরে নিই যে, সেখান থেকে কেউ পায়ে হেঁটে আমাদের এই ক্যাম্পে আসতে চায়, তা হলে ব্যাপারটা অনেকটা মই বেয়ে আকাশে পৌঁছনোর চেষ্টার মতো হাস্যকর শোনাবে–তাই না?
কেউ কোনও জবাব দিল না।
আমি ওদের মুখের দিকে একে-একে তাকালাম।
চন্দ্রেশ্বর গুপ্তা। ভালোমানুষ টাইপের চেহারা। জিওলজিস্ট হিসেবে বেশ চৌকস। রোগা শরীর, তবে শক্তি কম নয়। কাজ না থাকলে এর-ওর সঙ্গে মজা করে। কিন্তু এখন সব মজা উবে গেছে।
রোহিত চিরিমার। খুব নিয়ম মেনে চলে। বরফ সম্পর্কে অনেক জানে। আমাকে প্রথম আলাপের পর থেকেই দাদা বলে ডাকে। অভিযানে এসে আজ পর্যন্ত কোনও পরিস্থিতিকেই ভয় পায়নি। সবসময় নির্বিকার। একবার বরফের ফাটল থেকে আমাকে রেসকিউ করেছিল। ফাটলের ওপরটা বরফ জমে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। সেখানে পা ফেলতেই আমি ভেতরে পড়ে যাই। আমাকে রোহিত এমনভাবে উদ্ধার করেছিল যেন একগ্লাস জল খাচ্ছে ব্যাপারটা এতই সাধারণ ছিল ওর কাছে। এ থেকেই বোঝা যায় ওর নার্ভ কেমন শক্ত।
ক্যাম্পের কাঠের মেঝেতে বসে ছিল সুজাতা রায়। একটু ভিতু টাইপের। অভিযানে এসে থেকে বেশ কয়েকবারই আমাকে বলেছে, লেক এক্সকে ডিসটার্ব করে কোনও লাভ আছে, সূর্যদা?
আমি ওকে বোঝাতে চেয়েছি? আমরা না করলেও আগামীদিনের কোনও গবেষক লেকটাকে ডিসটার্ব করবেই, সুজাতা। তার চেয়ে প্রথম হওয়াটাই কি ভালো নয়! ভাবো তো, কত সম্মান, কত খ্যাতি, কত প্রচার! দেশে ফিরে অন্তত কয়েকমাস তো তোমাকে নানান টিভি চ্যানেলে হাজিরা দিতে হবে। তুমি সেটা চাও না? তখন সুজাতা বলেছে, হা, চাই–তবে প্রাণের বিনিময়ে নয়। ওই লেকের জলে…।
হাত নেড়ে ওকে থামিয়ে দিয়েছি আমি ও এসব তোমার উলটোপালটা আজগুবি সব সিনেমা দেখার ফল–গডজিলা আর জুরাসিক পার্ক-এর মতো।
অদিতি প্রধান। মাইক্রোবায়োলজিস্ট। সাহসী–তবে বেশ হিসেব করে চলে। পবনকে বেশ পছন্দ করত। এখন দুঃখ পেলেও ও যে-ধাতের মেয়ে তাতে সামলে উঠে বদলা নিতে চাইবে– পাগলের মতো খুঁজে বেড়াবে খুনিকে। তবে ও গান ভালোবাসে। হাতে সময় পেলেই টেপ রেকর্ডারে ক্যাসেট চালিয়ে মন দিয়ে শোনে, গুনগুন করে গানও গায়।
সুরেন্দ্র নায়েকের কোনও সমস্যা নেই। কী করতে হবে সেটা ওকে জানিয়ে দিলেই হল। বেপরোয়া। ধৈর্য বড় কম। সবসময় জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য গোছের ঢঙে চলাফেরা করে। আর ফাঁক পেলেই বউকে চিঠি লিখতে বসে। জাহাজে করে সমুদ্র পাড়ির সময়ে ওর নামে খুব ঘন-ঘন টেলেক্স আসত। তাই জাহাজের রেডিয়ো অফিসার খুরানা মাঝে-মাঝেই টেলেক্স ফর মিস্টার নায়েক না বলে ঠাট্টা করে নায়েক ফর মিস্টার টেলেক্স বলতেন। ওর বউ প্রায় প্রতিদিনই ওকে একটা করে টেলেক্স করত।
কিন্তু কে? এদের পাঁচজনের মধ্যে কে?
সত্যি করে বল, পবন শর্মাকে তোদের পাঁচজনের মধ্যে কে খুন করেছিস।
আইস অ্যাক্স নিয়ে গিয়ে আমি টয়লেট স্পেসের নানান জায়গায় খুঁড়ে-খুঁড়ে দেখেছি। কিন্তু আর কোনও চিহ্ন পাইনি। এই তুষার-রাজ্যে মৃতদেহ লুকিয়ে ফেলা খুব সহজ। বরফে একবার চাপা দিতে পারলেই কেউ আর তার কোনও হদিশ পাবে না। আর এখানে মৃতদেহ কখনও বিকৃত হয় না, পচে-গলে গন্ধ বেরোয় না। ফলে বছরের পর বছর একইরকম গোপন থেকে যায়। কেউ টের পায় না।
পবন শর্মার ডেডবডির সঙ্গে-সঙ্গে হয়তো খুনের অস্ত্রটাও খুনি বরফের নীচে লুকিয়ে ফেলেছে।
ঠিক আছে। মেনে নেওয়া গেল যে, খুনটা টয়লেট স্পেসেই হয়েছে। কিন্তু সেখানে পবন গেল কেমন করে! যেখানে ড্রিল-হাউসের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ! ড্রিল গমগম করে চলছে!
ক্লোজড রুম প্রবলেমটাকে যদি আপাতত বাদ রাখা যায় তা হলে খুনের বাকি গল্পটা দিব্যি অনুমান করা যায়।
