আন্টার্কটিকার বরফ অসংখ্য ছোট-ছোট বরফের ক্রিস্টাল দিয়ে তৈরি। এই জমাট বরফ প্রবাহিত হয়েই হিমবাহের জন্ম হয়–ঠিক যেন বরফের এক নদী। সরতে সরতে এই হিমবাহ চলে যায় সমুদ্রে। সমুদ্রের কিনারায় তৈরি হয় আইস শেলফ বা হিমসোপান। সেই ভাসমান হিমসোপান থেকে কিছু কিছু অংশ ভেঙে আইসবার্গ বা হিমশৈল হয়ে ভেসে পড়ে সমুদ্রে। এক একটি আইসবার্গের মাপ এক-একটি দেশের সমানও হতে পারে। ১৯২৬ সালে নরওয়ে অভিযানের নাবিকরা প্রায় একশো ষাট কিলোমিটার লম্বা একটি আইসবার্গ দেখেছিল। আর ১৯৬৫ সালে রুশ নাবিকরা আন্টার্কটিকার এন্ডারবি ল্যান্ডের কাছে প্রায় একশো চল্লিশ কিলোমিটার লম্বা আর পাঁচহাজার বর্গকিলোমিটার মাপের একটি আইসবার্গ দেখেছিল।
বরফের এই প্লাস্টিক ফ্লোর জন্যেই ড্রিলিং-এর কাজটা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। ড্রিল করা গর্তটা পুরোপুরি খাড়া না থেকে বেঁকে যেতে চায়। সেসব দিকে নজর রেখেই আমরা ড্রিলিং এর কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।
আমাদের দলের নিয়ম হচ্ছে কেউ একা কোথাও ক্যাম্প ছেড়ে বেরোবে না। অন্তত দুজন সবসময় যেন একসঙ্গে থাকে। তাই ওরা পাঁচজন দুটো দলে ভাগ হয়ে হাঁটা শুরু করল দু-দিকে। আমি বললাম, ওরা যেন মোটামুটিভাবে দু-তিন কিলোমিটারের বেশি দূরে না যায়।
বরফের ওপরে নানানদিকে পায়ের ছাপের চিহ্ন। আমাদেরই হাঁটা-চলার প্রমাণ। এর মধ্যে পবনের পায়ের ছাপ আলাদা করে বোঝার কোনও উপায় নেই। সুতরাং, খানিকটা আন্দাজে ভর করে এলোমেলো খোঁজ করাটাই একমাত্র পথ।
ওরা রওনা হয়ে পড়লে আমি হাঁটা দিলাম টয়লেটের দিকে।
টয়লেট বলতে ক্যাম্প থেকে বিশ-পঁচিশ মিটার দূরে বরফের পাঁচিল দিয়ে ঘেরা একটি বড়সড়ো জায়গা। টয়লেটে যেতে হলে আইস অ্যাক্স হাতে নিয়ে যেতে হয়। ভালো করে গর্ত খুঁড়ে কাজ সেরে আবার সেটা ঢেকে দিতে হয় বরফ দিয়ে। আন্টার্কটিকার এই অঞ্চলে যেরকম ঘন-ঘন তুষারঝড় হয় তাতে মাঝে-মাঝেই টয়লেটের বরফ ড্রেসিং করতে হয় আমাদের।
এই অঞ্চলটায় ঘন-ঘন তুষারঝড়ের মূল কারণ টেম্পারেচার ইনভারশন। সাধারণত যে চাপের তফাত দিয়ে বায়ুপ্রবাহের ব্যাখ্যা করা হয়, সে-ব্যাখ্যা এখানে খাটে না। তাই এই ঝোড়ো বাতাসকে ইনভারশন উইন্ড বলা হয়। আন্টার্কটিকার সারফেস উইন্ড-কে তাই এককথায় অভিনব বলা যেতে পারে।
টয়লেটে আমি যে এলাম তার প্রধান কারণ এই জায়গাটা তন্নতন্ন করে কেউ খোঁজেনি। ওরা এখানে এসে খুঁজেছে পবন শর্মাকে। আর আমি খুঁজতে এসেছি…যা খুঁজতে এসেছি তা খুঁজে পেলাম।
টয়লেট এনক্লোজারের ভেতরে বরফের পাঁচিল ঘেষে কয়েক ফোঁটা রক্তের দাগ। এখন জমে হিম হয়ে গেছে।
হাত দিয়ে পরখ করে বুঝলাম, উকিলসাহেবের বুকে যে-চিহ্ন দেখেছি, এগুলোও তাই।
তা হলে কি পবন শর্মাকে কেউ খুন করেছে?
এ কথা ভাবতেই আন্টার্কটিকার শীত ভুলে গিয়ে অন্যরকম শীতে আমি কেঁপে উঠলাম।
কে জানে, বাকি পাঁচজনও হয়তো এই খারাপ প্রশ্নটার কথাই মনে-মনে ভাবছে।
আমি তাড়াতাড়ি ফিরে চললাম ক্যাম্পের দিকে। একটা আইস অ্যাক্স নিয়ে এসে টয়লেটের নানান জায়গা খুঁড়ে দেখতে হবে।
পবন শর্মার ডেডবডি অথবা খুনের অস্ত্রটা আমি খুঁজে পেতে চাই।
কিংবা দুটোই।
.
০২.
রাতে ডিনারের সময় সকলের মধ্যেই কেমন একটা চাপা টেনশন টের পেলাম।
টিনের খাবার ফুটিয়ে অদিতি আর সুজাতাই গ্যাসের স্টোভে রান্নাবান্না করেছে, আর ছাত্র রাঁধুনি হিসেবে সুরেন্দ্র নায়েক ওদের সঙ্গে হাত লাগিয়েছিল।
রান্না বেশ ভালো হওয়া সত্ত্বেও কারও মধ্যে খুশির মেজাজ নেই। সকলেই অদ্ভুতরকম চুপচাপ।
নিস্তব্ধতা যখন পুরু চাদরের মতো চেহারা নিয়েছে তখন রোহিত তার ওপরে কথার ছুরি চালাল।
দাদা, পবন শর্মাকে তা হলে আর পাওয়া যাবে না?
আমি কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বললাম, বোধহয় আর পাওয়া যাবে না। কারণ, ও আর নেই।
অদিতি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। কিন্তু কয়েকটা হেঁচকির মতো শব্দ তুলেই ও দাঁতে দাঁত চেপে কান্নাটাকে থামাল।
পবনের সঙ্গে ওর দারুণ বন্ধুত্ব ছিল। শুধু বন্ধুত্ব কেন–তার চেয়েও কিছু বেশি। ওরা সবসময় একসঙ্গে থাকতে ভালোবাসত। অনেকসময় মাঝরাতে ঘুম ভেঙে দেখেছি, ওরা দুজনে পবনের কেবিনে খুব ঘন হয়ে বসে গল্প করছে। আন্টার্কটিকার এই নির্জনতা মানুষকে বড় তাড়াতাড়ি কাছাকাছি নিয়ে আসে।
কাজের ফাঁকে বাড়তি সময় পেলেই পবন অদিতিকে তাসের ম্যাজিক শেখাত। আর লখনউ-এর মেয়ে অদিতি পবনকে ক্লাসিক্যাল গান নিয়ে জ্ঞান দিত। সেই জ্ঞানের পরিণাম হিসেবে পবন এমন সব বেসুরো গান গাইত যে, আমরা হেসে কুটিপাটি। তার ওপর ওর ফেবারিট গান ছিল সারে জহাঁসে আচ্ছা–তাও আবার জনগণমন অধিনায়ক-এর সুরে। কাজটা এত কঠিন ছিল যে, আমরা অনেকে বহু চেষ্টা করেও গানটা ওই ঢঙে গাইতে পারিনি। তাই আমরা এই গানটার নাম দিয়েছিলাম পবন স্পেশাল।
আমি গলাখাঁকারি দিয়ে বললাম, আমি দুপুরে আমাদের স্টোরে চিরুনি তল্লাশি চালিয়েছি। গুনতিতে একটা আইস অ্যাক্স কম আছে।
চন্দ্ৰেশ্বর সিগারেট খাচ্ছিল। ও নস্যিও নেয়, খইনি খায়, পান কিংবা পানপরাগেও আপত্তি নেই। জিগ্যেস করলেই বলে, মস্তু চিজ হ্যায়–লাজবাব।
আমরা ঠাট্টা করে বলি ভগবান ওকে যাবতীয় নেশা করার জন্যেই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তা থেকে যেটুকু অবসর পায় সেই সময়টায় ও ভূতত্ত্বচর্চা করে। তাতে ও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলে, না, আমি দুটোই একসাথ করি।
