আমি ওকে বাধা দিয়ে বলেছিলাম, বড়সড়ো সাপ-টাপ, মানে, রেপটাইলও থাকতে পারে, পবন। অবশ্য আছে কি না সেটা বোঝা যাবে আর চার-পাঁচদিনের মধ্যেই। কারণ, ড্রিলিং-এর মিটার রিডিং দেখে যেসব ক্যালকুলেশন আমি আর রোহিত করেছি তাতে আমরা শিওর যে, আর চার-পাঁচদিন এইভাবে ড্রিল করে গেলে আমরা আইস শিট পেনিট্রেট করে লেক এক্স-এর জলে পৌঁছে যাব।
পবন আমার শেষ কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিল না। কেমন একটা অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে ছিল।
তারপর, বেশ কয়েক সেকেন্ড পর, বিড়বিড় করে বলল, সাপ-টাপ…রেপটাইল…যদি ওটা ড্রিলিং হোল দিয়ে ওপরে উঠে আসে!
আমি হেসে বলেছিলাম, এতটা কল্পনা করা ঠিক নয়, পবন। তবে রেপটাইল ইজ আ পসিবিলিটি।
পবন শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে চাপা গলায় বলে উঠেছিল, ও মাই গড!
পরদিনই জেনেছিলাম, ওর এই ভয়ের কথাটা ও অনেককেই বলেছে। আরও বলেছে, ইমিডিয়েটলি ড্রিলিং বন্ধ করা উচিত।
কিন্তু আমি সে-কথায় গা করিনি। কারণ, এই কুমেরুতে এসে এই প্রবল ঠান্ডায়, বরফে ঢাকা নির্জন প্রান্তরে অনেকেরই মানসিক দোলাচল দেখা দেয়। ভারসাম্য হারিয়ে ফেলার দুটো ঘটনাও ঘটেছে গত তিরিশ বছরের নানান অভিযানে। পবনের কি সেরকম গোলমাল কিছু হল?
কিন্তু ড্রিলটা চালু অবস্থায় রেখে ও তো কোথাও যাবে না! ওর দায়িত্ববোধ আমাদের কারও চেয়ে কিছু কম ছিল না।
সুজাতাকে বললাম যে, পবন শর্মার ওই ভয়ের ব্যাপারটা আমিও জানি। তবে ও যে হঠাৎ করে কোনও ছেলেমানুষি কাজ করে বসবে না সে-বিশ্বাস আমার আছে।
রোহিতের গলায় বাইনোকুলার ঝুলছিল। সেটা চেয়ে নিয়ে আমি সিলিং ছোঁওয়া মইটার কাছে এগিয়ে গেলাম। বাকিদের বললাম, আমি ড্রিল-হাউসের চালে উঠে একবার চারপাশটা দেখে আসি যদি কোনও ট্রেস পাওয়া যায়।
মই বেয়ে একেবারে ড্রিল-হাউসের চালের কাছে পৌঁছে গেলাম। সেখানে একটা চৌকোনা কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি একটা হ্যাঁচ রয়েছে। জোরে চাপ দিতেই হ্যাঁচ খুলে গেল। কয়েকটা বরফের টুকরো খসে পড়ল আমার গায়ে-মাথায়। ঠান্ডা ঢুকে পড়ল চৌকো ফোকর দিয়ে। ওপরের উজ্জ্বল নীল আকাশও দেখা গেল–ঠিক যেন নীল-রঙা এক ডাকটিকিট।
এই হ্যাচটা মাঝে-মধ্যে ভোলা হয় বলে বরফ তেমন পুরু হয়ে জমেনি। শরীরটা হ্যাঁচের ফোকর দিয়ে গলিয়ে বাইরে খানিকটা নিয়ে আসতেই চোখে পড়ল চালের অন্যান্য জায়গায় বরফ বেশ পুরু।
একটা আয়রন গ্রেটিং-এর ওপরে সাবধানে দাঁড়িয়ে শরীরটা সোজা করলাম। ফলে আমার কোমর পর্যন্ত এখন চালের বাইরে। সেই অবস্থায় বাইনোকুলার চোখে দিয়ে নজর চালালাম চারপাশে।
যতদূর চোখ যায় শুধু বরফ আর বরফ। তারই মধ্যে বরফের ঢেউ ওঠা-নামা করেছে– অনেকটা মরুভূমির মতন।
আন্টার্কটিকার আবহাওয়া এত বিশুদ্ধ আর বাতাস এত পরিষ্কার যে, আমাদের মতো শহুরে মানুষের পক্ষে কোনও কিছুর দূরত্ব আঁচ করা একরকম অসম্ভব। তবুও আমার ধারণা, আমি প্রায় তিরিশ-পঁয়তিরিশ কিলোমিটার পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছিলাম। ঠান্ডা হাওয়ায় আমার শরীরের ভেতর পর্যন্ত কেঁপে যাচ্ছিল। আঙুলের ডগাগুলো প্রায় অসাড়। তা সত্ত্বেও ধীরে-ধীরে নজর বোলালাম চারপাশে।
কেউ কোত্থাও নেই!
শুধু চোখে পড়ছে বাঁশের কঞ্চির ডগায় দাঁড়িয়ে থাকা কতকগুলো কমলা রঙের পতাকা, আর লাল রঙের খালি প্লাস্টিকের ড্রাম–তার অনেকটাই বরফে ঢেকে গেছে। আন্টার্কটিকার বরফের সমুদ্রের মধ্যে পথের হদিশ পাওয়া খুব মুশকিল বলে পথ বরাবর নিশানা দিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। ওগুলো সেই নিশানা–আমাদের তিন নম্বর ক্যাম্পে যাওয়ার পথ।
এ ছাড়া কৃত্রিম পেঙ্গুইন রুকারিটাও চোখে পড়ল।
বৃত্তাকারে নজর ঘোরানো যখন শেষ করলাম তখন আমার আল্লকা গালদুটো জমে হিম হয়ে গেছে। আঙুলের ডগাগুলো টনটন করছে। চোখের কোল বেয়ে জল গড়িয়ে নামছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর নামতে পারেনি–গালের ওপরে জমে বরফ হয়ে গেছে।
আমি আর পারছিলাম না। হ্যাঁচ বন্ধ করে নেমে এলাম, তারপর মই বেয়ে সোজা নীচে। চোখ তুলে তাকাতেই দেখি পাঁচজনের চোখে নীরব প্রশ্ন।
তার উত্তরে মাথা নাড়লাম আমি। তাতেই ওরা বোধহয় বুঝে গেল পবনকে আর কোনওদিনই পাওয়া যাবে না।
আমি একটুও দমে না গিয়ে বললাম, অন্তত আরও দু-ঘণ্টা আমরা পবনকে খুঁজব। তারপর ফাইনাল ডিসিশান নেব। আপাতত বেস ক্যাম্পকে কিছু জানাব না। তবে ড্রিলিং-এর কাজ পালা করে চালিয়ে যাব। লেক এক্স-এর জলে আমাদের পৌঁছতেই হবে। এটা একটা চ্যালেঞ্জ। একটু থেমে চন্দ্ৰেশ্বরকে লক্ষ করে বললাম, পবনকে খোঁজা শেষ হলে তুমি ড্রিলিং ডিউটি শুরু করবে, গুপ্তা। ও.কে, নাউ লেটস মুভ।
ড্রিল-হাউসের বাইরে বেরিয়ে আমরা ছড়িয়ে পড়লাম আশেপাশে। যেদিকে চোখ যায় বরফ, শুধুই বরফ।
অনেকটা কচ্ছপের পিঠের মতো এই পোল অফ ইনঅ্যাসেসিবিলিটি। এখান থেকে বরফের ঢল নেমে গেছে উপকূলের দিকে। আন্টার্কটিকার তুষারক্ষেত্রের মোট এলাকা প্রায় সাড়ে তেরো মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার–ভারতের আয়তনের চারগুণেরও বেশি। এই বিশাল এলাকার জমাট বরফ কিন্তু থেমে নেই–খুব ধীরে প্রবাহিত হয়ে চলেছে। তবে এই প্রবাহ ঠিক তরলের প্রবাহের মতো নয় বরং ধাতু বা শিলার মতো ক্রিস্টালাইন পদার্থের প্রবাহ যাকে আমরা সায়েন্টিস্টরা বলি প্লাস্টিক ফ্লো।
