আমি হাতের ইশারা করতেই সুরেন্দ্র আর চন্দ্ৰেশ্বর ঝাঁপিয়ে পড়ল দরজার ওপরে।
অদিতির হাতে একটা আইস অ্যাক্স চোখে পড়ল। বোধহয় সাধারণ ধাক্কায় কাজ না হলে ওটা দরজার ওপরে ব্যবহার করবে।
অবশ্য তার আর দরকার হল না। দুবারের চেষ্টাতেই ড্রিল-হাউসের দরজা ভেঙে গেল। আমরা ছজন বলতে গেলে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লাম ভেতরে।
এবং ঢুকেই থমকে দাঁড়ালাম।
কারণ, ড্রিল-হাউসে কেউ নেই।
ড্রিল-হাউসে ঢুকতেই কেমন একটা অদ্ভুত অনুভব মনে ছেয়ে গেল।
বিশাল উঁচু একটা কুৎসিত জটিল যন্ত্র। তাকে ঘিরে অন্যান্য ধাতুর কাঠামো। একটা অ্যালুমিনিয়ামের মই সটান উঠে গেছে একেবারে ড্রিল-হাউসের চালের কাছে। ড্রিলের ফ্রেমটাকে নানাদিক থেকে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে যাতে তুষারঝড়ে ড্রিল-হাউসের দেওয়াল পড়ে গেলেও ড্রিলটা অক্ষত থাকে।
ইঞ্জিন-জেনারেটরের শব্দ, ড্রিলের শব্দ আমাদের কানে তালা ধরিয়ে দিচ্ছিল। আর শব্দ তরঙ্গগুলো যেন সত্যি-সত্যি গায়ে এসে ধাক্কা মারছিল।
সব মিলিয়ে মনের মধ্যে এমন একটা তোলপাড় হল যে, আমার রবীন্দ্রনাথের মুক্তধারা-র কথা মনে হল। মনে হল, যন্ত্রকে আমরা চালাচ্ছি, না যন্ত্র আমাদের চালাচ্ছে।
আমি চোখের গগল্স কপালে তুলে দিলাম, তারপর চন্দ্রেশ্বরের কানের কাছে মুখ নিয়ে চেঁচিয়ে বললাম, জেনারেটরের ব্রেকার অফ করে দাও।
ড্রিল-হাউসের এক কোণে ভারী বেস প্লেটের ওপরে ইনস্টল করা রয়েছে ইঞ্জিন-জেনারেটর সেট। তার পাশে গোটাদশেক লাল রঙের ফুয়েল ড্রাম। ড্রাম থেকে প্রায় পনেরো ফুট দূরে ব্রেকার, সুইচ, অ্যামমিটার, ভোল্টমিটার এইসব নিয়ে ছোট একটা প্যানেল। চন্দ্ৰেশ্বর সেদিকে এগিয়ে গেল। অফ করে দিল জেনারেটরের ব্রেকার।
মুহূর্তে সমস্ত শব্দ থেমে গেল। জেনারেটরের শক্তি নিয়ে যে-চারটে টিউব লাইট জ্বলছিল সেগুলো নিভে গেল। তবে দেওয়ালের তক্তার ফাঁকফোকর দিয়ে কিছু আলো উঁকি মারছিল ভেতরে। এ ছাড়া ভাঙা দরজা দিয়ে বেশ খানিকটা আলো ঢুকে পড়েছিল। তবুও কেমন একটা আবছা অন্ধকার যেন নেমে এল ড্রিল-হাউসে। একইসঙ্গে শীতটাও বোধহয় বেড়ে গেল।
এখন সময়টা জানুয়ারির শুরু। অতএব সূর্য সবসময়েই আকাশে। একুশে ডিসেম্বর সূর্যটা দিগন্ত থেকে নির্দিষ্ট একটা উচ্চতায় চক্রাকারে ঘুরপাক খেয়েছিল। ফলে দিনে বা রাতে সূর্যের আলোয় এতটুকু হেরফের হয়নি। তার পরদিন থেকেই রাত বারোটায় ঠিক দক্ষিণ দিক বরাবর সূর্য একটু করে নেমে যায়। তারপর দিগন্ত বরাবর আকাশ পরিক্রমা করতে করতে দুপুর বারোটায় ঠিক উত্তরের আকাশে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছয়। অর্থাৎ, সূর্য সবসময়েই আকাশে–তবে উত্তর দক্ষিণ বরাবর কাত হয়ে ঘোরে।
ভাঙা দরজা দিয়ে ঢুকে-পড়া আলো ভরসা করে আমরা পবন শর্মাকে খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু আমার মন বলছিল ওকে আর পাওয়া যাবে না। তবুও আমরা ওর নাম ধরে বেশ কয়েকবার ডেকে উঠলাম।
কিন্তু কোনও উত্তর পেলাম না।
আধঘণ্টা ধরে তন্নতন্ন করে খুঁজেও পবন শর্মার কোনও হদিশ পেলাম না আমরা। আমাদের দলের ইন্সট্রুমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার যেন স্রেফ হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
সুরেন্দ্র নায়েক আমার মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। কথা বলার সময় ওর নাক-মুখ দিয়ে ধোঁয়া বেরোতে লাগল। এখন উষ্ণতা মাইনাস তিরিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস–আন্টার্কটিকার উষ্ণতম সময়। অথচ আমরা শীতে কঁপছি।
চিফ, ড্রিল-হাউসের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করল কে? পবন শর্মা?
আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম, আর কে হতে পারে। আমরা বাকি ছজন ড্রিল-হাউসের বাইরে ছিলাম…।
অদিতি মাথা নাড়ল সূর্যদা, পবন ড্রিল-হাউসের দরজা বন্ধ করবে কেন? এখানে তো কিছু চুরি যাওয়ার ভয় নেই!
সেটাই তো অবাক লাগছে, অদিতি– আমি গ্লাভস পরা হাত দুটো ঘষলাম : ড্রিল চালু রেখে পবন উধাও হল কোথা দিয়ে? আর কেনই বা হল? তা ছাড়া ওই অ্যাডেলি পেঙ্গুইনটার গায়ে রক্তের ছিটেগুলো মিথ্যে নয়…।
রোহিত বলল, দাদা, পবন কি দরজা বন্ধ করে ড্রিলটাকে নিয়ে কোনও লটঘট করতে চাইছিল?
কী লটঘট করবে? আমি অবাক হয়ে রোহিতের দিকে তাকালাম।
উত্তরে সুজাতা বলল, যাতে আর ড্রিল না করা যায়…।
আমি চমকে সুজাতার দিকে ফিরে তাকালাম। আমাদের ড্রিলিং-এর কাজ বন্ধ হলে পবনের কী লাভ?
সেকথাই জিগ্যেস করলাম ওকে।
উত্তরে ও যা বলল তা বেশ রোমাঞ্চকর।
পবন শর্মার বিশ্বাস ছিল, ড্রিল করে আমরা যেই লেক এক্স-এর জলে পৌঁছব অমনই ঘটে যাবে এক বিপর্যয়। প্রাগৈতিহাসিক কোনও সরীসৃপ হয়তো ক্ষিপ্র গতিতে ড্রিলিং শ্যাফ্ট বেয়ে উঠে আসবে। তারপর এই বরফে ঢাকা ধু-ধু প্রান্তরে আমাদের বেঘোরে প্রাণ দিতে হবে।
পবন খুব ফুর্তিবাজ ছেলে ছিল। তবে ওর মধ্যে খ্যাতির লোভ ছিল। নিজের লাভ ক্ষতি নিয়ে বড় বেশি ভাবত।
এই তো, গত পরশু রাতে খাওয়ার সময় ও হঠাৎই আমাকে জিগ্যেস করেছিল, ডক্টর সেন, এবারের এক্সপিডিশন আর রিসার্চ নিয়ে আমরা যে-রিসার্চ পেপার লিখব তাতে সবার নাম থাকবে নিশ্চয়ই?
আমি বলেছিলাম, অবশ্যই থাকবে।
তখন ও খুশি-খুশি মুখে বলেছিল, চিফ, তা হলে দারুণ ব্যাপার হবে, বলুন। সারা পৃথিবী আমাদের নাম জেনে যাবে। পাঁচ লক্ষ বছর ধরে আইসোলেটেড একটা লেকের জল নিয়ে আমরাই প্রথম রিসার্চ করব। সেই জলের পোকামাকড়, ব্যাকটিরিয়া।
