আমরা যখন এই লেকের সন্ধান পেলাম তখন প্রথম প্রশ্ন হল, প্রায় পাঁচ লক্ষ বছর ধরে যে-লেক স্টেরাইল অবস্থায় পড়ে আছে, তাকে হঠাৎ করে এখনকার আবহাওয়ার ছোঁয়াচ লাগতে দেওয়াটা ঠিক হবে কি না। আবার বিপরীত প্রশ্নটাও বেশ জটিল ছিল? যদি কোনও প্রাগৈতিহাসিক জলচর প্রাণী ওই হ্রদে থেকে থাকে তা হলে তাদের বন্দিদশা থেকে মুক্তি দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে কি না।
যাই হোক, বহু বাকবিতণ্ডার পর, সংসদে বহু উত্তপ্ত চাপান-উতোরের পর বিজ্ঞানের জয় হয়েছিল। সবাই একমত হয়ে বলেছিল যে, বিপদ যা আসে আসুক, বরফের গভীরে গিয়ে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান চালানোটাই বড় কথা।
তারপর থেকে আমরা একটানা এই গর্ত খোঁড়ার কাজ করে যাচ্ছি। এবং সেই কাজ এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে।
এবারের অভিযানে আমি দলনেতা। তবে রোহিত চিরিমার অপারেশন লেক এক্স-এর শুরু থেকে আছে–তার আগেও দুবার ও এই হিমশীতল অঞ্চলে ড্রিলিং অপারেশনের দায়িত্বে ছিল। ফলে অভিজ্ঞতা ওর বেশি। সেইজন্যেই ওর মতামতকে আমি বেশ গুরুত্ব দিই। আর সেটা রোহিত জানে।
ভারী বুট দিয়ে বরফ মাড়িয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম ক্যাম্পের কাছে।
অ্যালুমিনিয়াম আর কাঠ দিয়ে তৈরি আমাদের মূল শিবির। এ ছাড়া দরকার মতো অস্থায়ী শিবিরের জন্যে ব্রিটিশ আন্টার্কটিক সার্ভে থেকে আমরা লাল রঙের পিরামিডের চেহারার কয়েকটা তবু কিনে এনেছি। এই তাঁবুগুলো ঘণ্টায় দুশো কিলোমিটার গতিবেগ পর্যন্ত তুষারঝড় সইতে পারে। শদেড়েক মিটার দূরে সেরকম একটা শিবির চোখে পড়ছে। ওটা আমাদের দলের মাইক্রোবায়োলজিস্ট অদিতি প্রধানের গবেষণাগার। ড্রিলিং অপারেশনে যে-বরফ উঠে আসছে তার মধ্যে সূক্ষ্ম প্রাণের সন্ধান করে চলেছে অদিতি।
ক্যাম্প থেকে হাতদশেক দুরেই ড্রিল-হাউস। সেখানে সবচেয়ে আধুনিক সবচেয়ে দামি কোর ড্রিল চলছে। ড্রিলিং-এর ধকধক আওয়াজ দুস্তর বরফে ঢাকা শ্বেত-শুভ্র শান্ত মহাদেশকে যেন শব্দের ঝড়ে ঝাঁকুনি দিয়ে চলেছে।
এখন ড্রিল-হাউসে ডিউটিতে আছে পবন শর্মা আমাদের দলের ইন্সট্রুমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার। একটানা ছঘণ্টা ওর ডিউটি সকাল আটটা থেকে বেলা দুটো। তারপর আমার পালা–আবার ছঘণ্টা। সন্ধের পর ড্রিলের বিশ্রাম, যদিও আমাদের বিশ্রাম নেই। মাপজোখের কাজ, গভীর স্তর থেকে তুলে নিয়ে আসা আইস কোর-এর স্যাপ্ল স্টেরিলাইজড কনটেনারে রেখে তার গভীরতা গায়ে লিখে রাখা, সেই বরফের কেমিক্যাল অ্যানালিসিস, তার কার্বন-ফোরটিন ডেটিং–এসব চলতে থাকে। বিশবছর আগেও কার্বন-ফোরটিন ডেটিং-এর শতকরা নব্বই ভাগ সঠিক উত্তর পেতে প্রায় একহাজার কিলোগ্রাম স্যাপ্ল লাগত। এখন লাগে এক কিলোগ্রামেরও কম। তা থেকেই বিশ্লেষণ করে জানা যায় ওই বরফের স্তর কত হাজার বা লক্ষ বছরের পুরোনো।
আমরা তিনজন ড্রিল-হাউসের কাছে পৌঁছলাম। কনকনে ঠান্ডা বাতাস হাড় পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। ড্রিল-হাউসের সারা গায়ে আন্টার্কটিকায় তুষারঝড়ের চিহ্ন। কোথাও ধাতুর পাত তুবড়ে গেছে, কোথাও আবার কাঠের দেওয়াল কমজোরি হয়ে খসে পড়ায় তার ওপরেই অন্য কাঠের তক্তা পেরেক ঠুকে এঁটে দেওয়া হয়েছে। মাসপাঁচেক আগে বাড়িটার মাথায় একটা অ্যালুমিনিয়াম রডের সঙ্গে একটা ন্যাশনাল ফ্ল্যাগ বেঁধে উড়িয়ে দিয়েছিলাম–এখন সেটা বরফে ঢেকে শক্ত হয়ে গেছে…যেন একটা ভাস্কর্য।
ড্রিল-হাউসের দরজায় ধাক্কা দিলাম। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ!
তখন চন্দ্ৰেশ্বরকে বললাম, পবন ভেতরেই আছে কিন্তু দরজা বন্ধ কেন? তুমি বরং বাকিদের ডেকে জোগাড় করো।
চন্দ্ৰেশ্বর হাঁটা দিল ক্যাম্পের দিকে।
রোহিত বলল, দাদা, আমি অদিতিকে ডেকে নিচ্ছি। বলেই অদিতির তাবুর দিকে এগোল।
আমার দলের প্রতিটি সদস্যের একটা জায়গায় খুব মিল–ওরা সকলেই কাজ করতে ভালোবাসে।
ড্রিল-হাউসের ভেতর ইঞ্জিন-জেনারেটর সেট আর কোর ড্রিলের বিকট শব্দ শোনা যাচ্ছিল। বাড়িটার দেওয়ালগুলো কাঁপছিল থরথর করে।
কিন্তু পবন ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করল কেন!
ড্রিল-হাউসের দরজা বন্ধ করে তো আমরা কাজ করি না! আর এখান থেকে বেরোনোর অন্য কোনও দরজাও তো নেই!
এলোমেলো চিন্তা শুরু হয়ে যাচ্ছিল। অ্যাডেলি পেঙ্গুইনটার বুকের রক্তের ছিটের সঙ্গে কি এই বন্ধ দরজার কোনও সম্পর্ক আছে?
আরও কিছু ভেবে ওঠার আগেই ওরা সবাই আমার পাশটিতে এসে হাজির।
চন্দ্ৰেশ্বর আর রোহিত বাকি তিনজনকে খুঁজে পেতে নিয়ে এসেছে।
দলে আমরা মোট সাতজন। ছজন ড্রিল-হাউসের বাইরে–একজন ভেতরে।
আমি ওদের পেঙ্গুইনটার কথা বললাম। তারপর চেঁচিয়ে পবনের নাম ধরে ডাকতে শুরু করলাম। যদিও বুঝতে পারছিলাম, এভাবে ডেকে লাভ নেই। কারণ, ভেতরের ওই আওয়াজ ছাপিয়ে ওর পক্ষে কোনও কিছু শোনা বোধহয় সম্ভব নয়।
সুরেন্দ্র নায়েক এগিয়ে এসে আমার পিঠে হাত রাখল, বলল, এভাবে ডেকে লাভ নেই, চিফ ভেতরে কিছু শোনা যাবে না। লেটস ব্রেক ও দ্য ব্লাডি ডোর।
সুরেন্দ্র আমাদের দলের কেমিস্ট–লো টেম্পারেচার কেমিস্ট্রি ওর গবেষণার বিষয়। ভারী চেহারা, গালে চাপদাড়ি, গোঁফও মানানসই। শুরু থেকেই লক্ষ করেছি, চটপট সিদ্ধান্ত নিয়ে গায়ের জোরে কাজ করতে ভালোবাসে।
সুরেন্দ্রর কথায় সায় দিল রোহিত চিরিমার আর অদিতি প্রধান। তবে আমাদের দলে আর একটি যে মেয়ে রয়েছে–মেরিন বায়োলজিস্ট সুজাতা–দেখলাম ওর মুখে কেমন যেন একটা ভয়ের ছায়া নেমে এসেছে।
