ওই রুকারি থেকেই উকিলসাহেব কিংবা তার দু-চারজন জাতভাই আমাদের ক্যাম্পের কাছে। ঘোরাঘুরি করতে আসে।
আমরা যে-অভিযানের দায়িত্ব নিয়ে এবারে আন্টার্কটিকার এসেছি তাতে রক্তপাতের কোনও সিন নেই। তাই এই রক্তপাতের ঘটনাটা আমাকে বেশ ধাক্কা দিয়েছে।
রোহিত কী ভেবে বলল, সুজাতা পেঙ্গুইন নিয়ে কোনও এক্সপেরিমেন্ট করছে না তো?
আমি ওর দিকে তাকালাম। গগলস-এর গাঢ় রঙের কাঁচে আন্টার্কটিকার ধু-ধু বরফ-ঢাকা প্রান্তরের ছায়া। রোহিতের চোখ দেখা যাচ্ছে না। সারা শরীর হলুদ রঙের ভারী জ্যাকেটে ঢাকা। মাথায় হলুদ টুপি। লালচে ঠোঁটের ওপরে ঝাটার মতো গোঁফ। গোঁফটা আর্মির প্রতীক হলেও হতে পারে। তবে আন্টার্কটিকার এসে প্রত্যেকেরই গোঁফ আমার খুব কাজে লেগেছে। সুকুমার রায় ঠিকই বলেছিলেন : গোঁফ দিয়ে যায় চেনা। কারণ, সারা শরীর শীতের পোশাকে ঢেকে চোখে জাম্বো গগল্স পরে পুরুষগুলো যখন এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায় তখন গোঁফ দেখেই আমি তাদের চিনে নিতে পারি।
রোহিতের কথার জবাবে আমি বললাম, তুমি তো ভালো করেই জানো রোহিত, এখানে আমাদের পেঙ্গুইন নিয়ে এক্সপেরিমেন্টের কোনও প্রোগ্রাম নেই। থাকলে টিম লিডার হিসেবে সেটা আমি জানতাম।
রোহিত ঘাড় নাড়ল।
চন্দ্ৰেশ্বর বলল, আমাদের কেউ তা হলে উন্ডেড হয়েছে।
হতে পারে। কিন্তু পেঙ্গুইনটার সামনে কীভাবে উন্ডেড হল সেটাই ভাবছি.. আমি বললাম, এখন আমাদের প্রোগ্রাম প্রায় শেষের দিকে। এখন যদি কোনও ঝামেলা হয় তা হলে লেক এক্স-এর জল নিয়ে রিসার্চের প্ল্যান একেবারে ওলটপালট হয়ে যাবে।
আন্টার্কটিকায় চারপাশের সমুদ্রতট থেকে যে-অঞ্চলটি সবচেয়ে দূরে, তারই নাম পোল অফ ইনঅ্যাসেসিবিলিটি। বৃত্তের কেন্দ্র যেমন পরিধি থেকে সবচেয়ে দূরের বিন্দু, অনেকটা সেইরকম। এই অঞ্চলের গভীরে বরফ আর পাথরের স্তরের মাঝে খুঁজে পাওয়া লেক এক্স সত্যিই এক রহস্যময় হ্রদ। হিসেব করে যা দেখেছি তাতে অনায়াসে বলা যায়, লেক এক্স রয়েছে সমুদ্রতলেরও কয়েকশো মিটার নীচে। এই হ্রদের জল কেউ কখনও চোখে দেখেনি, কেউ জানে না কোন রহস্যময় প্রাণিজগৎ বেঁচে রয়েছে সেই লুকোনো হ্রদে। হয়তো এই হ্রদের জল থেকেই পাওয়া যাবে প্রাগৈতিহাসিক যুগের নতুন ইতিহাস। নতুন কোনও জীবন্ত প্রমাণ খুঁজে পাব আমরা।
এই লেকটার সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল বেশ আকস্মিকভাবেই।
বছরচারেক আগে আন্টার্কটিকায় রাশিয়া ও ভারতের একটি যৌথ অভিযান হয়েছিল। অভিযানের লক্ষ ছিল কুমেরু মহাদেশের পোল অফ ইনঅ্যাসেসিবিলিটি অঞ্চলে বরফের স্তরের গভীরতা মাপা, ওই অঞ্চলের অতীত আবহাওয়ার খোঁজখবর করা, এবং সম্ভাব্য খনিজ সম্পদের অনুসন্ধান করা।
কাজটা মোটেই সহজ ছিল না, কারণ আন্টার্কটিকায় বরফের স্তর অস্বাভাবিকরকম পুরু। পৃথিবীর মিষ্টিজলের শতকরা পঁচাত্তরভাগই এখানে জমে বরফ হয়ে আছে। আর বরফ রয়েছে পৃথিবীর মোট বরফের শতকরা নব্বই ভাগ। এখানকার বরফের গভীরতা কোথাও কোথাও প্রায় পাঁচ কিলোমিটারের কাছাকাছি! তবে গড় গভীরতা আড়াই কিলোমিটার। আর আন্টার্কটিকার তুষারক্ষেত্রে বরফের আয়তন প্রায় ঊনতিরিশ মিলিয়ন ঘন কিলোমিটার। এই বিশাল হিমবাহের ওজনে কুমেরু অঞ্চলের ভূপৃষ্ঠ প্রায় ছশো মিটার নীচে নেমে গেছে। যদি কোনওভাবে এই বরফকে গলিয়ে ফেলা যায়, তা হলে সারা পৃথিবীর সমুদ্রতল ষাট মিটার উঁচু হয়ে যাবেফলে বেশিরভাগ বন্দরই জলে ডুবে যাবে।
আমাদের এই প্রকল্পের কাজ যখন শুরু হয় তখন পর্যন্ত বরফস্তরে ড্রিল করা হয়েছে মোটামুটিভাবে দু-কিলোমিটার পর্যন্ত। ব্রিটিশ ও মার্কিন গবেষক দল এই ড্রিলিং-এর কাজ চালিয়েছিল। কিন্তু বরফের নীচে লুকিয়ে থাকা কোনও হ্রদের সন্ধান তারা পেয়েছে বলে শোনা যায়নি।
দু-বছর আগে ভারত যে-অভিযান চালায় তাতেই প্রথম একটি লেকের অস্তিত্ব আঁচ করেছিল অভিযাত্রীরা। নানান জায়গায় বরফে ড্রিল করে তারপর সিজমিক শট-এর মাধ্যমে তারা ডেথ সাউন্ডিং-এর কাজ চালাচ্ছিল। আন্টার্কটিকার গভীর স্তর থেকে সেইসব বিস্ফোরণের শব্দের প্রতিফলন ধরা পড়ছিল সূক্ষ্ম যন্ত্রে। তা থেকেই বিজ্ঞানীরা বরফের নীচে লুকিয়ে থাকা বেডরক এর স্তরের খোঁজ পাচ্ছিল।
এইভাবে কাজ চালাতে চালাতে প্রায় তিনহাজার সাতশো মিটার গভীরতায় একটি জলাশয়ের সন্ধান পাওয়া যায়। গবেষণায় এও বোঝা যায়, হ্রদটির আয়তন প্রায় দশহাজার বর্গ কিলোমিটার। তখন এই অজানা হ্রদের নাম দেওয়া হয় লেক এক্স।
এর পরের অভিযানের নাম ছিল অপারেশন লেক এক্স। আর উদ্দেশ্য ছিল বরফে ড্রিল করে লেক এক্স-এর জলে পৌঁছনো। বলতে বাধা নেই, আমাদের কাজটা ড্রিলিং-এর হলেও তার আসল উদ্দেশ্য গোপন রাখার নির্দেশ আছে। তাই অন্যান্য দেশের অভিযাত্রীরা জানে আমরা সাধারণ ড্রিলিং করে গবেষণার খোরাক খুঁজছি।
পোল অফ ইনঅ্যাসেসিবিলিটি অঞ্চলে রাশিয়ার গবেষক দল কাজ করছে প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে। আন্টার্কটিকায় অতীতকালের আবহাওয়ার খবর পাওয়ার জন্যে বরফের বিভিন্ন স্তরের ফাঁকে আটকে থাকা গ্যাসের বিশ্লেষণ খুব জরুরি। রাশিয়ানরা মূলত সেই গবেষণাই করছিল, আর তার পাশাপাশি চলছিল খনিজের সন্ধান। আমাদের ধারণা, কোনও লেকের সন্ধান ওরাও আজ পর্যন্ত পায়নি।
