আন্টার্কটিকায় সতেরো রকম প্রজাতির পেঙ্গুইন পাওয়া গেলেও অ্যাডেলি পেঙ্গুইনের দেখা মেলে বেশি। এই অ্যাডেলি পেঙ্গুইনটাকে কোনও এক সময়ে একটা লেপার্ড সিল আক্রমণ করেছিল কিন্তু খতম করতে পারেনি। সেই আক্রমণের চিহ্ন হিসেবে ওর বুকের ওপর দিকটায় একটা ক্ষতচিহ্ন থেকে গেছে–জায়গাটায় ঠিকমতো পালক গজায়নি। সেই দাগ দেখেই ওকে আমি চট করে চিনতে পারি। একটু আগেই ওকে একজন সঙ্গী নিয়ে এদিকটায় ঘোরাঘুরি করতে দেখেছিলাম। কিন্তু এখন ও একা।
উকিলসাহেবের উচ্চতা বড়জোর দু-ফুট, কিন্তু হাঁটাচলা বেশ গুরুগম্ভীর। এমনিতে ওর খাদ্য ক্রিল–আন্টার্কটিকায় খুদে চিংড়ি। তবে আমাদের ক্যাম্পের কাছে ঘোরাঘুরির সময় দেখেছি টিনের কৌটো-বন্দি মাছের দু-একটুকরো দিলে দিব্যি খেয়ে নেয়।
এখন ওকে দেখে মজা পাওয়ার বদলে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। কারণ, ওর সাদা পালকের ওপরে চুনির দানার মতো বেশ কয়েক বিন্দু রক্ত লেগে রয়েছে। এই প্রবল শীতে সাবজিরো উষ্ণতায় রক্তের ছিটে ওর গায়ে লাগার পরই জমাট বেঁধে গেছে।
কিন্তু উকিলসাহেবের গায়ে রক্ত এল কোথা থেকে?
পেঙ্গুইনরা নিজেদের মধ্যে বিকট ঝগড়া করে বটে, কিন্তু রক্তারক্তি? নাঃ, ব্যাপারটা একটু তলিয়ে দেখতে হচ্ছে।
আমি উকিলসাহেবকে তু-তু করে আরও কাছে ডাকলাম। ও সে-ডাকে জুক্ষেপ না করে দাঁড়িয়েই রইল। তখন আমি খুব ধীরে-ধীরে ওর দিকে দু-পা এগিয়ে হাত বাড়ালাম–গ্লাভস পরা আঙুলের ডগায় কয়েকটা চুনির দানাকে স্পর্শ করলাম। সঙ্গে-সঙ্গে দানাগুলো খসে পড়ল বরফের ওপরে। আর উকিলসাহেব কী ভেবে কয়েক পা দূরে সরে গেল।
আমি বরফের ওপরে উবু হয়ে বসে পড়লাম। জমাট বাঁধা রক্তের ফোঁটাগুলো দু-আঙুলের ডগায় তুলে নিলাম। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নজর চালালাম ক্যাম্পের দিকে।
মাত্র পঁচিশ-তিরিশ মিটার দূরেই আমাদের ক্যাম্প এক্স স্টেশন। ক্যাম্পের বাইরে দুজন লোক কী একটা যন্ত্র নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করছে। অনুমানে মনে হল চন্দ্রেশ্বর গুপ্তা আর রোহিত চিরিমার।
আমি চেঁচিয়ে ওদের ডাকলাম।
আন্টার্কটিকার বাতাস ভারী হওয়ার জন্যে শব্দ খুব স্পষ্টভাবে শোনা যায়। ওরা আমার ডাক শুনতে পেল। আমার দিকে একপলক তাকিয়ে হাতের যন্ত্রটা রেখে দিল বরফের ওপরে। তারপর পা বাড়াল।
কাছে আসতেই দেখলাম, ঠিকই ধরেছি–চন্দ্ৰেশ্বর আর রোহিত। চন্দ্ৰেশ্বর আমাদের রিসার্চ টিমের জিওলজিস্ট–মানে, ভূতত্ত্ববিদ। আর রোহিত হল আর্মির লোক বরফ বিশেষজ্ঞ।
এবারের অভিযানে রোহিত চিরিমারের ভূমিকা খুব জরুরি। কারণ, গত তিন বছর ধরে আন্টার্কটিকার পোল অফ ইনঅ্যাসেসিবিলিটি-র কাছাকাছি যে বরফ ড্রিলিং-এর কাজ চলছে, এবারের অভিযানে সেটা শেষ হবে। প্রায় চারহাজার মিটার পুরু বরফের স্তর ভেদ করে আমরা পৌঁছে যাব–অথবা, বলা ভালো আমাদের যন্ত্র পৌঁছে যাবে–লেক এক্স-এর রহস্যময় জলে।
রোহিত আর চন্দ্ৰেশ্বর আমার কাছাকাছি এসে পৌঁছতেই আমি আঙুল তুলে অ্যাডেলি পেঙ্গুইনটার দিকে দেখালাম।
উকিলসাহেবের বুকের দিকে তাকিয়েই ওরা বুঝতে পারল আমি কী বলতে চাইছি। রোহিত পাখিটার দিকে দু-পা এগিয়ে গেল। চোখ সরু করে ওটার বুকের লাল দাগগুলো দেখতে লাগল।
আমি বললাম, রোহিত, এই যে আমার কাছে কয়েকটা স্যাল্প আছে…।
আমার গ্লাভস পরা হাতের তালুতে রক্তের দানাগুলো বলতে গেলে চোখে পড়ে-কি-পড়ে না।
চন্দ্ৰেশ্বর আমার হাতের ওপরে ঝুঁকে পড়ল ইটস ব্লাড, বস!
হ্যাঁ রক্ত। জমাট বেঁধে গেছে।
রোহিতও ঝুঁকে পড়ল ছোট্ট লাল বিন্দুগুলোর ওপরে ও কীসের রক্ত, দাদা?
চন্দ্ৰেশ্বর বলল, পেঙ্গুইনরা নিজেদের মধ্যে ইউসুয়ালি রক্তারক্তি কাণ্ড বাধায় না। তা ছাড়া, এই পেঙ্গুইনটা উন্ডেড বলেও মনে হচ্ছে না…।
আমরা যে-কথাটা উচ্চারণ করতে ভয় পাচ্ছিলাম, রোহিত সে-কথাটা উচ্চারণ করে বসল, মানুষের রক্ত নাকি, দাদা?
তুমি ঠিক পয়েন্টে হিট করেছ, রোহিত। আমি শিওর হতে চাই যে, এটা মানুষের রক্ত নয়। আর, আরও শিওর হতে চাই যে, এটা আমাদের কারও রক্ত নয়…।
ও মাই গড! আমার কথা শেষ হতে না-হতেই চাপা গলায় বলে উঠেছে চন্দ্রেশ্বর গুপ্তা, কী বলছেন আপনি!
ঠিকই বলছি। এখুনি ক্যাম্পে চলো–খোঁজ করে দেখি সবাই বহাল তবিয়তে আছে কি না। এখানে আমরা তিনজন–বাকি রইল আর চারজন। দেখি ওরা কে কোথায় আছে…।
রক্তের দানাগুলো পলিথিনের একটা স্যাপ্ল-ব্যাগে ঢুকিয়ে জ্যাকেটের পকেটে রাখলাম। তারপর আমরা তিনজনে তাড়াতাড়ি ক্যাম্পের দিকে হেঁটে চললাম। আর উকিলসাহেবও থপথপ করে একটা বরফের ঢালের দিকে এগিয়ে চলল। ওদিকে কিলোমিটারখানেক এগোলেই ও ওর রুকারি-তে পৌঁছে যাবে।
পেঙ্গুইনদের আস্তানা বা বাসস্থানকে বলে রুকারি। প্রায় বছরদশেক ধরে আমেরিকা, ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া এই অঞ্চলে পেঙ্গুইন নিয়ে বিশেষ ধরনের গবেষণা চালাচ্ছে। ওরাই যৌথ প্রচেষ্টায় বহু টাকা খরচ করে পোল অফ ইনঅ্যাকসেসিবিলিটিতে এই কৃত্রিম পেঙ্গুইন রুকারি তৈরি করেছে। বরফ গলিয়ে গর্ত তৈরি করে তার মধ্যে পাথর ফেলে গড়ে তোলা হয়েছে একটা বিশাল হ্রদ। হ্রদের পাড়ে অনেকখানি পাথুরে জায়গা। আর হ্রদের জলে নুন মিশিয়ে তৈরি করা হয়েছে নোনা জল। সেই জলে চাষ করা হচ্ছে পেঙ্গুইনদের প্রধান খাদ্য ক্রিল–আন্টার্কটিকার বিশেষ প্রজাতির চিংড়ি।
