না! ছাড়ব না! দুপাশে মাথা ঝাঁকিয়ে চিৎকার করল পলাশ।
এই আপনার শেষ কথা?
হ্যাঁ।
তা হলে আপনি চন্দ্রবিন্দু হয়ে গেলেন। হেসে বললেন বিজয় মিত্র। এবং মোটা শরীরটাকে একপাশে কাত করে পকেট থেকে একটা ছোট মাপের অটোমেটিক পিস্তল বের করলেন। চোখ দিয়ে মেপে দেখলেন, তার কাছ থেকে পলাশের দূরত্ব প্রায় বারো-তেরো ফুট।
পিস্তলটা দেখেই শান্তনুর মুখ ছাইয়ের মতো সাদা হয়ে গেল। সীমন্তিনী ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল।
পিস্তলটা নেড়েচেড়ে পলাশকে দেখালেন বিজয় মিত্র ও এটা লামা অটোমেটিক পিস্তল। সোয়া ছইঞ্চি ব্যারেল। ওজন ছশা গ্রাম মতন। আটটা গুলি করা যায়। দেখতে ছোট হলে কী হবে, ভীষণ কাজের।
সীমা, লোকটাকে ভয় দেখাতে বারণ করো! চেঁচিয়ে বলল পলাশ, নইলে আমি কিন্তু মিমোকে খতম করে দেব।
পলাশবাবু, আপনি কখনও ষাঁড়ের লড়াই দেখেছেন? হাসিমুখেই জানতে চাইলেন বিজয় মিত্র, ওই যে, স্পেনে যেটা হয়। তাতে ম্যাটাডর যখন ছুটে আসা যাঁড়টাকে তরোয়াল দিয়ে শেষ করে তখন তার মধ্যে একটা অঙ্কের হিসেব থাকে। ম্যাটাডর চার্জিং বুলের ঠিক মুখোমুখি দাঁড়ায়। ষাঁড়টা মাথা নীচু করে ধুলো উড়িয়ে তার দিকে ধেয়ে আসে। যখন ষাঁড়টা ম্যাটাডরের গায়ের কাছে এসে যায় তখন সামনে, ষাঁড়ের দু-শিং-এর ফাঁকে, ঝুঁকে পড়ে ম্যাটাডর একটা বিশেষ জায়গায় তরোয়ালটাকে আমূল ঢুকিয়ে দেয়। জায়গাটা হল, কুঁজের সামনে, দুধের জোড়ের ঠিক মাঝে, একটা টোল খাওয়া ছোট্ট অঞ্চল। ম্যাটাডরের সোজা সরু তরোয়ালটা এখানে বিধিয়ে দিলে সেটা মাখন কেটে বসার মতো স্ট্রেট ভেতরে ঢুকে যায়। আর লাইটের সুইচ অফ করে দেওয়ার মতো ষাঁড়টার প্রাণবাতি তক্ষুনি নিভে যায়। ওটা জাস্ট খসে পড়ে ম্যাটাডরের পায়ের কাছে, একফোঁটা ছটফট করতে পারে না। কারণ, ওটার মেইন আর্টারিটা ড্যামেজ হয়ে যায়…।
পলাশ অধৈর্য হয়ে পড়লেও বিজয় মিত্রের কথাগুলো শুনছিল। ব্যাঙ যেমন সাপের কথা শোনে।
বাসন্তী সত্যি-সত্যি চার কাপ চা নিয়ে এল ট্রে-তে করে। কাপ-প্লেটগুলো টেবিলে নামিয়ে রাখার সময় বিশ্রী ঠুনঠুন শব্দ হচ্ছিল। কারণ, ওর হাত কাঁপছিল।
শান্তনু অসহায় বাচ্চাটার দিকে তাকাচ্ছিল বারবার। ওর বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠছিল। মিমো যা-যা বায়না করবে এখন থেকে ও সবই কিনে দেবে। শুধু আজ কেউ ওকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে দিক।
বিজয় মিত্র হেসে একটা কাপ তুলে নিলেন বাঁ হাতে। তাতে শব্দ করে চুমুক দিয়ে তৃপ্তির আঃ! শব্দ করলেন।
ব্যানার্জি ভেতর থেকে ড্রইং স্পেসে চলে এলেন। বিজয় মিত্রের কাছে এসে বললেন, ওঁর জ্ঞান ফিরে এসেছে। শোওয়ার ঘরে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছি। একজন ডাক্তার ডেকে নিয়ে এলে ভালো হয়।
গুড। একটু পরে ডাক্তার ডাকার ব্যবস্থা করছি। এখন নিন, চা খান।
ব্যানার্জি ইতস্তত করে দাঁড়িয়েই রইলেন। তিনি বিজয় মিত্রের হাতের পিস্তলটার দিকে দেখছিলেন, আর দেখছিলেন পলাশের দিকে।
হ্যাঁ, যা বলছিলাম। কাপ টেবিলে রেখে বিজয় মিত্র আবার বলতে শুরু করলেন, পলাশবাবু, এখানে আপনি হলেন খ্যাপা ষাঁড়, আর আমি মোটাসোটা ভুড়িওয়ালা উদ্ভট চেহারার ম্যাটাডর। তবে সোর্ডের চেয়ে বন্দুক-পিস্তল এসব আমার বেশি পছন্দ। আমি এখন যে আপনাকে ঠিক দু-ভুরুর মাঝে গুলি করব তাতে আপনার মাথার ভেতরে করপাস ক্যালোসাম, থ্যালামাস আর হাইপোথ্যালামাস সব তালগোল পাকিয়ে ভুনি খিচুড়ি হয়ে যাবে। মানে, এককথায় বলতে গেলে, আপনার বাতি নিভে যাবে। অবশ্য আপনার মাথার পেছনের দেওয়ালটা ইয়ে-টিয়ে লেগে একটু নোংরা হয়ে যাবে। কিন্তু কিছু করার নেই। আমি যে-কোনও হার্ড ক্রিমিনালকে প্রথমে রিকোয়েস্ট করি..তারপর বিসর্গ চন্দ্রবিন্দু করে দিই। হাসলেন বিজয় মিত্র।
এবং হাসতে-হাসতেই কথা থামিয়ে পলাশকে গুলি করলেন।
বন্ধ ফ্ল্যাটে সাইকেলের টায়ার ফাটার শব্দ হল।
সীমা আর বাসন্তী চিৎকার করে উঠল।
শান্তনু ছুটে গেল মিমোর দিকে।
ঘরে বারুদের পোড়া গন্ধ ভেসে বেড়াতে লাগল।
পলাশের মৃতহেদটা তখন দেওয়াল ঘষটে হাঁটুগেড়ে বসে পড়ছে। ওর চোখে প্রাণহীন শূন্য দৃষ্টি। দেখেই বোঝা যায় বাতি নিভে গেছে।
বিজয় মিত্র পিস্তলটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখলেন। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ব্যানার্জিকে বললেন, নিন, আমার কাজ শেষ। এবার আপনার কাজ শুরু।
চায়ের কাপে আর-একবার চুমুক দিয়ে বিজয় মিত্র বাসন্তীকে লক্ষ করে বললেন, চা-টা হেভি হয়েছে, মা-মণি। তবে চিনি একটু কম হয়েছে। একটু চিনি দিতে পারো?
শান্তনু, সীমা আর মিমো তখন একে অন্যকে জাপটে ধরে যা খুশি তাই করছিল।
হিমশীতল
