ঠিক তখনই কলিং বেল বেজে উঠল আবার।
পলাশ চমকে ঘুরে তাকাল দরজায় দিকে। তারপর সীমাকে ইশারা করল। যার অর্থ হল, যে-ই এসে থাকুক তাকে যা-হোক কিছু বুঝিয়ে নিরস্ত করো।
সীমা দরজার কাছে গিয়ে চেঁচিয়ে বলল, কে?
দরজার ওপাশ থেকে উত্তর এল, আমি মানে, আমরা আপনাদের হেল্প করতে এসেছি।
চেনা গলা। ইন্সপেক্টর বিজয় মিত্র।
সীমার বুকের ভেতরে মেঘ ডেকে উঠল। কী বলবে এখন ও? ঠোঁট কামড়ে বিহ্বল চোখে হতভাগা বাচ্চাটার দিকে একবার তাকাল সীমা।
পলাশ বিজয় মিত্রের কথাগুলো শুনতে পায়নি। কিন্তু সীমার চাউনিতে দ্বিধাগ্রস্ত ভাবটা ও স্পষ্ট বুঝতে পারল। তাই অসভ্যের মতো খেঁকিয়ে উঠল, যে-ই হোক দরজা খুলবি না! এক হ্যাঁচকায় মিমোকে আরও জোরে আঁকড়ে ধরল। চঞ্চল চোখে ফ্ল্যাটের এপাশ-ওপাশ জরিপ করল।
সীমা বারকয়েক ঢোঁক গিলে কোনওরকমে বলল, আমরা ব্যস্ত আছি। দরজা খোলা যাবে না। পরে আসবেন।
মিসেস সেনগুপ্ত, কীসব আবোলতাবোল বকছেন! বিরক্ত গলায় বললেন বিজয় মিত্র, পলাশ সান্যাল কি ভেতরে আছে?
হ্যাঁ ।
আপনাদের ভয় দেখাচ্ছে? এবার চাপা গলায় কথা বললেন বিজয় মিত্র।
হ্যাঁ।
ওর কাছে রিভলবার আছে?
না –না।
ছুরি?
হ-হ্যাঁ।
আপনার বাচ্চাটা কি ভেতরে আছে?
হ্যাঁ হ্যাঁ। এবার কেঁদে ফেলল সীমন্তিনী। আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠার চাপে ওর বুকের ভেতরটা যেন জমাট বেঁধে ছিল। হঠাৎই সেটা গলতে শুরু করল। হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল সীমা। ওর কান্না কিছুতেই আর থামতে চাইছিল না।
হিংস্র বাঘের গলায় সীমাকে ডাকল পলাশ, অ্যাই! এদিকে চলে আয়!
শান্তনু সীমার কাছে গিয়ে ওকে শান্ত করতে চাইল। বলল, কোনও ভয় নেই। এপাশে চলে এসো।
ঠিক তখনই দরজায় রুক্ষ আঘাত পড়ল। বেপরোয়াভাবে দরজায় লাথি মারছে কেউ।
পলাশ মিমোকে টেনে নিয়ে দেওয়ালের এক কোণে চলে গেল। চিৎকার করে বলতে লাগল, ঘরে কেউ ঢুকলেই বাচ্চাটার গলা কেটে দেব! ওদের বারণ কর বলছি!
সীমার কান্না একফোঁটাও থামেনি।
শান্তনু কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না।
বাসন্তী ওদের কাছটিতে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল।
আর দ্বৈপায়নের অসাড় দেহটা সামান্য নড়েচড়ে উঠল।
আধমিনিটও লাগল না। দরজায় কাঠ ফেটে গেল। দুটো অজানা-অচেনা হাত সেই ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ে খিল-ছিটকিনি খুলে ফেলল। তারপরই ঘরে ঢুকে পড়ল চারজন মানুষ। দুজন সাদা-পোশাক, আর দুজন উর্দি-পরা কনস্টেবল। সাদা-পোশাকের একজনকে শান্তনু আর সীমন্তিনী চিনতে পারলঃ বিজয় মিত্র।
দরজায় বাইরে উৎসাহী জনতার ভিড় জমে গিয়েছিল। বিজয় মিত্র কনস্টেবল দুজনকে দরজায় মোতায়েন করে দিলেন। তারপর হাঁপ ছেড়ে একগাল হেসে বললেন, যাক, আর কোনও ভয় নেই। আমরা এসে পড়েছি। সীমন্তিনীর দিকে ফিরে : ম্যাডাম, আমাদের একটু চা খাওয়ান। গলাটা বড্ড শুকিয়ে গেছে।
বিজয় মিত্রের আচরণে সকলেই হতবাক হয়ে গিয়েছিল। এরকম একটা বিপজ্জনক মুহূর্তে ভদ্রলোক যেন পিকনিক করতে এসেছেন।
ভুড়ি সামলে হেলেদুলে হেঁটে বিজয় মিত্র একটা সোফায় গিয়ে বসলেন। তারপর এই প্রথম যেন দ্বৈপায়ন আর পলাশকে দেখতে পেলেন। পলাশকে বললেন, কী ব্যাপার? আপনারা দুজন মারপিট করছিলেন নাকি? আর বাচ্চাটাকে ওভাবে ধরে আছেন কেন? ওকে ছেড়ে দিন। সীমন্তিনীর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে ম্যাডাম, দাঁড়িয়ে থাকবেন না, প্লিজ। আমার তাড়া আছে– এক্ষুনি চলে যাব। চা-টা একটু জলদি হলে ভালো হয়।
দ্বৈপায়নের গলা দিয়ে উঃ-আঃ শব্দ বেরোচ্ছিল। বিজয় মিত্র সঙ্গীর দিকে ফিরে বললেন, ব্যানার্জি, একে তুলে বাথরুমে নিয়ে যান। মাথায় জল-টল দিয়ে দেখুন কী ধরনের ইনজুরি হয়েছে। সেরকম বুঝলে হসপিটালে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।
ব্যানার্জি কোনও কথা না বলে দ্বৈপায়নকে অনায়াসে চাগিয়ে দু-হাতে তুলে নিলেন। তারপর শান্তনুর দিকে চোখের ইশারা করে জানতে চাইলেন, বাথরুমটা কোনদিকে। শান্তনু দেখিয়ে দিতেই সেদিকে চলে গেলেন।
সীমন্তিনী বাসন্তীকে পাঠাল চা তৈরি করতে। কান্না থামিয়ে বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে ও বিজয় মিত্রকে দেখছিল। পলাশও অবাক সতর্ক চোখে তাকিয়ে ছিল এই অদ্ভুত অফিসারের দিকে।
এবার শান্তনুর দিকে তাকালেন বিজয় মিত্রঃ মিস্টার সেনগুপ্ত, আসুন–এখানে এসে বসুন–আপনার সঙ্গে কথা আছে।
শান্তনু বাধ্য ছেলের মতো কথা শুনল। বিজয় মিত্রের কাছাকাছি একটা সোফায় বসে আমতা-আমতা করে বলল, আমি…আমাদের…।
বুঝেছি, বুঝেছি। ব্যস্ত হতে হবে না–চুপ করে বসে একটু জিরোন, চা-টা খান–তারপর কথা হবে।
মিমো। ঘরের আর-এক প্রান্ত থেকে সীমা ছেলের নাম ধরে ডেকে উঠল।
তখনই যেন বিজয় মিত্র পলাশকে আবার খেয়াল করলেনঃ আরে, কী হল! আপনাকে বললাম না বাচ্চাটাকে ছেড়ে দিন। ওকে ছেড়ে দিয়ে এখানে এসে বসুন কথা আছে।
পলাশ হঠাৎই রাগে ফেটে পড়ে পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল, আমাকে আটকালে বাচ্চাটার গলা কেটে দেব! মিমোর চুলের মুঠি ধরে হিংস্রভাবে আঁকিয়ে ওর মাথাটা কাত করে ধরল পলাশ। তখনই ওর গলায় ভয়ঙ্করভাবে চেপে ধরা ছুরিটা স্পষ্ট দেখা গেল।
আমি এখান থেকে চলে যাব– হিসহিস করে বলল পলাশ, ওদের বলুন পথ ছেড়ে দিতে। কেউ যেন আমাকে না আটকায়।
বিজয় মিত্র হাসলেন, বললেন, পলাশবাবু, আপনাকে আটকাতে আমরা আসিনি। আপনার এগেইস্টে কোনও অভিযোগ কিংবা প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। আপনাকে আমরা অ্যারেস্ট করতেও চাই না। আপনি শুধু বাচ্চাটাকে ছেড়ে দিন। শেষ কথাটা বলার সময় বিজয় মিত্রের গলাটা কেমন ঠান্ডা শোনাল।
